রাজধানীর আজিমপুরে বাস করেন অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষিকা জাহানারা বেগম। গত মে মাসে তার নামে ৭ লাখ ৮৫ হাজার টাকার বিল দেয়া হয়। ৫৯২ রসুলপুরের যেই স্থাপনার বিপরীতে ঐ বিল ধার্য করা হয় সেখান থেকে ২০০৫ সালে বিদ্যুতের মিটার খুলে নেয়া হয়েছিল। বর্তমানে ঐ ঠিকানায় কোনো স্থাপনা বা বসতি নেই। অথচ ২০০৭ সালের আগস্ট থেকে ঐ ঠিকানায় জাহানারার নামে শূন্য থেকে ২৬১ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুত্ বিল করা হচ্ছে। ফলে বিল ও বকেয়া বাবদ তার মাথায় চাপে ৭ লাখ ৮৫ টাকার বোঝা। এ নিয়ে তিনি ডিপিডিসিতে অভিযোগ করেন।
গত জুনে তার অভিযোগের প্রেক্ষিতে তদন্ত রিপোর্ট দেয়া হয়। রিপোর্টে বলা হয়, ২০০৭ সালের আগস্টের বিলে ‘লাইন কাটা’ শব্দটি সংযোজিত ছিল। এরপর থেকে ঐ ঠিকানায় বিদ্যুত্ সংযোগ ছিল না। কিন্তু বিদ্যুত্ অফিসে প্রতিমাসে ঐ ঠিকানার বিল রেখে দেয়া হত। এ অযৌক্তিক বিল জারির জন্য ডিপিডিসির ঐ এলাকার তখনকার একজন মিটার রিডার, ফিডার ইনচার্জ, ব্যবস্থাপক ও সহকারী ব্যবস্থাপকসহ (কারিগরি) কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী দায়ী। ২৪ জুন জাহানারা বেগমের বিদ্যুত্ বিল সংশোধন করে দেয়া হয়।
রাজধানীর মগবাজারের এক বাসিন্দার মাসিক বিদ্যুত্ বিল ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। জুন মাসের বিদ্যুত্ বিল বাবদ তিনি প্রায় আড়াই হাজার টাকার বিল পান। অভিযোগের পর তদন্তে দেখা যায়, ভুল রিডিংয়ে তার ব্যবহারের চেয়ে বেশি ইউনিট দেখিয়ে দেড় হাজার টাকা বেশি বিল করা হয়েছে।
রাজধানীর সিংহভাগ ও নারায়গঞ্জে বিদ্যুত্ বিতরণ করে ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি)। এর গ্রাহক সংখ্যা প্রায় সাড়ে নয় লাখ। কোম্পানির এই দুই গ্রাহকের মতো রাজধানীতে হাজার হাজার গ্রাহক ভুল, অযৌক্তিক ও অন্যায় বিল আরোপের শিকার হচ্ছেন। এই দুজন প্রমাণ দিয়ে এবং ছুটোছুটি করে বিল সংশোধন করতে পারলেও অধিকাংশ ভুক্তভোগী গ্রাহকের ক্ষেত্রেই তা সম্ভব হয় না।
শারীরিক হয়রানি এড়াতে অনেক গ্রাহক ভুল বা অযৌক্তিক বিলের বিপরীতে অর্থ পরিশোধ করে দেন। আবার অনেকে চেষ্টা করেও প্রমাণের অভাবে ভুল বিল সংশোধন করতে পারেন না। মিটারে কারিগরি ত্রুটি এবং মিটার রিডারদের খামখেয়ালি ও দুর্নীতির কারণে ভুল বিদ্যুত্ বিলে হয়রানি ও ভোগান্তিতে পড়ছেন গ্রাহকরা। মিটার রিডারসহ সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের এক শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রতারণার শিকারও হচ্ছেন তারা।
বিদ্যুত্ গ্রাহকদের এ ধরনের হয়রানি ও ভোগান্তি লাঘবের দায়িত্ব বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি)। তবে গ্রাহকরা এ বিষয়ে তেমন কিছু জানেন না। তাই কমিশনে অভিযোগও যায় কম। কমিশন সূত্রে জানা যায়, তাদের কাছে ডিপিডিসি ও ডেসকোসহ বিদ্যুত্ বিতরণকারী সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে বিল নিয়ে ভোগান্তির অভিযোগ আসছে। তবে তা পরিমাণে খুব বেশি নয়। লিখিত অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গ্রাহকদের অভিযোগ নিষ্পত্তি করা হয়।
