মো. তাসনিম হাসান আবির
প্রত্যেক মানুষের কাছে তার জীবনটাই সব থেকে দামি,সবকিছুর চেয়ে মূল্যবান। মানুষ এই জীবনের জন্য কতকিছুই না করে! নিজের জীবনের স্বাভাবিক পরিসমাপ্তির জন্য মানুষ কত অর্থ খরচ করে কত দূর-দূরান্তেই না যাচ্ছে। এই ক্ষুদ্র জীবনে যেমন স্বাভাবিকভাবে সে পৃথিবীতে এসেছে, তেমন স্বাভাবিকভাবেই সে পৃথিবী থেকে চলে যেতে চায়। কিন্তু অনেক সময় অনেকের ভাগ্যে সেই স্বাভাবিক মৃত্যু জুটে না। আগুনে পুড়ে মরার মত দুঃসহ মৃত্যুও অনেকের কপালে থাকে। জন্ম,মৃত্যু এগুলো আমাদের হাতে নেই। কিন্তু মানুষ হিসেবে আমরা সাবধানতা অবলম্বন করতে পারি,আর ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে জীবনকে স্বাভাবিক গতিপথে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারি। কিন্তু আমাদের সমস্যা আমরা ভুল থেকে শিক্ষা নেই না। একই ভুলের পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে ক্ষতির পরিমাণটা আরও বাড়িয়ে দেই। বাংলাদেশে গত ১০ বছরে অগ্নিকাণ্ডে নিহত হয়েছে ১৫৯০ জন। বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস ও ফায়ার ডিফেন্স অধিদপ্তরের ২০১০ থেকে ২০১৮ সালের পরিসংখ্যান থেকে এই তথ্য পাওয়া যায়। এই সময়ের মাঝে সবথেকে বড় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাটি ঘটে ২০১০ সালে,পুরান ঢাকার নিমতলীতে। এতে ১২৪ জন নিহত হয়। এরপর সাভারের আশুলিয়ায় তাজরিন ফ্যাশনসের অগ্নিকাণ্ডে নিহত হয় ১১১ জন। এরপরে আরও অনেক ছোট-বড় অগ্নিকাণ্ড ঘটে। কিন্তু গত ২০ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার চকবাজারের চুড়িহাট্টায় ঘটে আরও একটি বড় অগ্নিকাণ্ড। যেখানে নিহত হয় প্রায় ৭০ জন। আরও কম বেশি হতে পারে। মুহূর্তের মাঝেই আগুনের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে রাস্তা থেকে আবাসিক ভবন পর্যন্ত। ঝরে যায় এতগুলো তাজা প্রাণ। সম্পদের ক্ষতির পরিমাণটাও নেহাত কম নয়। নিমতলীর ঘটনার পর তদন্ত কমিটির প্রণীত সুপারিশ আলোর মুখ দেখেনি। চকবাজারের ওই ঘটনাস্থলে যে কয়েকটি ভবনে আগুন ছড়িয়ে পড়ে সেখানের অনেকগুলোতে রাসায়নিক গুদাম আছে। সেখানে তারা খুব ভালোভাবেই ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তাদের সেখান থেকে সরিয়ে অন্যত্র নির্দিষ্ট স্থানে স্থানান্তরের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। আজকে যারা লোভের কারণে বেশি টাকা ভাড়া পাওয়ার আশায় এই গুদামের জন্য ভাড়া দেয় দেখা গেছে- তারাও এই আগুনে পুড়ে মারা গেছে। এটাই নির্মম সত্য। এই আগুনের ফলে কত মায়ের কোল খালি হয়ে গেছে,কত সন্তান বাবা, মা হারা হয়েছে,কত পরিবার নিঃস্ব হয়ে গেছে। কিছু লাশ শনাক্তও করা যাচ্ছে না এমনভাবে পুড়ে গেছে। ঢাকা মেডিক্যালে শিশুসন্তান তার মায়ের লাশ শনাক্তের জন্য ডিএনএ টেস্ট করছে। কত নির্মম দৃশ্য। আমরা হয়ত এই শোকও কয়েকদিন পর ভুলে যাব। হয়ত নতুন কোনো ঘটনা আসবে,যার ফলশ্রুতিতে এই ঘটনা পেছনে পড়ে যাবে। কিন্তু যেই পরিবারের সদস্য নিহত হলো বা যেই পরিবার ক্ষতিপ্রস্ত হলো তাদের জন্য এটা ভোলা কখনো সম্ভব না। সারাজীবন তারা এটি বহন করে বেড়াবে। এরথেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে এবং ভবিষ্যতে আরও সচেতন হতে হবে। একটা সমাজে বসবাস করে আমরা স্বাভাবিক মৃত্যু অবশ্যই আশা করতে পারি। কর্মক্ষেত্র থেকে ফেরার সময় আমরা অবশ্যই আশা করতে পারি যে, আমরা নিরাপদে বাসায় ফিরব। আবার রাতে বাসাবাড়িতে ঘুমানোর সময়ও আমরা নিশ্চিন্তে ঘুমাতে যাওয়ার আশা রাখতে পারি। আর তারজন্য প্রয়োজন সবকিছুর সঠিক নিরাপত্তা ও সুষ্ঠু ব্যবহার। রাসায়নিক দ্রব্যের গুদামগুলোকে নির্দিষ্ট স্থানে সরিয়ে নিতে হবে। আবাসিক এলাকায় বা ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এগুলোর লাইসেন্স দেওয়া যাবে না। এবং প্রতিনিয়ত এসব এলাকা তদারকি করতে হবে যেন কেউ অবৈধভাবে রাসায়নিক দ্রব্যের গুদাম গড়তে না পারে। আর যে নির্দিষ্ট এলাকায় এই গুদামগুলো করা হবে সেখানেরও নিরাপত্তা বিধান করতে হবে। আমরা সমাজের মানুষেরা যদি একটু সচেতন হই তাহলেই এইসব অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব। মানুষের জীবনের মূল্য কোনকিছুতে বিনিময় বা পূরণ করা যায় না। সম্পদের ক্ষতি হয়তবা দীর্ঘ সময় নিয়ে পূরণ করা যাবে। কিন্তু মানুষের জীবন নয়। তাই আমাদের পরিবারের কথা ভেবে,দেশের কথা ভেবে নিজেদের জীবনকে অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা থেকে এড়ানোর চেষ্টা করতে হবে। ২১ শে ফেব্রুয়ারির প্রহরে যখন জাতি ভাষা শহীদদের স্মরণ করবে,তখন তারা এই চকবাজারের ট্রাজেডির শোকে মুহ্যমান। আমরা এরকম শোক আর চাই না। আগুনে পুড়ে মরার মত নির্মম মৃত্যু আর যেনো না হয় সেজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। জাতির এই শোকের সময় আমাদের সকলকে একত্রে থাকতে হবে এবং সমাজের সমস্ত মানুষকে তার নিজস্ব জায়গা থেকে সহায়তা করতে হবে। মনে রাখতে হবে, মানুষের জীবন কিন্তু সস্তা নয়।
n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
