কর্পোরেট মহাভারত!

আপডেট : ০৭ মার্চ ২০১৯, ১৯:২৮

বুকারজয়ী কথাসাহিত্যিক অরুন্ধতী রায় সাহিত্যের বাইরেও রাষ্ট্র, মানুষের অধিকার, সামাজিক বৈষম্য ইত্যাদি নিয়ে নানা সময়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে লিখে আলোচিত হয়েছেন। এই বুদ্ধিবৃত্তিক-কথাসাহিত্যিক সদ্যই ঢাকায় এসেছিলেন। তাঁর আগমনকে উপলক্ষ করে বেশ কয়েক বছর আগে লেখা এই প্রবন্ধটির অংশবিশেষ পত্রস্থ হলো

রকফেলার থেকে ম্যান্ডেলা, বেদান্ত থেকে আন্না হাজারে... কর্পোরেট করদবাক এসব বাক্যবীর আর কতকাল কেড়ে নেবে আমাদের আন্দোলন, বিদ্রোহ, আমাদের বিক্ষোভ?

কী বলা চলে এটাকে? শুধুই কী ইমারত, নাকি বাসাবাড়ি? নতুন ভারতের আধুনিক মন্দির কোনো, নাকি সেরেফ ভূতপ্রেতের আস্তানা? মুম্বাইয়ের আলতামন্ত সড়কে নিঃশব্দ আততায়ীর মতো দাঁড়িয়ে থাকা অতিকায় এ ভবনের নাম অ্যান্টিলা। ভবনটির জন্মপ্রক্রিয়া শুরুর পর থেকেই আমূল বদলে গেছে পরিবেশ। চারপাশে কিছুই নেই আর আগেকার মতো। ‘এই তো পৌঁছে গেছি আমরা’, জানালো গাইড বন্ধু, ‘নতজানু হয়ে প্রণাম করো আমাদের নতুন প্রভুর উদ্দেশে।’

অ্যান্টিলার গর্বিত মালিক ভারতের শীর্ষধনী মুকেশ আম্বানি। সর্বকালের অন্যতম ব্যয়বহুল এ ভবন সম্পর্কে অনেক কিছুই জানতে হয়েছে আমাকে। সাতাশ তলা উঁচু ভবনে হেলিকপ্টার অবতরণের জন্য রয়েছে মোট তিনটি হেলিপ্যাড। ওঠানামার জন্য আছে নয়টা লিফট, ঝুলন্ত বাগান, নাচের জন্য বলরুম। আছে ওয়েদার রুম আর জিমনেশিয়াম। একটানে গাড়ি উঠে যাবে ছয়তলা অবধি। প্রতি তালায় পার্কিংয়ের বিশাল আয়োজন। গোটা ভবনের চব্বিশ ঘণ্টা দেখভালের জন্য নিয়োজিত সাত শো কর্মী। আমাকে সবচেয়ে অবাক করে ২৭ তলা উঁচু এক কংক্রিটের দেয়াল, সারা দেহ জুড়ে ঘাসের কৃত্রিম লন। কংক্রিটের গায়ে বসানো ধাতব গ্রিডের সাথে অতি যত্নে একটা একটা করে আটকে দেয়া হয়েছে ঘাস। কোথাও কোথাও রোদে শুকিয়ে তা এখন মুড়মুড়ে। সবুজ পাতার ছেঁড়া টুকরো খসে পড়েছে এখানে ওখানে। উন্নয়নের ধারা ওপর থেকে গড়িয়ে নিচে নামার প্রক্রিয়াটি সম্ভবত যথাযথ কাজ করতে পারেনি এখানে।

