উপকূলীয় এলাকায় দেশি বিদেশি জলদস্যু

আপডেট : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৫, ০০:১০

কক্সবাজার থেকে সাতক্ষীরা পর্যন্ত ৭২০ কিলোমিটার উপকূলীয় এলাকার মত্স্য আহরণ নিয়ন্ত্রণ করছে তিনশ জলদস্যু। একেকটি এলাকায় পৃথক বাহিনী গঠন করে সাগরে মাছ ধরা ট্রলারের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এসব জলদস্যু। মাছ ও ট্রলার লুট করে জেলেদের সাগরে জীবন্ত ছেড়ে দেয়া হয়। প্রতিবাদ করলে জেলেদের হত্যা করে সাগরে লাশ ভাসিয়ে দেয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে ট্রলার মালিক ও মাছের আড়তের মালিকের সঙ্গে যোগাযোগ করার পর দাবিকৃত চাঁদা পেলে মুক্তি দেয় জলদস্যুরা।

 
২০১০ সাল থেকে চলতি বছর পর্যন্ত এই উপকূলীয় এলাকায় মাছ ধরতে গিয়ে ৪শ জেলে জলদস্যুদের হাতে প্রাণ হারিয়েছেন। ২০১৩ সালে চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপকূলীয় এলাকায় এক ট্রলারের ৩০ জেলেকে হত্যা করে লাশ সাগরে ফেলে দেয়ার পর জেলে পল্লীতে শোকের ছায়া নেমে আসে। জাহানারা নামে এক নারী জলদস্যুর নাম আলোচনায় আসে। চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের জাহানারা বাহিনীতে রয়েছে ১০ জলদস্যু। এই বাহিনীকে এখনো আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী আটক করতে পারেনি।
 
দেশীয় জলদস্যু বা ডাকাতের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক জলদস্যুও সক্রিয় রয়েছে। এদেরকে আন্তর্জাতিক জলদস্যু না বলে কোস্টগার্ড ‘মাছ চোর’ বলে থাকে। কোস্টগার্ডের একজন কর্মকর্তা জানান, ভারত, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়ার ফিশিং বোট (মাছ ধরা ট্রলার) মাঝে মধ্যেই বাংলাদেশের জলসীমায় ঢুকে মাছ ধরার চেষ্টা করলে কোস্টগার্ড তা প্রতিরোধ করে থাকে। তবে বিশাল জলসীমায় কোস্টগার্ড সীমিত জনবল দিয়ে তা প্রতিরোধ করে যাচ্ছে। সম্প্রতি বরগুনায় কোস্টগার্ড ৩০ জেলেসহ একটি ভারতীয় ফিশিং বোট আটক করে।
 
দেশীয় জলদস্যুরা শুধু মাছ ধরা ট্রলার জিম্মি বা চাঁদাবাজি করে তা নয়। তারা উপকূলীয় এলাকায় বিভিন্ন চরে বসবাসকারী অপেক্ষাকৃত দরিদ্র জনগোষ্ঠীর গরু, ছাগল, মহিষ এমনকি কৃষি জমির ধান লুট করে। তারা রামদা, কিরিচ, পাইপগান, দেশীয় বন্দুক, কাটা রাইফেল, বিদেশি পিস্তল, এলজি, সিঙ্গেল ল্যান্সার, একে-৪৭ ও একে-২২ রাইফেল ব্যবহার করে। এই উপকূলীয় এলাকায় বছরে অন্তত একশ কোটি টাকা চাঁদাবাজি হয়। চাঁদার টাকা শুধু সাগরে নয়, উপকূল সংলগ্ন জেলা শহরগুলোতে হাতবদল হয়।
 
ইলিশ মৌসুমে জলদস্যুদের দৌরাত্ম্য বেড়ে যায়। বরিশাল, ভোলা, নোয়াখালী, চাঁদপুর, ফেনী ও চট্টগ্রাম সংলগ্ন উপকূলীয় এলাকায় ইলিশ ধরা ট্রলার থেকে জলদস্যুরা চাঁদা আদায় করে। চাঁদাবাজি থেকে ট্রলার রক্ষা করার জন্য একটি গোয়েন্দা সংস্থা সরকারের কাছে পরামর্শ দিয়েছে।
 
এ ঘটনার পর সরকারের পক্ষ থেকে জলদস্যু ও তাদের পৃষ্ঠপোষকতাকারীদের একটি তালিকা তৈরির কাজ শুরু হয়। কোস্টগার্ড, র্যাব ও পুলিশের গোয়েন্দা সংস্থা ৩শ জলদস্যুর তালিকা প্রস্তুত করে। এই ৩শ জলদস্যু ও তাদের পৃষ্ঠপোষকতাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে র্যাবকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে জলদস্যু দমনে র্যাবকে একটি টাস্কফোর্স গঠন করে দ্রুত কার্যকর করতে বলা হয়েছে। 
 
সুন্দরবনের জলদস্যু :বাগেরহাটের শরণখোলা রেঞ্জ থেকে শুরু করে খুলনা হয়ে সাতক্ষীরা সীমান্তের তালপট্টি পর্যন্ত ৬ হাজার ১৭ বর্গ কিলোমিটার এলাকা সুন্দরবন। সুন্দরবন ছোট-বড় ৩০টি দস্যু বাহিনীর  দখলে। এরা জলপথে বন এলাকায় দস্যুতা করে বলে স্থানীয়ভাবে এদেরকে জলদস্যু না বলে বনদস্যু বলা হয়। বিশাল বনাঞ্চলে ৭ লাখ পরিবারে অর্ধকোটি মানুষের বাস। এই বনজীবীরাই দস্যুদের মূল টার্গেট। অস্ত্রের মুখে বনজীবীদের জিম্মি করে মুক্তিপণ নিচ্ছে বনদস্যুরা। আবার সুন্দরবনের ভিতর ও সাগর উপকূলে মাছ ধরা ট্রলারগুলোকে জিম্মি করে বনদস্যুরা চাঁদাবাজি করছে। প্রতি মাসে কি পরিমাণ চাঁদাবাজি হয় এর কোন পরিসংখ্যান পুলিশ বা র্যাবের কাছে নেই। তবে পুলিশ ও র্যাবের সাঁড়াশি অভিযানে প্রায়ই বন্দুকযুদ্ধে বনদস্যু নিহতের ঘটনা ঘটছে। সুন্দরবনকে তিন ভাগে ভাগ করে তিনটি বাহিনী নিয়ন্ত্রণ করার তথ্য রয়েছে র্যাবের কাছে।
 
