সোশ্যাল মিডিয়াগুলোর মধ্যে এদেশে সবচেয়ে জনপ্রিয় হলো ফেসবুক। এটিই প্রথম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। একসময় শুধু বন্ধু বানানোর জন্য ফেসবুক খুব জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। তবে সময়ের সাথে সাথে ইউটিউব, টুইটার, ইনস্টাগ্রামের মতো আরও অনেক সোশ্যাল মিডিয়া তৈরি হলেও ব্যবহারকারীদের চাহিদার সাথে পাল্লা দিয়ে ফেসবুক নতুন নতুন ফিচার যুক্ত করে নিজের অনন্য অবস্থান ধরে রেখেছে। ফলে অনেক রকম সোশ্যাল মিডিয়া থাকা সত্ত্বেও ফেসবুকের দাপট কিংবা জনপ্রিয়তা কোনো অংশে কমেনি এখনো। শুধু যোগাযোগ নয়, বাস্তবজীবনের অনেক ইতিবাচক কাজও সংগঠিত হচ্ছে এসব সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে। আর এসব ব্যবহারকারীদের বড় অংশই তরুণ। তবে যতই জনপ্রিয়তা থাকুক না কেন, ফেসবুক বা অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়ার নেতিবাচক দিকও কম নয়। আর নেতিবাচক দিকটাও যে মানবসৃষ্ট এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। যেহেতু ব্যবহারকারীদের বেশিরভাগই তরুণ, তাই যেকোনো সমস্যায় বেশি ভুক্তভোগী হচ্ছেন তরুণেরাই। সোশ্যাল মিডিয়াগুলোতে নেহাত মজার ছলে কিংবা ব্যক্তিগত সমস্যার জের ধরে ভুয়া খবর রটিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত ও অহেতুক হয়রানি করার ঘটনা অহরহ ঘটছে। ফলে সোশ্যাল মিডিয়ায় দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলোকে এখন অনেকে মিথ্যা মনে করে এড়িয়ে যান। এখানে এমনকি জীবিত মানুষকে মৃত ঘোষণা করে আবার মৃত মানুষকে জীবিত অবস্থায় ফিরিয়ে আনার মতো ভুয়া খবরও আমাদের সবার চোখেই পড়ে। অনলাইন পত্রিকা নামধারী বেশকিছু ভুয়া সাইট ফেসবুকে লিংক শেয়ার করে ভিত্তিহীন অনেক খবরও ছড়ায়। ফলে মানুষ বিভ্রান্ত হয়। একশ্রেণির মানুষ কাউকে ট্রল করতে, অন্যকে নিয়ে সোশ্যাল সাইটগুলোতে বাজে মন্তব্য করতে গিয়ে দ্বিতীয়বার ভাবে না। উসকানিমূলক মন্তব্য করে অন্যের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে কোন্দল সৃষ্টি হওয়ার মতো ঘটনার নজিরও আছে। আর ভুয়া অ্যাকাউন্ট খুলে অবলীলায় এই মানুষগুলো তাদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। ফেসবুকে খুব সহজেই ভুয়া অ্যাকাউন্ট খোলা যায়। কিছু কিছু তরুণ ভুয়া অ্যাকাউন্ট দিয়ে মানুষকে হয়রানি করছে, এমনকি কিছু অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডও করছে, যার পরিণতি মারাত্মক আকার ধারণ করতে দেখা যায়। অনেকেই ভুয়া অ্যাকাউন্ট খুলে মেয়েদেরকে বিরক্তিকর মেসেজ পাঠায়, অনেকসময় কারোর ছবি চুরি করে তা দিয়ে ভুয়া অ্যাকাউন্ট খুলে আজেবাজে লেখা শেয়ার করে তাকে সামাজিকভাবে হেয়-প্রতিপন্ন করার চেষ্টাও করে। কাউকে আক্রমণ করার জন্য ফেসবুকসহ অন্যান্য সোশ্যাল সাইট যেন এখন একটি ধারালো অস্ত্রের মতোই কাজ করছে।
অন্যদিকে, ফেসবুকের ‘হোয়াটস অন ইউর মাইন্ড’-কে অনেকেই এতটা সিরিয়াসলি নেন যে, মাথায় যখন যে বিষয় ঘুরপাক খায় সেটাই ফেসবুকে পোস্ট করেন, তা যতই ব্যক্তিগত হোক না কেন! আমাদের ফ্রেন্ডলিস্টের সবার সাথেই যে আমাদের সম্পর্ক খুব ভালো এমন তো নয়। কখনো রাগের মাথায়, কখনোবা খুব ইমোশোনাল হয়ে আমরা ফেসবুকে এমন কোনো কিছু পোস্ট করে ফেলি যেটা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে পরক্ষণেই ডিলিট করে ফেলি। কিন্তু এটুকু সময়ের মধ্যে ব্যক্তিগত সমস্যাটা হয়তো বা অনেকের চায়ের আড্ডার মুখোরোচক বিষয় হয়ে যায়। অনেকের ক্ষেত্রেই এমন হয়েছে যে, ফেসবুক বন্ধুদের সাথে সমস্যা শেয়ার করে সমাধান খুঁজতে গিয়ে সমস্যার সমাধান তো হয়-ই না, বরং নানা উটকো সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। তা ছাড়া খুব কাছের মানুষ, বন্ধু বা পরিবারের কোনো সদস্যের সাথে মতের অমিল কিংবা মন কষাকষি হলে সেটাও অনেকে সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করে ফেলেন। দুই পক্ষের এই সমস্যাগুলো অনেক সময় তারা নিজেরা চাইলেই খুব সহজে মিটমাট করতে পারেন। কিন্তু পাবলিকলি শেয়ার করার ফলে তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ কখনো কখনো দুই পক্ষের মধ্যে মীমাংসা করে না দিতে পারলেও, শেষ চেষ্টা করার অবশিষ্ট পথটাও বন্ধ করে দিয়ে যায়।
তাই নিজের ব্যক্তিগত বা সামাজিক জীবনের কিছু বিষয় সোশ্যাল মিডিয়ায় ঠিক কতটুকু, কীভাবে উপস্থাপন করা উচিত তার একটা সীমা নির্ধারণ করে, একটু সতর্কতা ও সচেতনতা অবলম্বন করলে এই সমস্যাগুলো হয়তো অনেকাংশেই এড়ানো সম্ভব হবে।