ডিপিডিসিতেও অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা রয়েছে। এ বছর ডিপিডিসিতে জমা করা কয়েকটি লিখিত অভিযোগ বিশ্লেষণে বেশ কয়েকটি চাঞ্চল্যকর ভুল ও অন্যায় বিলের সন্ধান পাওয়া গেছে। ভুক্তভোগীদের মধ্যে নিম্ন আয়ের ব্যক্তি থেকে ব্যাংক ও বড় কর্পোরেট অফিসও রয়েছে।
যেমন বেসরকারি ব্যাংক এনসিসি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের গত ফেব্রুয়ারি মাসের বিপরীতে দুইটি পৃথক বিদ্যুত্ বিল ইস্যু করা হয়। ১০ মার্চ তারিখে ইস্যুকৃত দুটি বিলের প্রথমটিতে বিলের পরিমাণ ৫ লাখ ৯৫ হাজার টাকা আর দ্বিতীয়টিতে ৯ লাখ ৪৩ হাজার টাকা। এ নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি ডিপিডিসিতে অভিযোগ করলে তদন্তে দেখা যায়, ইস্যুকৃত দুটি বিলে দুই ধরনের অফ পিক রিডিং দেখানো হয়েছে। অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়ের উদ্দেশ্যে অগ্রিম বিল হিসেবে ৩ লাখ ৪৭ হাজার টাকা আদায় করা হয়েছে।
বেইলী স্কয়ারে বসবাসরত সরকারের একজন উপ-সচিবের নামে মাত্র ১২২ টাকা মাসিক বিদ্যুত্ বিল করা হয় কয়েক মাস ধরে। সম্প্রতি ডিপিডিসির বিশেষ টাস্কফোর্সের অনুসন্ধানে বিষয়টি ধরা পড়ে। মিটার রিডিংয়ে ইউনিট কম দেখিয়ে এত কম বিল নির্ধারণ করা হত।
নারায়ণগঞ্জের একটি স্টিল রি-রোলিং মিলস বকেয়া বিদ্যুত্ বিল বাবদ ২০ লাখ ১৭ হাজার টাকা গত বছরের ২৪ নভেম্বর পরিশোধ করে। এরপরও পরের মাসে তার নামে পূর্বের পরিশোধকৃত বকেয়াসহ বিল জারি করা হয়। ঢাকার খিলগাঁওয়ের ইদ্রিস আলী মারা গেছেন ২২ বছর আগে। কিন্তু এখন পর্যন্ত তার নামে বিদ্যুত্ বিল জারি করা হচ্ছে। গত জুলাই পর্যন্ত ৭ বছরে তার বকেয়ার পরিমাণ ৪৫ লাখ ২৩ হাজার টাকা। সংযোগটির বর্তমান গ্রাহক দীর্ঘদিন বিদ্যুত্ অফিসে ধর্না দিয়েও তার নামে সংযোগটি জারি করাতে পারেননি। উপরন্তু বিলের হিসাব নির্ধারণ ও জারিতে ব্যাপক কারচুপি ও অনিয়মের আশ্রয় নেয়া হয়েছে।
রাজধানীতে ডিপিডিসির কয়েকটি আঞ্চলিক অফিস পরিদর্শন ও গ্রাহকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, আঞ্চলিক কার্যালয়গুলোতে অভিযোগ জানিয়ে প্রতিকার পাওয়া যায় না বরং হয়রানির শিকার হতে হয়। বিইআরসিতে কিংবা ডিপিডিসির প্রধান কার্যালয়ে অভিযোগ জানিয়ে প্রতিকার পাওয়া যায়। তবে তা সময়সাপেক্ষ হওয়ায় অনেক সময় অভিযোগ কিংবা ভুল প্রমাণ করা যায় না। তাই ভোগান্তিও দূর হচ্ছে না।
ডিপিডিসির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, আঞ্চলিক অফিসগুলোর একশ্রেণির কর্মকর্তার অসততা, অদক্ষতা এবং মিটার রিডারদের দুর্নীতি ও খামখেয়ালির কারণে ভুল বা অযৌক্তিক বিল ইস্যু করা হয়। গ্রাহকদের দুর্নীতির অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তি করা গেলে এ ধরনের অন্যায় কর্মকাণ্ড বন্ধ করা যাবে।
ডিপিডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. নজরুল হাসান বলেন, বিল নিয়ে কিছু গ্রাহক ভোগান্তিতে পড়েন। এটি অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে লিখিতভাবে যে অভিযোগ পাওয়া যায় তা নিষ্পত্তি ও ন্যায়বিচার করা হয়। তবে বর্তমানে ব্যবস্থাপনা উন্নত করা হচ্ছে। এতে গ্রাহকদের এ ধরনের ভোগান্তি কমে আসছে। এ হয়রানি শূন্যতে নামিয়ে আনতে কাজ করা হচ্ছে।
