জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চের ভাষণের গুরুত্ব ও মাহাত্ম্য কেবল এর রাজনৈতিক বিবেচনার মধ্য দিয়ে বোঝা যাবে না। এই ভাষণের পরতে পরতে মিশে আছে বাংলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য এবং সেই ইতিহাস নির্মাণে লোকসাধারণের সুদীর্ঘ সাধনা। প্রাকৃতজন হিসেবে বঙ্গবন্ধু বেড়ে উঠেছিলেন লোকায়ত জীবনের গভীরতায় স্নাত হয়ে। সেইসাথে তিনি অর্জন করেছিলেন বিশ্বজনীন অভিজ্ঞতা। কলকাতা মহানগরীতে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের উন্মেষকালে নেতাজির আন্তর্জাতিকতাবাদী চিন্তা ও স্বাধীনতার প্রবল স্পৃহা দ্বারা তিনি আলোড়িত হয়েছিলেন, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সস্নেহ সান্নিধ্য এবং আপন কর্মোদ্যোগ তাঁকে ভারতীয় রাজনীতির প্রধান কুশীলবদের সঙ্গে পরিচিত করেছিল। পঞ্চাশের দশকে জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি-প্রকাশক কর্মসূচিতে তিনি অংশ নিয়েছিলেন, বিশেষভাবে জামাল আবদুল নাসের সুয়েজ খালের ওপর মিশরের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করলে ব্রিটেনের ন্যক্কারজনক আক্রমণের মুখে পূর্ববাংলায় গড়ে ওঠা সংহতি আন্দোলনের তিনি ছিলেন তরুণ নেতা। পঞ্চাশের দশকের গণচীন সফর করে তিনি পরিচিত হয়েছিলেন সমাজ রূপান্তরে মহাচীনের বিপ্লবী ভূমিকা ও তার নেতৃবৃন্দের সাথে। ১৯৫৭ সালে লিডারশিপ প্রোগ্রামে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও সফর করেন, পূর্ব থেকে পশ্চিম উপকূল অবধি। ষাটের দশক থেকে বিশেষভাবে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর প্রয়াণের পর তিনি হাল ধরলেন নেতৃত্বের এবং রইলেন কারাগারে অথবা বাংলার পথে-প্রান্তরে-জনপদে মানুষের সঙ্গে মিশে, মানুষকে সচেতন, সংগঠিত, উদ্বুদ্ধ ও আলোড়িত করবার কাজে। তিনি জনজীবনের সঙ্গে কী নিবিড়ভাবে মিশতে পারতেন, কত সুগভীর ভালোবাসা নিয়ে প্রতিটি মানুষকে আলিঙ্গন করেছিলেন সেসব নিয়ে নানা গল্পকথা রয়েছে। একবার কারো সঙ্গে পরিচিতি হলে, তিনি যে-ব্যক্তিই হন না কেন, গুরুত্বপূর্ণ অথবা গুরুত্বহীন, বঙ্গবন্ধু তাঁকে আর কখনো বিস্মৃত হতেন না। এর সাক্ষ্য রয়েছে অগণন এবং এসব নিয়ে রচিত হয়েছে অনেক গল্পকথা, এভাবে তিনি হয়ে উঠেছিলেন মিথ, প্রায় এক পৌরাণিক চরিত্র। এমনি জনসম্পৃক্তির মধ্য দিয়ে তিনি নিয়ত আহরণ করেছেন লোকায়ত উপাদান ও লোকজ্ঞান। আপন বিশ্ববীক্ষার সঙ্গে লোকজ্ঞানের সংমিশ্রণ আর সেইসাথে মানুষের জন্য অপার ভালোবাসা, যে মানুষ বলতে আর্ত দুঃখী নিপীড়িত সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ও তাদের ব্যক্তিরূপই তাঁর কাছে ছিল মুখ্য, এসব মিলিয়েই শেখ মুজিব হয়ে উঠেছিলেন বঙ্গবন্ধু এবং ৭ই মার্চের ভাষণে সেই অনন্য জীবনবোধের প্রকাশের মধ্য দিয়ে তিনি হয়ে উঠলেন জাতির জনক।
....
বিশ শতকের জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের প্রকৃত ইতিহাস এখনও রচিত হয়নি, তবে অনাগতকালের ঐতিহাসিকরা যখন লিখবেন সেই ইতিহাস তাতে আপন মহিমায় উজ্জ্বল হয়ে রইবেন বাংলার অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাঁর অনন্য ভাষণ। এই ভাষণে রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদৃষ্টির পরতে পরতে মিশে ছিল মানুষের জন্য এমন অপার ও অশেষ ভালোবাসা যার তুলনা খুঁজে পাওয়া ভার। কাদামাটির গাঙ্গেয় বাংলাভূমিতে এই ভালোবাসা দিয়েই তিনি গড়েছিলেন মাটির এমন দুর্গ, যা স্বদেশি সমাজ ও লোকায়তিক ধারা থেকে সংগ্রহ করেছে উপাদান এবং হয়ে উঠেছে অনন্য কীর্তিসৌধ। তিনি একটি জাতিকে যুগিয়েছিলেন মুক্তিপথের দিশা এবং গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক, কল্যাণকামী রাষ্ট্র গঠনের মাধ্যমে জাতীয় মুক্তি আন্দোলনকে সার্থকতা দিতে সচেষ্ট হয়েছিলেন। বিশ শতকের জাতীয় মুক্তি আন্দোলনে তিনি যোগ করেছিলেন আলাদা মাত্রা, গোটা জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে এমন এক গণসংগ্রাম পরিচালনা করেছিলেন যা ছিল একান্তভাবে স্বাদেশিক এবং একইসঙ্গে আন্তর্জাতিকভাবে প্রাসঙ্গিক ও বিপুল আবেদনময়। তাঁর সেই অনন্য ভূমিকা আজ ও আগামীর জন্য পাথেয় হয়ে আছে, বাংলাদেশের জন্য যেমন, তেমনি তৃতীয় দুনিয়ার জন্যও। (অংশ)
সূত্র : বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ :বহুমাত্রিক বিশ্লেষণ (বাংলা একাডেমি, ২০১৮)
