রাজনৈতিক নৈরাশ্য কি ঘুরপাক খাচ্ছে ট্রাম্পকে ঘিরে?

আপডেট : ০৬ মার্চ ২০১৯, ২১:৩২

আনুশে হোসেন

সম্প্রতি পারমাণবিক শক্তিধর ভারত ও পাকিস্তান যখন পরস্পরের সঙ্গে ছায়াযুদ্ধের উত্তাপ ছড়াচ্ছে আর সারা বিশ্ব সেসব সংবাদ মনোযোগের সঙ্গে গিলছে, তখন আমেরিকার সংবাদ জগত্ মেতে আছে আমেরিকাকে নিয়েই।

ওয়াশিংটনজুড়ে গত সপ্তাহে বেশ আকস্মিকভাবে অভাবিত কিছু সংবাদ শোরগোল ফেলেছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, সেসব সংবাদ ছিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অপ্রকাশিত কিছু স্ক্যান্ডাল নিয়ে। এসব স্ক্যান্ডাল যখন ওয়াশিংটনের বাতাসে ঘুরপাক খাচ্ছে, ট্রাম্প তখন আমেরিকার বাইরে, ভিয়েতনামে, উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে ব্যস্ত।

কোনো সন্দেহ নেই, ভিয়েতনামের রাজধানী হ্যানয়ে অনুষ্ঠিত দ্বিপাক্ষিক বৈঠকটি আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ওয়াশিংটনের গণমাধ্যমের প্রধান ফোকাস হওয়ার কথা ছিল ট্রাম্প-কিমের হ্যানয়ের বৈঠক। কিন্তু ঘটনা ঘুরে যায় ট্রাম্পের সাবেক আইনজীবী মাইকেল কোহেনের কারণে। তিনি ক্যাপিটল হিলে গত সপ্তাহে তার দশ বছরের সাবেক বসের বিরুদ্ধে এমন কিছু সাক্ষ্য দেন— যার সরল অর্থ করলে দাঁড়ায়, ট্রাম্প হলেন একজন বর্ণবাদী এবং এমন এক শ্রেণিভুক্ত মানুষ যিনি অর্থ, ক্ষমতা, সম্ভ্রম, খ্যাতি, প্রভাব-প্রতিপত্তির জন্য কোনো আদর্শের তোয়াক্কা করেন না।   

ট্রাম্পের বিরুদ্ধে স্বাভাবিকভাবেই মাইকেল কোহেনের এই সাক্ষ্যকে রিপাবলিকানরা বলতে চেষ্টা করছেন ডেমোক্র্যাটিকদের ষড়যন্ত্র হিসেবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো কোহেনের এই সাক্ষ্য কেবল ঐতিহাসিক নয়, আমেরিকার সবচাইতে কুখ্যাত রাজনৈতিক স্ক্যান্ডাল হিসেবে পরিচিত রিচার্ড নিক্সন ও ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারিকেও হার মানিয়েছে।

বস্তুত, আধুনিক রাজনৈতিক ইতিহাসের স্মরণকালের মধ্যে ক্যাপিটল হিলে কোহেনের এই শুনানি সবচাইতে হাই প্রোফাইল। প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার আগে কর জালিয়াতি, ব্যাংক জালিয়াতিসহ বিভিন্ন অর্থনৈতিক নীতি লঙ্ঘনের সময়ে মাইকেল কোহেন ছিলেন ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠবৃত্তের সবচাইতে কাছের একজন।

এমনকী কংগ্রেসনাল সাক্ষ্যে মাইকেল কোহেন এ কথাও বলেছেন যে, আমেরিকার প্রেসিডেন্সির বিষয়টি ট্রাম্প বিবেচনা করেছেন তার ব্র্যান্ড এবং বিজনেসের কলেবর ও জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির অংশ হিসেবে। কোহেন বলেছেন যে, ট্রাম্প এমন একজন ব্যক্তি যিনি অফিসকে চালান তার ব্র্র্র্র্যান্ডকে আরো গুরুত্বপূর্ণ ও অসাধারণ করে তুলতে, দেশকে মহত্ করা তার উদ্দেশ্য নয়। প্রচারণা তার কাছে সবসময়ই একটি ভালো মার্কেটিংয়ের বিষয়।   