যদিও এর উল্টোটা, নিচ থেকে ধাপে ধাপে ওপরের দিকে উঠে আসার প্রক্রিয়াটি কাজ করেছে নিখুঁত নিয়মে। এ কারণেই ১২০ কোটি মানুষের দেশে সর্বোচ্চ মাত্র একশ’ ধনীর পকেটে ঢুকে পড়ে জিডিপির এক চতুর্থাংশ। ফুটপাতের বাসিন্দা থেকে আরম্ভ করে নিউ ইয়র্ক টাইমস পর্যন্ত বলাবলি করছে এত্তো এত্তো টাকা খরচ করে প্রাসাদ তৈরির পরও সেখানে তারা নিজেরা কেউ এখনো গিয়ে উঠতে পারছে না কেন। কেন যে তা পারছে না, তা নিশ্চিত করে বলতে পারছে না কেউ। ফিসফাস করে কেউ কেউ বলে ভূত-প্রেত আর দুর্ভাগ্যের কথা, বাস্তুভূত আর ফেং শুইয়ের কথা। এও হতে পারে ভুলটা আসলে করেছিলেন কার্ল মার্ক্স। তাঁর কথা ছিল, পণ্য উত্পাদন আর পরস্পরের মধ্যে বিনিময়প্রথা চালু রাখার উদ্দেশ্যে এমন এক দৈত্যের জন্ম দেয় পুঁজিবাদ যার নিয়ন্ত্রণ নেই তার নিজের কাছে। অনেকটা হতভাগ্য সেই জাদুকরের মতো, মন্ত্র আউড়ে অন্ধকার থেকে ডেকে এনেছে এক ডাইনি, অথচ তাকে পোষ মানাবার ক্ষমতা সে খুইয়েছে বহু আগে।

ভারতে আইএমএফ সংস্কার-উত্তর মধ্যবিত্ত শ্রেণি আর বাজারব্যবস্থায় কুক্ষিগত আমরা ৩০ কোটি। মরজগতের বাসিন্দাকুলের সাহচর্যে কাটছে আমাদের প্রতিটি দিন। মরে যাওয়া নদী, মরে যাওয়া কূপ, নিহত পাহাড় আর নগ্ন বনভূমির আত্মাগুলো। সাথে আছে ক্ষুদ্রঋণের যন্ত্রণায় আত্মঘাতী আড়াই লাখ কৃষকের সরল আত্মা। আর আছে হতভাগা ৮০ কোটি জন, আমাদের জন্য পথ করে দেবে বলে আনেক আগেই যারা হারিয়ে বসে আছে সর্বস্ব। জীবন টিকিয়ে রাখতে প্রতিদিন যাদের জন্য রাষ্ট্রের বরাদ্দ মাত্র বিশ রুপি।

ব্যক্তিগতভাবে মুকেশ আম্বানির সম্পত্তির পরিমাণ দুই হাজার কোটি মার্কিন ডলার। রিলায়ান্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের (আরআইএল) শেয়ারের বৃহত্তর অংশ তার নিয়ন্ত্রণে। কোম্পানির বাজার পুঁজির পরিমাণ প্রায় পাঁচ হাজার কোটি মার্কিন ডলার। দুনিয়া জুড়ে পেট্রোকেমিক্যাল, তেল-গ্যাস, পলিস্টার সুতো, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, খাবারদাবারের খুচরা ব্যবসা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, জৈব বিজ্ঞান গবেষণা এবং স্টেম সেল সংরক্ষণের ব্যবসা রয়েছে তাদের। মাত্র কিছুদিন আগে তারা কিনেছে ইনফোটেলের ৯৫ শতাংশ শেয়ার। রিলায়ান্সের কব্জায় রয়েছে সিএনএন-আইবিএন, আইবিএন লাইভ, সিএনবিসি, আইবিএন লোকমত এবং ইটিভির পাশাপাশি প্রতিটি আঞ্চলিক ভাষায় সংবাদ এবং বিনোদন প্রচারকারী ২৭টি টেলিভিশন চ্যানেল। ইনফোটেলের দখলে আছে চতুর্থ প্রজন্ম ব্রডব্যান্ড-এর একচেটিয়া লাইসেন্স, হাইস্পিড তথ্য পাইপলাইন, যাকে এখন বলা হচ্ছে তথ্য বিনিময়ের ভবিষ্যত্। ওহ হো! সেই সঙ্গে আস্ত একটা ক্রিকেট টিমও রয়েছে মিস্টার আম্বানির।

