নরসিংদী :খুন যেখানে মামুলি ব্যাপার

আপডেট : ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৫, ০০:৩৬

নরসিংদীতে খুন এখন ডাল-ভাত। জমি সংক্রান্ত বিরোধ, মাদক ব্যবসা নিয়ে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বেশিরভাগ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। এছাড়া অনেক সময় অন্য এলাকা থেকে এসে লাশ ফেলা হয় এখানে। অনেক হত্যাকাণ্ডের কোনো ক্লু পাওয়া যায় না। কেউ হত্যা মামলায় সাক্ষ্যও  দিতে চায় না। প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো এলাকায়  খুন সংঘটিত হচ্ছে।

 
জানা যায়, ২০১১ সালে নরসিংদীর পৌর মেয়র লোকমান হোসেনকে গুলি করে হত্যা করার পর গত প্রায় ৪ বছরে নরসিংদী জেলায় কমবেশি ৫২৮ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। নরসিংদী সদরে ১৩০টি, রায়পুরায় ১৩৫টি, শিবপুরে ৮৮টি, বেলাবতে ৫০টি, পলাশে ৬৫টি ও মনোহরদী উপজেলায় ৬০টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। 
 
জানা গেছে, স্বাধীনতার পর থেকে এই জেলায় প্রায় আড়াই হাজার হত্যাকাণ্ড ঘটে। দেখা গেছে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই খুনিরা উপযুক্ত সাজা পায়নি। বর্তমানে জেলায় চারশ’ হত্যা মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
 
সর্বশেষ দুটি হত্যাকাণ্ড হয়েছে মাধবদী এলাকায়। গত ৪ সেপ্টেম্বর রাতে মাধবদী শহরের পুরাতন রেলস্টেশন এলাকায় বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে এক পরিবহন শ্রমিককে গলা কেটে হত্যা করা হয়। ৫ সেপ্টেম্বর মাধবদী এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয় অজ্ঞাতনামা এক গলাকাটা লাশ।
 
এর আগে হিন্দু সম্প্রদায়ের উল্টো রথ যাত্রার দিন ঘোড়াশাল পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র সুপ্রিয় সাহা পিংকনকে হত্যা করে শীতলক্ষ্যা নদীতে ফেলে দেয়া হয়। গত ২ আগস্ট নরসিংদী শহরে ব্রাহ্মন্দী বালুচর এলাকায় সংঘটিত হয় ভয়াবহ এক হত্যাকাণ্ড। গুপ্তঘাতকরা নরসিংদী কেমিস্ট এন্ড ড্রাগিস্ট সমিতির সভাপতি ওষুধ ব্যবসায়ী ও সেলিম মেডিক্যাল হলের মালিক হাজী সেলিম মিয়াকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করে। এমনি করে দিনের পর দিন সংঘটিত হচ্ছে ভয়াবহ সব হত্যাকাণ্ড।
 
ঘাতকরা নরসিংদী সদর থানার পাইকারচর ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল কাশেমকে নির্মমভাবে হত্যা করে। একইভাবে আলোকবালী ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল রাজ্জাক সরকার হত্যাকাণ্ডের শিকার হন খোদ নরসিংদী শহরে।
 
এর আগে আলোকবালী ইউনিয়ন যুবদলের যুগ্ম সম্পাদক রাজা মিয়াকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ২০১১ সালের ১৫ মার্চ নরসিংদী সরকারি কলেজের দ্বিতল ভবনে ঢুকে একটি বাথরুমের ভিতর বীভত্সভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয় নরসিংদী সরকারি কলেজের জিএস রনিকে। বছর দুয়েক পূর্বে প্রদীপ দাস নামে এক যুবককে হাত-পা বেঁধে হত্যা করে লাশ ছালার ভিতর ভর্তি করে মেঘনা নদীতে ফেলে দেয়া হয়।
 
মাস ছয়েক আগে পুরানপাড়া বনবিভাগ এলাকায় ইছাক নামে এক কিশোরকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। বছর দুয়েক পূর্বে শীলমান্দী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল হান্নানকে কুপিয়ে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। গত বছর পলাশের পারুলিয়া এলাকায় গজারিয়া ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক লিমন মৃধাকে কুপিয়ে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা।
 
