একক খাত হিসেবে সরকারের রাজস্বের সবচে বড় উত্স স্থানীয় পর্যায়ে ক্রেতা ও ভোক্তার কাছ থেকে প্রাপ্ত ভ্যাট বা মূল্য সংযোজন কর। কিন্তু গত কয়েক মাস ধরে ভ্যাট আহরণে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য দেখাতে পারেনি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। সূত্র জানিয়েছে, গত ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনের আগে গ্যাস আমদানি, ইন্টারনেট ব্যবহার, গার্মেন্টস সব ধরনের রপ্তানি খাতসহ আরো কয়েকটি খাতে ভ্যাট-ট্যাক্স ছাড় দিয়েছিল সরকার। ফলে ভ্যাট আদায়ে ঠিক করা লক্ষ্যমাত্রা থেকে অনেক পিছিয়ে পড়েছে এনবিআর।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এনবিআরের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, চলতি ২০১৮-১৯ অর্থ বছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ভ্যাট আদায় কম হয়েছে প্রায় ১৬ হাজার ৭শ কোটি টাকা। আলোচ্য সময়ে ৬৮ হাজার ৭১০ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ভ্যাট আদায় হয়েছে ৫২ হাজার কোটি টাকা। গত অর্থ বছরের একই সময়ের চেয়ে আদায় বেড়েছে মাত্র ৪ দশমিক ২ শতাংশ। আগামী ১৫ মার্চের মধ্যে পূর্ববর্তী মাসের ভ্যাট আদায়ের আরো কিছু অর্থ যোগ হলে এটি হয়তো সামান্য বাড়বে। অথচ গত অর্থ বছরের একই সময়ে ভ্যাট আদায়ে প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ১৮ শতাংশ।
সূত্র জানিয়েছে, ভ্যাট আদায়ে মাঠ প্রশাসনেও প্রত্যাশিত গতি নেই। গত বাজেটে সরকার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিশেষায়িত হিসাব যন্ত্র (ইলেক্ট্রনিক ফিসক্যাল ডিভাইস বা ইএফডি) বসানোর বাধ্যবাধকতার কথা জানালেও এখনো এটি বাস্তবায়ন করতে পারেনি এনবিআর। কী ধরনের হিসাব যন্ত্র আর কত সংখ্যক যন্ত্র স্থাপন করা হবে— এ নিয়ে চিঠি চালাচালি করতেই আট মাস পার হয়ে গেছে। এ সব কারণে মাঠ পর্যায়ের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিক্রয়ের সঠিক হিসাব রক্ষায় এখনো শৃঙ্খলা আসেনি। ফলে ভ্যাট ফাঁকি ঠেকানো যাচ্ছে না। অন্যদিকে ভোক্তা ভ্যাট পরিশোধ করলেও তা সরকারের ঘরে আসছে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। আবার ঢালাওভাবে কিছু পণ্য ও সেবায় মাত্রাতিরিক্ত ভ্যাটের অভিযোগও রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ভ্যাট আদায় তথা সার্বিক ভ্যাট ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনার বিষয়টি এখনো জোরেশোরে আলোচিত হচ্ছে।
ভ্যাট ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনতে বহুল আলোচিত ভ্যাট আইনটি এখনো কার্যকর করা যায়নি। ব্যবসায়ীদের কিছু দাবি মেনে আগামী জুলাই থেকে আইনটি কার্যকর হতে যাচ্ছে বলে ইতোমধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। তবে আইনটি বাস্তবায়নের আগে এটির তদারকির দায়িত্বে থাকা ভ্যাট অনলাইন প্রকল্প অফিসে প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নতুন আইনের কিছু ধারা ও বিধি’র প্রয়োজনীয় সংশোধন এখনো হয়নি। আইনের কয়েকটি ইস্যুতে এনবিআর গঠিত একটি কমিটি কিছু সংশোধনীর প্রস্তাব করেছে। এ বিষয়ে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই মতামত দেওয়ার কথা থাকলেও এখনো দেয়নি বলে এফবিসিসিআই সূত্র জানিয়েছে।
চলতি বছর সরকার ২ লাখ ৯৬ হাজার ২০১ কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছে। এর মধ্যে ভ্যাট খাত থেকে ১ লাখ ১০ হাজার ৫৪৩ কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছে এনবিআরকে। যা পূর্বের অর্থ বছরের আদায়ের চেয়ে ৪০ শতাংশেরও বেশি। এ লক্ষ্যমাত্রাকে ‘বাস্তবতাবর্জিত’ আখ্যা তা অর্জনযোগ্য নয় বলে ইতোমধ্যেই মত দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, প্রতিবছরই বাস্তবতার সঙ্গে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রায় এত বেশি ব্যবধান থাকলে তা মানুষের আস্থা হারাবে। আর এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আব্দুল মজিদ মনে করেন, আদায় বাড়াতে এনবিআর কর্মকর্তাদের দক্ষতা বাড়াতে হবে।
এনবিআরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ইত্তেফাককে বলেন, এবার লক্ষ্যমাত্রা অনেক বেশি দেওয়া হয়েছে। তবে কয়েকটি খাতে ভ্যাট ছাড় দেওয়ায় তা আদায়ে আরো নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ভ্যাট প্রদানকারী বড় বড় কোম্পানিগুলোর কাছ থেকেও কাঙ্ক্ষিত ভ্যাট আসছে না। এ ছাড়া গত কয়েক মাসে সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে গতি না থাকাও ভ্যাট আদায় কমার পেছনে দায়ী। তবে আগামী মাসগুলোতে ভ্যাট আদায় বাড়বে বলে আশাবাদী তিনি।