ভারত নামের দেশটিকে পরিচালনাকারী হাতে গোনা কয়েকটি কর্পোরেটের অন্যতম রিলায়ান্স। অন্যগুলোর মধ্যে রয়েছে টাটাস, জিন্দালস, বেদান্ত, মিত্তালস, ইনফোসিস, এসার এবং মুকেশের ভাই অনিলের মালিকানাধীন ‘আদাগ’-এর আওতাভুক্ত অন্যান্য রিলায়ান্স। দুনিয়াজোড়া লুটপাটের দৌড়ে নেমে ইতোমধ্যেই তারা ছড়িয়ে পড়েছে ইউরোপ, মধ্য এশিয়া, আফ্রিকা আর লাতিন আমেরিকায়। ব্যাপক পরিসরে ছড়ানো হয়েছে শোষণের জাল : কোথাও দৃশ্যমান, কোথাও অদৃশ্য; কোথাও ভূপৃষ্ঠে, কোথাও ভূগর্ভে। নমুনাস্বরূপ টাটার কথা ধরা যাক। বিশ্বের ৮০টি দেশে একশ’র ওপর কোম্পানির নামে বাণিজ্য পরিচালনা করছে তারা। বেসরকারি খাতে ভারতের সর্ববৃহত্ বিদ্যুত্ উত্পাদনকারী। খনি, গ্যাসফিল্ড, ইস্পাত স্থাপনা, টেলিফোন, কেবল টিভি আর ব্রডব্যান্ড নেটওয়ার্ক, এমনকি গোটা শহর, কী নেই তাদের। তাদের উত্পাদিত শীর্ষ পণ্যের মধ্যে আছে বাসট্রাক। তাজ হোটেল নেটওয়ার্ক তাদের মালিকানাধীন। তারাই বানায় জাগুয়ার, ল্যান্ডরোভার, দাইয়ু আর টেটলি চা। চেইন বুকস্টোরের পাশাপাশি একটি প্রকাশনা কোম্পানি রয়েছে তাদের। এছাড়াও আছে শীর্ষ ব্র্যান্ডের আয়োডাইজড লবণ এবং শীর্ষ প্রসাধনী কোম্পানি ল্যাকমি। এ ধরনের একটি গ্রুপের বিজ্ঞাপনী ট্যাগলাইন হতেই পারে : আমাদের ছাড়া এক মুহূর্ত কি চলছে আপনার!

কর্পোরেট  বিধান অনুসারে, তোমার যত বেশি আছে, তুমি আরও তত বেশি পেতে পারো।

ব্যক্তিগত মালিকানাধীন এই সময়ের পৃথিবীর অন্যতম গতিশীল অর্থনীতি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে ভারতের অর্থনীতি। উপনিবেশ যুগের এখনো তার প্রধান রপ্তানি পণ্য বলতে তার ভূগর্ভস্থ খনিজ সম্পদ। ভারতের নবাগত যত মেগাকর্পোরেশন, যেমন—টাটাস, জিন্দালস, এসার, রিলায়ান্স আর স্টারলাইট, সবাই ছলে-বলে-কৌশলে নিজের অবস্থান করে নিয়েছে সেই পাইপলাইনের মুখে, মাটির গহিন থেকে অবিরল ধারায় তুলে আনছে তরল-কঠিন অর্থ। একজন বণিকের জন্য এর চাইতে মহত্প্রাপ্তি আর কী হতে পারে! যা কিনতে হচ্ছে না আদৌ, তা বিক্রি করেই কাঁড়িকাঁড়ি টাকা কামানোর এমন সুবর্ণ সুযোগ আর কী হতে পারে।

