দেশে দেশে আর্থ-সামাজিক অস্থিরতা আর নিরাপত্তার অভাবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ইউরোপে পাড়ি জমানোর চেষ্টা করছে লাখো মানুষ। চলতি বছরে ইউরোপের উদ্দেশে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেয়ার চেষ্টাকালে প্রায় আড়াই হাজার লোকের মৃত্যু হয়েছে। সর্বশেষ বুধবার দক্ষিণ তুরস্কের বাদরাম তীরে এক শরণার্থী শিশুর লাশ ভেসে এসেছে। তার মরদেহের ছবি সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ও বিশ্ব গণমাধ্যমে সমালোচনার ঝড় তুলেছে। এই ছবিকে বলা হচ্ছে শরণার্থী ও অভিবসান প্রত্যাশী মানুষের বিভীষিকাময় ও মানবেতর পরিস্থিতিরই প্রতিচ্ছবি। এই শিশুটির পরিবার সিরিয়ার কোবানি শহরের বাসিন্দা। যারা একটু ভালো জীবনের আশায় বিপদসঙ্কুল পথে ইউরোপে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয়ের চেষ্টা করছিলো।
যুদ্ধাক্রান্ত সিরিয়া ও সাহারা মরুভূমির দক্ষিণের দেশগুলোর নাগরিকরদের পাশাপাশি বাংলাদেশিরাও ইউরোপ যেতে এই বিপদসঙ্কুল পথ বেছে নিচ্ছে। গত সপ্তাহে লিবিয়ার যোওয়ারা এলাকা দিয়ে ইটালি যাওয়ার সময় দুইটি নৌকা ডুবে গেলে ২৪ বাংলাদেশিসহ প্রায় ২০০ জন প্রাণ হারিয়েছেন। উদ্ধার করা হয়েছে আরো ৫৪ বাংলাদেশিকে। পরদিন ইউরোপের দেশ অস্ট্রিয়ায় জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে বাংলাদেশিসহ ২৬ জনকে। লিবিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের প্রবাসী বাংলাদেশির পাশাপাশি পাচারকারীদের খপ্পরে পড়ে বাংলাদেশ থেকেও অনেকে এই পথে যাওয়ার চেষ্টা করছে ইউরোপে। বিশ্লেষকরা বলছেন, জীবনের ঝুঁকি সত্ত্বেও উন্নত জীবনের আশায় প্রবাসীরা দেশে না ফিরে ইউরোপে যেতে চাইছেন। এছাড়া বৈধ পথে বিদেশে কাজের সুযোগ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সীমিত হয়ে পড়ায় অনেকেই অবৈধভাবে যেতে চাইছেন।
গত শুক্রবার জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৫ সালের প্রথম আট মাসে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পৌঁছানো শরণার্থী ও অভিবাসীর সংখ্যা তিন লাখ ছাড়িয়েছে। এই সমুদ্রযাত্রায় প্রায় আড়াই হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। কেন হঠাত্ করে ইউরোপে শরণার্থীদের উপচে পড়া ভিড়? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুদ্ধ-বিগ্রহ, আর্থ-সামাজিক নিরাপত্তার অভাবই অন্যতম কারণ। একটু ভালো থাকার আশায় অনেক দেশের মানুষ ইউরোপে যাবার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। এজন্য তারা লিবিয়াকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করছে।
লিবিয়ায় আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। যে কারণে দেশটিতে অবস্থানরত ২০ হাজারের বেশি বাংলাদেশির অনেকেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে ইউরোপ যেতে চাইছে। লিবিয়ায় সব সম্পত্তি বিক্রি করে অনেকে শিশুসহ পরিবার নিয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেয়ার চেষ্টা করছেন। শুধু লিবিয়া থেকে নয় বাংলাদেশ থেকেও পাঁচ থেকে ছয় লাখ টাকার বিনিময়ে বাংলাদেশিদের ইউরোপে পাঠানোর জন্য সক্রিয় রয়েছে পাচার চক্র। কূটনৈতিক সূত্র জানায়, একটি পাচার চক্র প্রতিমাসে পাঁচ শতাধিক বাংলাদেশিকে জাল ভিসা ও কাগজপত্র তৈরি করে বিমানে করে মধ্যপ্রাচ্য হয়ে লিবিয়ায় নিয়ে আসছে। পরে লিবিয়া থেকে গ্রিস বা ইটালির উদ্দেশে তাদেরকে ট্রলারে তুলে দেয়া হয়। কয়েক মাস আগে এই বিষয়টি উল্লেখ করে বাংলাদেশের লিবিয়া দূতাবাস ঢাকায় একটি প্রতিবেদন পাঠায়। ফলে গত দুই মাস ধরে পাচারকারীদের এই প্রবণতা কিছুটা কমলেও তা এখনো থামেনি।
