পানিবন্দী মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে

আপডেট : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০১৫, ০১:৩৩
উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অব্যাহত বন্যায় পানিবন্দী মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে। পানিতে ডুবে জামালপুরে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বন্যার কারণে ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষা ব্যবস্থা। শত শত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এখনো বন্ধ রয়েছে। কোন কোন স্থানে নদী ভাঙনের আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে মানুষ। বন্যাকবলিত এলাকার পঞ্চম শ্রেণীর মডেল টেস্ট সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে।

জামালপুর প্রতিনিধি: জেলার ইসলামপুর উপজেলার মুন্নিয়ারচর এলাকায় সাড়ে তিন বছরের এক শিশু কন্যা কণিকা বন্যার পানিতে ডুবে মারা গেছে। তার বাবার নাম আব্দুর রহিম।

সদরপুর (ফরিদপুর): উপজেলা পদ্মা ও আড়িয়াল খাঁয় গত ৩ দিনে ২১ সে. মি. পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ৪৬ সে.মি উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে উপজেলার ৫টি ইউনিয়নের প্রায় ৬ হাজার পরিবার পানিবন্দী অবস্থায় মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে। পদ্মার ভাঙনে চরনাছিরপুর ইউনিয়নের কাড়াল কান্দি এলাকায় প্রায় ২০ হাজার একর জমি, ১৩৬টি ঘর-বাড়ি নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। আড়িয়াল খাঁর ভাঙনে ৩ শতাধিক ঘর-বাড়ি ও ১ হাজার একর জমি বিলীন হয়ে গেছে। বন্যা কবলিত এলাকায়  দিনমজুর, দরিদ্র ও হতদরিদ্র জনগণ কর্মহীন হয়ে অর্থাভাবে দিন কাটাচ্ছে।

গাইবান্ধা প্রতিনিধি: জেলায় বন্যা পরিস্থিতি আরো অবনতি হয়েছে। হুমকির মুখে পড়েছে ঘাঘট নদীর গাইবান্ধা শহর রক্ষা বাধা। ঘাঘট নদীর পানিতে লক্ষ্মীপুর-গাইবান্ধা ও সাদুল্লাপুর-গাইবান্ধা সড়কটির কিছু অংশ তলিয়ে গেছে। গতকাল আরো ১১৫টি গ্রামের ৫৫ হাজার ৫৩০ জন মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। ফলে জেলার সাত উপজেলার ৮২টির মধ্যে ৬৫টি ইউনিয়নের ৫শ ৩১টি গ্রামের ৩ লাখ ৫৮ হাজার ১৭৮ জন পানিবন্দী মানুষ নানা দুর্ভোগের মধ্যে মানবেতর জীবনযাপন করছে। পানিবন্দী এসব লোকজন আশ্রয় নিয়েছে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ, স্কুল-কলেজ ও আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে। আবার অনেকে ঘরের মধ্যে মাচা করে রাত যাপন করছে। নতুন করে আরো ১৫ হাজার ২১৬ হেক্টর জমির ফসল পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। এতে করে জেলায় এখন পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে ৫৪ হাজার ৬৬৪ হেক্টর জমির ফসল। নতুন করে ১৯৭ কি.মি কাঁচা রাস্তা বিধ্বস্ত হওয়ায় এখন মোট বিধ্বস্ত কাঁচা রাস্তা ৪৩১ কি.মি। ফলে গাইবান্ধায় যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। গত ৬ সেপ্টেম্বর থেকে গোটা জেলায় শুরু হওয়ার কথা পঞ্চম শ্রেণির মডেল টেস্ট পরীক্ষা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে।

বন্যা এক টানা দুই সপ্তাহ অব্যাহত থাকায় কর্মহীন শ্রমজীবী পরিবারগুলো খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকটে পড়েছে। গো-চারণ ভূমিগুলো জলমগ্ন থাকায় গো-খাদ্যের সংকটও দেখা দিয়েছে; কিন্তু সরকারি ত্রাণ তত্পরতা অপ্রতুল। ত্রাণ তত্পরতা নাই বে-সরকারি কোন সংস্থার। কোন সংসদ সদস্যও দুর্গত এলাকায় এখন পর্যন্ত দেখা যায়নি। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এ কে এম আমিরুল ইসলাম জানান,  পানিতে নিমজ্জিত হওয়ায় জেলায় ১৬৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠদান বন্ধ রাখা হয়েছে।