কর্পোরেট সম্পদ হাসিলের আরেকটি উেসর নাম ভূমিব্যাংক। দুনিয়া জুড়ে গজিয়ে ওঠা দুর্বলস্বভাবী দুর্নীতবাজ সরকারগুলো গত কয়েক দশকে উন্নয়নের নামে বিপুল পরিমাণ জমিজমা তুলে দিয়েছে ওয়ালস্ট্রিট দালাল, কৃষিবাণিজ্য কর্পোরেট আর চীনা ধনকুবেরদের হাতে। জলাধারগুলো বাদ পড়েনি এর আওতা থেকে। ঠিক এ মুহূর্তেও ভারতে কোটি কোটি মানুষের জমি অধিগ্রহণ করে ‘জনস্বার্থে’ তুলে দেয়া হচ্ছে কর্পোরেটদের কাছে। বলা হচ্ছে, এসব জায়গায় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, অবকাঠামোগত প্রকল্প, বড় বড় বাধ, মহাসড়ক, গাড়ি উত্পাদন কারখানা, রাসায়নিক স্থাপনা ইত্যাদি গড়ে তোলা হবে। ফরমুলা ওয়ান রেসিং পর্যন্ত বাদ পড়েনি তাদের জোগান দেয়া এ স্বপ্নমালা থেকে। অন্যান্য এলাকার মতো এখানকার স্থানীয় মানুষকে এটাই বোঝানো হয়েছে, ভূমি থেকে উচ্ছেদ কার্যক্রম মূলত আরও বেশি কাজের সুযোগ তৈরির মহান লক্ষ্যেই পরিচালিত হচ্ছে। যদিও এতদিনে আমরা জেনে গেছি, জিডিপি এবং কর্মসংস্থানের মধ্যে যোগসূত্র নির্মাণ এক কাব্যকল্প মাত্র। ২০ বছরের টানা প্রবৃদ্ধির পর ভারতের ৬০ ভাগ কর্মশক্তি এখনো কেবল নিজের দু’হাতের ওপর নির্ভরশীল। ৯০ ভাগ শ্রমশক্তি এখনো অসংগঠিত, প্রক্রিয়াধীন।

স্বাধীনতার পর থেকে আশি দশক অবধি গণমানুষের প্রতিটি আন্দোলন, নকশালবাড়ি থেকে আরম্ভ করে জয়প্রকাশ নারায়ণের পূর্ণক্রান্তি পর্যন্ত, পরিচালিত হয়েছে মূলত ভূমি সংস্কারের দাবিতে। সামন্ত প্রভুর হাত থেকে ভূমি কেড়ে নিয়ে ভূমিহীন কৃষকের হাতে তুলে দেয়ার দাবিতে। অথচ বর্তমানে এমন এক সময় পার করছি আমরা, যখন ভূমি কিংবা সম্পত্তির পুনর্বণ্টন নিয়ে কেউ কোনো কথা তুললে তাকে কেবল ‘অগণতান্ত্রিক’ নয়, রীতিমতো ‘পাগল’ অভিধায় ভূষিত করা হতে পারে। সবচেয়ে জঙ্গিবাদী যে আন্দোলন সেখানেও দাবিটা সীমিত রাখা হয়েছে কৃষকের হাতে অবশিষ্ট জমিটুকুর অধিকার টিকিয়ে রাখার দাবিতে। আমাদের মৌলিক আলোচনায় কখনো জায়গা করে নিতে পারে না ভূমিহারা সর্বহারা কোটি কোটি মানুষ যারা অধিকাংশই দলিত অথবা আদিবাসী। শেকড়চ্যুত হয়ে যারা ছড়িয়ে পড়েছে উজ্জ্বল মেগাসিটির উপেক্ষিত অন্ধকারে কিংবা ছোট ছোট শহরের ভুতুড়ে বস্তিতে।