অবৈধভাবে বাংলাদেশিদের ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টার বিষয়ে বাংলাদেশ অভিবাসী মহিলা শ্রমিক অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক (বমসা) সুমাইয়া ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, গত কয়েক বছর ধরে চলা অস্থিরতা সত্ত্বেও লিবিয়ায় অবস্থানরত ২০ হাজারের বেশি বাংলাদেশির অনেকেই দেশে ফিরতে চান না। এর কারণ তাদের আর্থিক অবস্থা। অনেক শ্রমিকই লিবিয়া যেতে দেশে ধার-দেনা করে গেছেন। এখন খালি হাতে তারা দেশে ফিরতে চান না। কেউ কেউ ইউরোপে যেতে অবৈধ পথ বেছে নিচ্ছেন। তিনি বলেন, দেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ কম হওয়াটাও অন্যতম কারণ। সরকার এসব বিদেশ ফেরত কর্মীকে অন্য দেশে প্রেরণের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দিলে এবং অভিবাসন খরচে সহায়তা দিলে হয়তো লিবিয়াসহ গোলযোগপূর্ণ দেশগুলোতে জীবনে ঝুঁকি নিয়ে বেঁচে থাকা মানুষগুলো দেশ ফিরতে আগ্রহী হবে।
সাগর বুকে মৃত্যু সিরীয় শিশুর
ইউরোপে দালালদের সহায়তা নিতে হয় অভিবাসীদের। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবরে বলা হচ্ছে, অনেক সময় অভিবাসী-শরণার্থীদের নৌকায় তুলে সেটি মাঝ সমুদ্রে ডুবিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করে পাচারকারীরা। এরপর তারা উদ্ধারকারীদের খবর দেয়, যেন তাদের উদ্ধার করে আশ্রয় দেয়া হয়; কিন্তু বিপজ্জনক এই প্রক্রিয়ায় মাঝপথে মারা পড়ছে অনেক মানুষ। রেহাই পাচ্ছে না নারী-শিশুরাও।
গত বুধবার দক্ষিণ তুরস্কের বাদরাম তীরে এক সিরীয় শরণার্থী শিশুর লাশ ভেসে আসে। গ্রিসের কস দ্বীপে যাওয়ার চেষ্টাকালে ডুবে যাওয়া শরণার্থীবাহী নৌযানে ছিলো শিশুটি। সাগরপাড়ে এই শিশুর পড়ে থাকা মরদেহের ছবি বিশ্ববাসীকে স্তম্ভিত করেছে। শিশুটির নাম আইলান কুর্দি। বয়স তিন বছর। তুরস্কের গণমাধ্যমগুলো তার পরিচয় নিশ্চিত করেছে। কানাডায় শরণার্থী হিসেবে বসবাসের জন্য তার পরিবার আগেই আবেদন করেছিলো। সেই আবেদন প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর ইউরোপে আশ্রয়ের চেষ্টা করে তার পরিবার। এই দুর্ঘটনায় তার পাঁচ বছর বয়সী ভাই ঘালিব ও মা রেহান মারা গেছেন। যদিও তার বাবা আব্দুল্লাহ জীবিত রয়েছেন।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো বলছে, যুদ্ধ আর বঞ্চনার কারণে এসব নিরীহ মানুষ শরণার্থী হওয়ার চেষ্টা করছে। এটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কালে সৃষ্ট পরিস্থিতির মতোই। নীল প্যান্ট আর লাল জামা পরিহিত শিশু আইলানের ছবি সাগরে ভেসে আসা অভিবাসীদের দিকে বিশ্বকে আরো মনোযোগ দেয়ার আহ্বান জানাচ্ছে। একইসঙ্গে সরকারগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করছে পালিয়ে আসা শরণার্থীদের স্বাগত জানাতে।
সাম্প্রতিককালে অভিবাসন সমস্যা মারাত্মক রূপ নিয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত প্রায় তিন লাখ লোক ইউরোপের কয়েকটি দেশে আশ্রয় নিয়েছে। হঠাত্ অভিবাসীদের এই ঢেউ সামাল দিতে জরুরিভাবে আলোচনায় বসছেন ইউরোপের নেতারাও।