চৌহালী (সিরাজগঞ্জ): এনায়েতপুর এবং চৌহালী থানার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। ১০টি ইউনিয়নের অন্তত অর্ধ শতাধিক গ্রামের অর্ধ লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। টিউবয়েল তলিয়ে যাওয়ায় দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ খাবার পানির অভাব। অনাহারে-অর্ধাহারে তাদের দিন কাটছে।

বগুড়া প্রতিনিধি ও সারিয়াকান্দি: যমুনা নদীর পানি ১ সেন্টিমিটার কমলেও এখনো বিপদসীমার ৭৮ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বাঙালি নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। সারিয়াকান্দি উপজেলার ৭২টি গ্রামের লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। বন্যায় ৩ হাজার ৬৪৫ হেক্টর আমন ক্ষেত পানিতে তলিয়ে গেছে। বাঙালি নদীতে পানি বৃদ্ধির ফলে পানি উন্নয়ন বোর্ড জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণের কাজ করছে। সোনাতলা উপজেলায় প্রায় ৩০ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে।

শেরপুর (বগুড়া): উপজেলার সাহেববাড়ি বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে ভাঙন শুরু হয়েছে। বিনোদপুর তালপট্টি এলাকার একটি অংশের প্রায় পুরোটাই বাঙালি নদীতে বিলীন হয়েছে। নতুনভাবে প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে এলাকার মানুষ।

চাটমোহর (পাবনা): পাবনার চাটমোহরে বন্যার পানি বাড়ছে। প্লাবিত হচ্ছে নতুন নতুন এলাকা। উপজেলার নিমাইচড়া, হান্ডিয়াল ও ছাইকোলা ইউনিয়নের ১৫ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। শতাধিক পরিবার বাঁধে আশ্রয় নিয়েছে। বেশ কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পানি ওঠার কারণে লেখাপড়া চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

ভূঞাপুর (টাঙ্গাইল): বন্যায় সড়ক ভেঙে ইজারা নেয়া ৫টি সরকারি পুকুর থেকে অর্ধকোটির টাকার মাছ ভেসে গেছে। ৫টি পুকুরের ৫০ লক্ষাধিক টাকার মাছ ছিল। মাছ ভেসে যাওয়ায় সর্বস্বান্ত হয়ে চাষি মিজানুর রহমান এখন পাগল প্রায়।

কাজীপুর (সিরাজগঞ্জ): উপজেলায় ৪৫টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ৪২টি গ্রাম ডুবে গেছে। ফলে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষার প্রস্তুতির লক্ষ্যে নির্ধারিত মডেল টেস্ট অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করা হয়েছে।

চলনবিল (সিরাজগঞ্জ): চলনবিলের সর্বত্রই পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় মানুষ বাড়িঘর ছেড়ে হাটবাজারে যাওয়া প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে দুর্ভোগে রয়েছে বানভাসী মানুষ।

সরাইল (ব্রা??হ্মণবাড়িয়া): বন্যায় সরাইলের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। অব্যাহত রয়েছে পানি বৃদ্ধি। গতকাল পর্যন্ত ১০০ হেক্টর বীজতলা ও ২৩০ হেক্টর সদ্য রোপা আমন তলিয়ে গেছে।

শেরপুর প্রতিনিধি: ব্রহ্মপুত্র নদে পানিবৃদ্ধির ফলে সদর উপজেলার চরাঞ্চল শতাধিক গ্রাম বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে। অব্যাহত রয়েছে নদী ভাঙন। প্রতিদিনই নতুন নতুন গ্রাম প্লাবিত হচ্ছে। বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধের পুরনো ভাঙনের স্থান থেকে পানি প্রবেশ করায় ৩০ গ্রামের কয়েক হাজার হেক্টর ফসলের জমি ও সবজি ক্ষেত তলিয়ে গেছে।