ভূমি থেকে আহরিত সম্পদের তাকদে ক্ষমতার চূড়ায় নিজের অবস্থান আরও পোক্ত করার কাজে বুঁদ হয়ে আছেন আমাদের কোটিপতিগণ। আর একে বৈধ করতে স্রোতের মতো টাকা ছড়িয়ে দিচ্ছেন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসমূহের চোরাগলিতে। আদালত, পার্লামেন্ট আর গণমাধ্যমগুলো আজ টাকার প্রভাবে এমন ধরনের আপোস করতে বাধ্য হচ্ছে, কখনোই যা করার কথা ছিল না তাদের। নির্বাচনের আগে যত বেশি আওয়াজে বেজে ওঠে উত্সবের ঢোল, প্রকৃত গণতন্ত্রের থাকা-না-থাকা নিয়ে আমরা সন্দিহান হয়ে পড়ি ততটাই।

ভারতে ফিবছর দুর্নীতির নতুন যেসব কেলেঙ্কারি ফাঁস হয় তাতে ম্লান মনে হয় তার আগেকার কিস্সা। ২০১১ সালের গ্রীষ্মে ফাঁস হয় টুজি স্পেকট্রাম কেলেঙ্কারি। আমরা জানলাম, বন্ধুপ্রতিম একজন মানুষকে ইউনিয়নের টেলিকম্যুনিকেশন মন্ত্রী বানিয়ে জনগণের কষ্টার্জিত সম্পদ থেকে চার হাজার কোটি ডলার হাতিয়ে নিয়ে গেছে কর্পোরেটগুলো। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, অবৈধ পন্থায় বন্ধুদের লাইসেন্স পাইয়ে দিতে প্রভাব খাটিয়ে লাইসেন্সের দাম প্রকৃত ব্যয়ের চাইতে কম করে দেখিয়েছেন। টেলিফোন সংলাপের উদ্ধারকৃত টেপ থেকে জানা গেছে, প্রকাশ্য দিবালোকে সংঘটিত এ ডাকাতির ঘটনায় জড়িত রয়েছে শিল্পপতিদের নেটওয়ার্ক এবং তাদের প্রথম সারির কোম্পানিগুলো, মন্ত্রীবর্গ, সিনিয়র সাংবাদিক এবং একজন টিভি অ্যাঙ্কর। ঘটনাটি অবশ্য অনেক আগেই আঁচ করতে পেরেছিল জনগণ। টেপটি তাদের সামনে একটি প্রমাণ মাত্র।

২০০৫ সালে ছত্তিশগড়, উড়িষ্যা আর ঝাড়খণ্ডের রাজ্যসরকারগুলো বেশ কয়েকটি বেসরকারি কোম্পানির সাথে বড় ধরনের অনেকগুলো সমঝোতা চুক্তি (এমওইউ) স্বাক্ষর করে। এসব চুক্তির সুবাদে এসব রাজ্যে মাটির নিচে থাকা ট্রিলিয়ন ডলারের বক্সাইট, আয়রন আর অন্যান্য খনিজ সম্পদের ওপর একচ্ছত্র মালিকানা প্রতিষ্ঠা হয় এসব কোম্পানির। মুক্তবাজার অর্থনীতির প্রাথমিক শর্তটুকুও মানা হয়নি এসব চুক্তি সম্পাদনের ক্ষেত্রে। এ চুক্তির সুবাদে এসব খনি থেকে সরকারের রাজস্ব আয় হবে, বিশেষ লক্ষণীয়, দশমিক ৫ থেকে দশমিক সাত শতাংশ মাত্র।

