ঢাকার শিল্পকলা একাডেমীর এক্সপেরিমেন্টাল হলে গত ১৪ আগস্ট উদ্বোধন হলো কাজী নজরুল ইসলামের ‘সাপুড়ে’ গল্প অবলম্বনে আনন জামান রচিত ‘নীলাখ্যান’ নাটক। নির্দেশনায় ইউসুফ হাসান অর্ক। নাসির উদ্দীন ইউসুফ এবং ড. জামিল আহমেদ প্রদীপ জ্বালিয়ে নাট্যপ্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন। এটি মহাকাল নাট্যসম্প্রদায়ের ছত্রিশতম প্রযোজনা।
‘নীলাখ্যান’ নাটকের কাহিনিতে দেখা যায়—বেদে সর্দার জহর বিষজয়ের সাধনায় নিমগ্ন। মনসার সাধনায় কাম নিষিদ্ধ বলে স্ত্রী বিন্তী রাণী আত্মাহুতি দিয়েছিল। কিন্তু জহরের আত্মসংযম সর্বোচ্চ। একদিন নদীর তীরে সাপেকাটা মৃতপ্রায় এক বালিকাকে জীবিত করে তুললে স্মৃতিভ্রষ্টা বালিকার অনুরোধেই সন্তানজ্ঞানে পালন করতে থাকেন। চন্দন বালকরূপে বেড়ে উঠতে থাকে। কিন্তু জহর তার মধ্যে যেন স্ত্রী বিন্তীর সুরভীই পান। এদিকে ঋতুমতী হয়ে ওঠে চন্দন। জহরের মনোজগত্ প্রেম-কামনায় সংযমের বাধ ভাঙার উপক্রম হয়ে ওঠে। তবু সাধনায় অটুট জহর। এদিকে দলে চন্দনকে ঘিরে তৈরি হয় নানা সংকট। একদিন উত্সবে চন্দনের নারীত্বের পরিচয় উন্মোচিত হয়ে পড়ে। নানা সংকট ঘণীভূত হয়ে ওঠে। দলের ঝুমরো ভালোবাসে চন্দনকে। একসময় সাধনার বাধ ভেঙে যায় সর্দার জহরের। নিজের পালিত কন্যাতুল্য চন্দনকে বিয়ে করতে চায়। চন্দনের বুদ্ধিমত্তায় নিজের ভুল বুঝতে পারে জহর। শেষ পর্যন্ত চন্দন যুবক ঝুমরোর সাথে পালিয়ে চলে যায় দূরে। প্রতিহিংসা পরায়ণ হয়ে ওঠে জহর। বনে জহরেরই সাপের দংশনে ঝুমরো মৃত্যুমুখী হয়ে পড়ে। কিন্তু চন্দনের অনুরোধে ঝুমরোর বিষ নামিয়ে দেয় জহর। আত্মঘাতী মত্ত জহর সাপের দংশন নিয়ে বিষে নীল হয়ে ওঠে।
নাট্যটি তিন দিক দর্শক বেষ্টিত মাঝখানে মঞ্চে উপস্থাপিত। মঞ্চের পেছনে ঝুলানো একটি সিঁড়ির সিম্বল। সাধনার ধাপ বোঝাতে সম্ভবত এটা ব্যবহূত হয়েছে। সিঁড়িটির গোড়ায় একটি ঘট ও বক্স। বিভিন্ন ধর্মের ঐকতানিক ধর্মকৃত্যের মধ্য দিয়ে নাটকটি শুরু হয়।
জহর চরিত্রে অভিনয় করেছেন মীর জাহিদ। অসাধারণ প্রাণবন্ত অভিনয়। পোশাকগুলো সাজেস্টিক। মঞ্চের পেছনে যন্ত্রীদল বসা। কখনো ঘটনার আবহ তৈরি করেছে; কখনো বৈচিত্র্যমুখী বোল ও সংগীতের দ্বারা নাটকটিকে করেছে প্রাণবন্ত। বেদে দলের নাচ-গান অসাধারণ। বাংলার আবহমান অভিনয়রীতির বৈশিষ্ট্যে কখনো বর্ণনা; কখনো চরিত্রাভিনয়ের মাধ্যমে উপস্থাপিত হয়েছে নাট্যটি। গান, বর্ণনা, নৃত্য, কথোপকথনের এক ঐকতানিক সুর একীভূত হয়ে উঠেছে নাট্যটিতে। উপস্থাপনে অত্যন্ত পরিমিতিবোধের পরিচয় পাওয়া গেছে। সর্দার নিজেই সাপের বিষের ছোবল নিয়ে বিষের যন্ত্রণায় নীল হয়ে ওঠে। তখন নজরুলের সেই বিখ্যাত গান বাজতে থাকে—‘আমি চিরতরে দূরে চলে যাব, তবু আমারে দেব না ভুলিতে’। এক বিয়োগান্তক পরিণতির মধ্য দিয়ে নাট্যটির পরিসমাপ্তি ঘটে। ধর্মকৃত্যে সমানগুরুত্বহীনতা, চাঁদ খসে পড়া, পলিথিন, বাচিক প্রক্ষেপণসহ কিছু অস্পষ্টতা থাকলেও সর্বোপরি এটি অসাধারণ প্রাণবন্ত শৈল্পিক উপস্থাপনা। অভিনয়, সংগীত, নৃত্য সবকিছু মিলিয়ে যে সুখদর্শন তৈরি করে তা অবর্ণনীয়।