মাস দেড়েক আগে মাধবদী এলাকায় মাদক ব্যবসাকে কেন্দ্র করে এক যুবককে গলা কেটে হত্যা করা হয়। একই এলাকায় গত দুই বছরে ৪ ব্যক্তিকে বিভিন্নভাবে হত্যা করা হয়। এক বছর আগে ব্রাহ্মন্দী নয়াবাজার এলাকার হূদয় নামে এক দোকান কর্মচারীকে প্রকাশ্য দিনদুপুরে দোকানের ভিতর হত্যা করে লাশ বস্তায় ভরে রাখে। পলাশের চরসিন্দুরে দুই স্বামী-স্ত্রীকে ঘরের ভিতর হত্যা করে গুপ্তঘাতকরা।
 
প্রায় দুই মাস আগে চরনগরদী বাজারে একটি করাত কলের মালিককে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। ৮ মাস আগে শিবপুরের কারারচর এলাকায় প্রকাশ্য দিনদুপুরে পুটিয়া ইউপি সদস্য আরিফ পাঠানকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এর আগে একই এলাকায় দুলাল ভান্ডারী নামে এক ব্যক্তিকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
 
২০১৪ সালের মধ্যভাগ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত নরসিংদী জেলার বিভিন্ন স্থানে ৪৩টি বেওয়ারিশ লাশ পাওয়া যায়। গত ৮ মাসে বেওয়ারিশ লাশ পাওয়া গেছে ৪৪টি।
 
এসব লাশের একটির পরিচয়ও উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ। মামলাগুলোর কোন তদন্ত হচ্ছে না। প্রতিটি মামলার তদন্তই ফাইলচাপা পড়ে রয়েছে। কোথাও কোন হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হলে থানায় মামলা দায়ের করা হলেও পুলিশ ক্লু খুঁজে পায় না। বাদী দুর্বল হলে পুলিশ কোন আসামিকেই গ্রেফতার করতে খুব একটা আগ্রহী হয় না। এরকম বহু সংখ্যক হত্যা মামলা বর্তমানে বিভিন্ন থানায় ফাইলচাপা পড়ে রয়েছে। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তারা দায়সারা গোছের একটি চার্জশিট দিয়ে নিজেদের দায়িত্ব পালন করে। পক্ষান্তরে ক্ষতিগ্রস্ত হয় মামলার বাদী পক্ষ।
 
এমনইভাবে বছরের পর বছর ধরে নরসিংদী জেলার বিভিন্ন থানায় বহু মামলা ফাইলচাপা পড়ে রয়েছে। এসব মামলার তদন্ত কার্যক্রম ভবিষ্যতে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তার কোন নিশ্চয়তা পাওয়া যাচ্ছে না। খুনি-সন্ত্রাসীদের বিচার চেয়ে নরসিংদী শহরে পোস্টারিং, মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করেছে ভুক্তভোগী, তাদের আত্মীয়-স্বজন ও সমর্থকরা।
 
নরসিংদী জেলা ও দায়রা জজ আদালতে প্রায় চারশ খুনের মামলা বিচারাধীন রয়েছে বলে একটি সূত্রে জানা গেছে।
 
নরসিংদী সহকারী পুলিশ সুপারের অফিস সূত্রে জানা গেছে, তাদের কাছে প্রায় ১৮০টি খুনের মামলা তদন্তাধীন রয়েছে। তথাকথিত সর্বহারা পার্টির হাতে ১৯৭২ সাল থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত ১৫ বছরে নরসিংদী জেলার মনোহরদী উপজেলার এমপি এড. গাজী ফজলুর রহমান, শিবপুর উপজেলার এমপি রবিউল আউয়াল খান কিরন, মনোহরদী থানার ওসি, বেশ কয়েকজন ইউপি চেয়ারম্যান, ইউপি সদস্য, শিক্ষক, রাজনৈতিক নেতা, সমাজ সেবকসহ প্রায় ৫০০ ব্যক্তি খুন হয়েছে। তবে বিএনপি-জামায়াতের আমলে নরসিংদীর অবস্থা আরও খারাপ ছিলো। এমপি কিরন হত্যাকাণ্ডে চারজনের যাবজ্জীবন সাজা হয়। পরে আসামিরা জামিনে বের হয়ে আসেন।
 
নরসিংদীর এসপি আমেনা বেগম বলেন, আমি এখানে নতুন এসেছি। সবকিছু পর্যবেক্ষণ করছি। হত্যাকাণ্ড রোধ করতে যা করণীয় সেটাই করা হবে।
 
পুলিশের আইজি একেএম শহীদুল হক বলেন, নরসিংদীর সাবেক পৌর মেয়র লোকমান হত্যাকাণ্ডের পর সরকার কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। এখন অনেকটা নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। বেশিরভাগ হত্যাকাণ্ডে ক্লু না থাকায় রহস্য উদঘাটন করা যায় না।