বস্তারে নতুন কারখানা তৈরি হবে। টাটা ইস্পাতের সাথে ছত্তিশগড় সরকারের এ বিষয়ক চুক্তি স্বাক্ষরের সাতদিনের মধ্যে তৈরি হয়ে গেল ‘সালোয়া জুদুম’ নামে ঘাতক বাহিনী। সরকার বলার চেষ্টা করছে, জঙ্গলে মাওবাদী গেরিলার অত্যাচারে অতিষ্ঠ সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিরোধ বাহিনী এরা। কয়েকদিনের মধ্যে দেখা গেল, কর্পোরেট আশীর্বাদ মাথায় নিয়ে জঙ্গল পরিষ্কারের দায়িত্বে মাঠে নেমে পড়েছে এরা। বাহিনীর তহবিল আর অস্ত্র জোগানো হচ্ছে সরকারের মজুত থেকে। আর তাতে ভর্তুকি দিচ্ছে স্বার্থান্বেষী খনি কোম্পানিগুলো। কিছুদিনের ভেতর অন্য রাজ্যগুলোতেও গড়ে তোলা হলো অনুরূপ জঙ্গিদল, ভিন্ন ভিন্ন নামে। প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিয়ে জানালেন, মাওবাদী গেরিলারাই ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার একমাত্র চ্যালেঞ্জ। প্রকারান্তরে, সরকারের পক্ষ থেকে প্রকাশ্য যুদ্ধ ঘোষণা হলো মাওবাদীর বিরুদ্ধে। 

সম্ভবত এ বিষয়ে সরকারের সদিচ্ছা প্রমাণের লক্ষ্যেই ২০০৬ সালের ২ জানুয়ারি উড়িষ্যা রাজ্যের প্রতিবেশী কলিঙ্গনগরে টাটা ইস্পাতের একটি কারখানায় এসে নামল দশ প্লাটুন পুলিশ। গাড়ি থেকে নেমেই গুলি চালাতে আরম্ভ করল ক্ষতিপূরণ পাবার আশায় সেখানে জমায়েত জমিহারা গ্রামবাসীর ওপর। এক পুলিশসহ নিহত হলো ১৩ গ্রামবাসী। আহত আরও ৩৬। ছয় বছর পার হলো। গোটা গ্রাম আজ অবধি সার্বক্ষণিক ঘিরে রেখেছে কয়েক প্লাটুন সশস্ত্র পুলিশ। এখনো নতজানু হয়নি সেখানকার বিদ্রোহী জনতা।

অন্যদিকে, একই সময়ে ছত্তিশগড়ে নিরীহ মানুষের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে ছারখার করল সালওয়া জুদুম। জঙ্গলের মধ্যে একের পর এক হামলা চালিয়ে কায়েম করল নির্বিচার খুন আর ধর্ষণের রাজত্ব। রাতারাতি বিরান হয়ে গেল ৬০০ গ্রাম। জঙ্গল ছেড়ে পালিয়ে গেল সাড়ে তিন লাখ মানুষ। নারীশিশুসহ ৫০ হাজার লোক জঙ্গল ছেড়ে বাইরে এসে আশ্রয় নিল পুলিশ ক্যাম্পে। মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা দিলেন, এখনো জঙ্গল থেকে যারা বেরিয়ে আসেনি তাদের মাওবাদী সন্ত্রাসী হিসেবে গণ্য করা হবে। এভাবে, আধুনিক ভারতের কোনো কোনো এলাকায় সাধারণ মানুষের চাষবাস করা আর বীজ বপন করাকে সংজ্ঞায়িত করা হলো সন্ত্রাসবাদী তত্পরতা হিসেবে। স্বাভাবিকভাবেই সালওয়া জুুদুমের অত্যাচারের পরিণতিতে আরও প্রবল হয়ে উঠল প্রতিরোধ আন্দোলন। প্রতিদিন আরও বেশি লোক গিয়ে যোগ দিল মাওবাদী গেরিলা বাহিনীর খাতায় নাম লেখাতে। ২০০৯ সালে মাওবাদী উচ্ছেদে অপারেশন গ্রিন হান্ট আরম্ভ করল সরকার। দুই লাখ সশস্ত্র মিলিশিয়া মোতায়েন হলো ছত্তিশগড়, উড়িষ্যা, ঝাড়খণ্ড আর পশ্চিম বাংলায়।