ক্যাপিটল হিলে কোহেনের সাক্ষ্য যখন শেষের দিকে— তখন উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে অসফল শীর্ষবৈঠক শেষে দেশে ফেরেন ট্রাম্প। এটা কি ট্রাম্পের জন্য যথেষ্ট বিব্রতকর নয় যে, হ্যানয় থেকে ১৭ ঘণ্টার দীর্ঘ ভ্রমণ শেষে ট্রাম্প দেশে ফেরেন শূন্য হাতে? কেবল তাই নয়, ট্রাম্প সেখানে ছোট করে এসেছেন একজন আমেরিকান বাবা-মায়ের সন্তান হারানোর শোককেও। তিন বছর আগে উত্তর কোরিয়া ভ্রমণে গিয়ে চুরির দায়ে জেল খাটা আমেরিকান নাগরিক ওটো ২০১৭ সালে দেশে ফেরার কয়েকদিনের মধ্যেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছিলেন। ওটোর বাবা-মা সন্তান হত্যায় কিম ও উত্তর কোরিয়ার নির্মম শাসন ব্যবস্থাকে দায়ী করেছিলেন। কিন্তু হ্যানয়ে সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন যে, ওটোর মৃত্যুর বিষয়ে কিছুই অবগত ছিলেন না বলে জানিয়েছেন কিম। কিমের কথাকেই ট্রাম্প সত্য বলে মেনে নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন সেই সংবাদ সম্মেলনে। এ ছাড়াও কিমকে ট্রাম্প যেভাবে চৌকস-বুদ্ধিদীপ্ত ইত্যাদি বিশেষণে ভূষিত করেছেন, সেটা দেখে আহত হয়েছেন ওটোর বাবা-মা। ক্ষুব্ধ হয়েছেন অনেক আমেরিকানও।

এরইমধ্যে নিউইয়র্ক টাইমস ট্রাম্পের বিরুদ্ধে প্রকাশ করেছে আরেকটি গুরুতর অভিযোগ। জামাতা জারেড কুশনারকে ট্রাম্প ব্যক্তিগত হস্তক্ষেপের মাধ্যমে আমেরিকার টপ সিক্রেট তথ্যে প্রবেশাধিকার দেওয়ার ব্যবস্থা করেছেন। অথচ এ ব্যাপারে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর প্রবল আপত্তি ছিল। ইন্টেলিজেন্স কর্মকর্তারা মনে করেন যে, প্রেসিডেন্টের পারিবারিক সম্পর্কের কারণে অন্য কেউ আমেরিকার অতি গোপনীয় তথ্য গ্রহণের অধিকার অর্জন করতে পারেন না। গোয়েন্দাদের এসব সতর্কতার প্রতি বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ট্রাম্প তার কন্যার স্বামী কুশনারকে প্রবেশাধিকারের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন আমেরিকার সবচাইতে গোপনীয় তথ্যের ভাণ্ডারে।   

যদিও গোয়েন্দা বিশেষজ্ঞরা বিশদভাবে স্পষ্ট করেননি কেন ট্রাম্পের জামাতাকে এ ধরনের তথ্যের প্রবেশাধিকার দেওয়া উচিত নয়। তবে আমেরিকার জাতীয় সুরক্ষার তথ্য ফাঁসের ক্ষেত্রে জারেড কুশনার সম্ভবত বিদেশিদের কাছে এক নম্বর পছন্দের ব্যক্তি।

ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির জমানায় এত বেশি কেলেঙ্কারি, এত বেশি তদন্ত, এত বেশি নাটকের ছড়াছড়ি যে, এটা বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় যে, ডোনাল্ড ট্রাম্প নামের একজন টিভি স্টার মাত্র দু’বছর আগে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচিত হয়েছেন।

যদিও প্রায় সময়ই এটা বলা হয়ে থাকে যে, রাজনৈতিক এক গভীর নৈরাশ্য ঘুরপাক খাচ্ছে ট্রাম্পকে ঘিরে, তবে সেটা এখন সত্যি সত্যি আরো স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এটা বলার কারণ এই যে, ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্পের বিভিন্ন কেলেঙ্কারির ব্যাপারে শক্ত অবস্থানে চলে গেছে। আর এই শক্ত পদক্ষেপের পেছনে রয়েছে ডেমোক্র্যাটদের শক্ত জমিন। কারণ, গত নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা বড় ধরনের বিজয় অর্জন করে। এর ফলে ইউএস কংগ্রেস এখন তাদের নিয়ন্ত্রণে। সে কারণে দৃশ্যত মনে হচ্ছে ডেমোক্র্যাটরা তাদের subpoena (যে পরওয়ানা অনুযায়ী আদালতে হাজির না হলে শাস্তি পেতে হয়) ক্ষমতা ব্যবহার করে ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সিকে দুঃস্বপ্নে পরিণত করে তুলবে।

ইংরেজি থেকে অনুবাদ : তাপস কুমার দত্ত

n লেখক : যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি সাংবাদিক, নারী অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