টানা তিন বছর ‘ছোটখাটো সংঘাতের পরও’ জঙ্গল থেকে মাওবাদী উচ্ছেদে সাফল্য না আসায় কেন্দ্র সরকার ঘোষণা দিল, এবার যা করার তা করবে আমাদের সেনাবাহিনী আর বিমানবাহিনী। এর পরও কিন্তু একে আমরা যুদ্ধ বলছি না। আমরা বলছি, এটি ‘বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির প্রয়াস’ মাত্র। হাজার হাজার সৈনিক ইতোমধ্যেই পৌঁছে গেছে রণাঙ্গনে। একটা ব্রিগেডিয়ার সদর দফতর এবং একটি বিমানঘাঁটি তৈরি হবার পথে। বিশ্বের অন্যতম বৃহত্ সেনাবাহিনী এ মুহূর্তে ব্যস্ত রয়েছে বিশ্বের দরিদ্রতম, বুভুক্ষু, চরম অপুষ্টির শিকার এক জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নিজেদের জন্য ‘আত্মরক্ষার কৌশল’ প্রণয়নের কাজে। আপাতত আমরা সবাই অপেক্ষা করছি সশস্ত্র বাহিনীর বিশেষ ক্ষমতা অধ্যাদেশ (এএফএসপিএ) ঘোষণা আসার জন্য। এর মাধ্যমে অর্জন হবে ‘সন্দেহভাজন’ যে কাউকে দেখামাত্র গুলি করার আইনি বৈধতা এবং অধিকার। কাশ্মীর, মনিপুর আর নাগাল্যান্ডে চিহ্নবিহীন হাজার হাজার কবর আর অগুনতি চিতার রচয়িতা এই সেনাবাহিনীকে সন্দেহ না করার কারণটা খুঁজে পাওয়া প্রকৃতই মুশকিল।

একদিকে প্রস্তুতি চলছে সেনা মোতায়েনের, অন্যদিকে মধ্যভারতের জঙ্গলে তখন চলছে নিরবচ্ছিন্ন অবরোধ। খাবার কিংবা ওষুধের দরকার পড়লেও জঙ্গলের বাইরে আসার সাহস পাচ্ছে না গ্রামের লোক। অগণতান্ত্রিক এক আইনের অজুহাতে মাওবাদী হবার অপরাধে শত শত লোক ধরে নির্বিচারে ঢোকানো হয়েছে জেলে। আদিবাসী কয়েদিতে গিজ গিজ করছে জেলখানা। তাদের অনেকে এটুকুও জানে না কী তার অপরাধ। কিছুদিন আগে বস্তারে সোনি সোরি নামে এক স্কুল শিক্ষিকাকে নিজেদের হেফাজতে ঢুকিয়ে তার ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালায় পুলিশ। সে একজন মাওবাদী বার্তাবাহক, এই ‘স্বীকারোক্তি’ আদায়ের জন্য গরম পাথর ঢুকিয়ে দেয় তার যৌনাঙ্গে। কলকাতার এক হাসপাতালে পরবর্তী সময়ে অপসারণ করা হয় ওই পাথর। এ বিষয়ে জনগণ সোচ্চার হয়ে উঠলেই চিকিত্সার জন্য পাঠানো হয় তাকে। সর্বোচ্চ আদালতে শুনানিকালে একটি প্লাস্টিকের ব্যাগে ভরে ওই পাথর হাজির করা হয় বিচারকের সামনে। সরকারের লোকদেখানো এত চেষ্টাচরিত্তির একমাত্র ফল, এখনো জেলের ভেতর পচে মরতে হচ্ছে সোনি সোরিকে, আর তার ওপর নির্যাতনকারী পুলিশ সুপারিন্টেন্ডেন্ট অঙ্কিতকে গত বছর প্রজাতন্ত্র দিবসে ‘অসীম সাহসিকতার জন্য’ ভূষিত করা হয়েছে সর্বোচ্চ প্রেসিডেন্সিয়াল পদকে।

গণবিদ্রোহ আর যুদ্ধের সুবাদে মধ্য ভারতের সামাজিক ও পরিবেশ বিকৃতির কিছু কিছু খবর কানে আসে আমাদের। তবে নিজ উদ্যোগে এ বিষয়ে কোনো তথ্যই আমাদের জানাবার প্রয়োজন বোধ করে না সরকার। কর্পোরেট কোম্পানির সাথে সমঝোতা চুক্তির শর্তগুলো গোপন রয়েছে এখনো। দুয়েকটা গণমাধ্যম চেষ্টা করেছে মধ্যভারতের তিক্ত কাহিনি জনগণের সামনে তুলে আনার। যদিও ভারতীয় গণমাধ্যমের বেশিরভাগ এ বিষয়ে পালন করছে অবাক করা নীরবতা। আয় উপার্জনের সিংহভাগটাই আসে যখন এসব কর্পোরেট বিজ্ঞাপন প্রচার থেকে। গণমাধ্যম আর কর্পোরেট স্বার্থের মাঝে ব্যবধান ঘুচে গেছে প্রায়। কেবলমাত্র রিলায়ান্স-এর নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে সাতাশটি টেলিভিশন চ্যানেল। কোনো কোনো প্রচারমাধ্যম সরাসরি দেখভাল করছে ব্যবসায়িক আর কর্পোরেট স্বার্থ। উদাহরণস্বরূপ, শীর্ষ সংবাদপত্র দৈনিক ভাস্কর-এর ইংরেজি এবং হিন্দিসহ চারটি ভাষায় ১৩টি রাজ্যে পাঠকসংখ্যাই সাড়ে সতের কোটির ওপরে। এদের আওতায় খনি, বিদ্যুত্ উত্পাদন, জমিজমা আর টেক্সটাইল ব্যবসার সাথে সম্পৃক্ত আছে ৬৯টি কোম্পানি। এদেরই একটি কোম্পানি ডিবি পাওয়ার লিমিটেডের বিরুদ্ধে ছত্তিশগড় উচ্চ আদালতে এক পিটিশন দাখিল হয়। অভিযোগ, উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন নিয়ে এক শুনানি প্রভাব বিস্তারের লক্ষ্যে ‘ইচ্ছাকৃত, অবৈধ এবং ষড়যন্ত্রমূলক’ পদক্ষেপ নিয়েছে কোম্পানির আওতাধীন ওই সংবাদপত্র। আসলেও ওরা সেটা করেছে কিনা সেটা পরবর্তী বিবেচ্য। বাস্তবতা হচ্ছে, এ ধরনের কাজ করার অবাধ সুযোগ এবং ক্ষমতা দুটোই রয়েছে গণমাধ্যমগুলোর।

দেশের অন্যান্য এলাকা থেকে অবশ্য কোনো ধরনের খবর পাওয়ার সুযোগ নেই আমাদের। প্রবলভাবে সামরিকায়িত আর বিক্ষিপ্ত জনপদ নিয়ে তৈরি উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য অরুণাচল প্রদেশে ঠিক এই মুহূর্তে নির্মাণাধীন আছে ১৬৮টি বৃহত্ বাধ, অধিকাংশই ব্যক্তিগত মালিকানায়। মনিপুর আর কাশ্মীরে নির্মাণাধীন দৈত্যাকৃতি এসব বাধের কারণে রাতারাতি নিমজ্জিত হবে গোটা জেলা। ওই দুটো এলাকাই এ মুহূর্তে প্রবলভাবে সেনায়িত। এসব এলাকায় ঘরের বিদ্যুত্ চলে যাওয়ার কারণে মৌখিক প্রতিবাদ করলেও সাথে সাথে গুলি করে মারা হতে পারে যে কাউকে। (দিনকয়েক আগে ঠিক তা-ই ঘটেছে কাশ্মীরে।) এই যখন বাস্তবতা, একটা বিশাল বাধের নির্মাণপ্রক্রিয়া থামানো, সাধ্য কী তার?