রাজু বাহিনী
 
সুন্দরবনের রাজু বাহিনীর প্রধান রাজু; কিন্তু র্যাব-পুলিশের সাঁড়াশি অভিযানে রাজু বর্তমানে ভারতে আত্মগোপন করে আছে। এখন বাহিনীটি পরিচালনা করছে রাজুর শিষ্য ইলিয়াস, জাহাঙ্গীর আর রফিক। দলের ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করছে মারুফ আর মহুরীর দায়িত্ব সুমনের ঘাড়ে। এ বাহিনীর বনদস্যুর সংখ্যা ৫০ জন। ৪৩টি অটো রাইফেল এবং এইট শ্যুটার ও নাইন শ্যুটার গান আছে এদের হাতে। এর বাইরে আছে বেশ কিছু বিদেশি রাইফেল এবং দোনলা বন্দুক। টু-টু বোর রাইফেল আছে ডজন খানেক। সব মিলিয়ে ১২ হাজার রাউন্ড গুলি মজুদ রয়েছে এ বাহিনীর কাছে। এ বাহিনীর হাতে আছে ফোর সিলিন্ডার দুইটি হাইস্পিড স্পিডবোট। রাজু বাহিনী তালপট্টি চর থেকে শুরু করে জঙ্গলের বাগেরহাট অঞ্চলের পুরোটা জুড়েই রাজত্ব করছে।
 
খলিল ও ভাই ভাই বাহিনী
 
খলিল বাহিনীর প্রধান খলিলের বাড়ি বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার ভাগা গ্রামে। ৫ সদস্যের এ বাহিনীতে একটি পাইপ গান, দুটি এয়ারগান ও একটি কাটা রাইফেল নিয়ে সুন্দরবনের ঝাপসি খাল, আন্ধারিয়ার খাল অঞ্চলে ডাকাতি ও জেলে-বাওয়ালীদের জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায় করে। ভাই ভাই বাহিনীর প্রধান মোশারেফ মশার বাড়ি রামপালের চাড়াখালী গ্রামে। ১০-১২ জনের দল নিয়ে মশা চাঁদপাই রেঞ্জের ঝাপসি নদী, টগিরবগির খাল, ভদ্রা নদী, মানকির ভারানি ও শিবসা নদীর আঁদাচাই ফরেস্ট ফাঁড়ি পর্যন্ত দস্যুতা চালায়। এ দলের অস্ত্র আছে একটি সিক্স শুটার বন্দুক, ৫টি একনলা বন্দুক, একটি পয়েন্ট টু-টু বোর রাইফেল।
 
আলিফ ও জোনাব আলী বাহিনী
 
সাতক্ষীরার চালতেবাড়িয়া ও হরিনগর এর নিচে বাহির সমুদ্র এলাকায় দস্যুতা ও জেলে জিম্মির কাজ করছে আলিফ বাহিনী। এই বাহিনীর ২২ জনের হাতে আছে ১৭টি আগ্নেয়াস্ত্র। জোনাব আলী বাহিনীর প্রধান জোনাব আলী। ৪-৫টা বন্দুক নিয়ে জঙ্গলে রাতের অন্ধকারে ডাকাতি করে জোনাব আলী বাহিনী।
 
বকর-বাবু ও রাঙা বাহিনী
 
খুলনা রেঞ্জের কয়রা থানার নিচের জঙ্গলেই এ বাহিনী  ডাকাতি করে। এদের আছে ৪-৫টা বন্দুক। আর পূর্ব বাদা, নন্দবালা থেকে কাছাকাছি এলাকায় ডাকাতি করে রাঙা বাহিনী। এই বাহিনীর হাতে রয়েছে ২টি দো-নলা বন্দুক। এছাড়া আন্ধারমানিক নদী এলাকায় খুলনার ফুলতলার কালু বাহিনী ডাকাতি করে। এই বাহিনীর হাতে আছে ২টি থ্রি নট থ্রি রাইফেল, ২টি এক নলা বন্দুক ও ৪টি পাইপ গান। সুন্দরবনের কয়রা ও দাকোপ এলাকায় মুসা বাহিনী সক্রিয়।
 
আলীম বাহিনী
 
সাতক্ষীরা অঞ্চলের সুন্দরবনে মূর্তিমান আতঙ্কের নাম এই আলীম বাহিনী। শ্যামনগর এলাকার বনাঞ্চলে প্রায় ৩০ সদস্যের এই বাহিনীর বিচরণ। এছাড়া সুন্দরবনে শীর্ষ বাহিনী, জুম্মন বাহিনী, আমিনুর বাহিনী, সোহরাব বাহিনী, মালেক বাহিনী, নিরব বাহিনী ও শান্ত বাহিনীর শতাধিক বনদস্যু সক্রিয়।
 
জনবল বৃদ্ধি ও আধুনিক যান দরকার
 
সাতক্ষীরা থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত ৭২০ কিলোমিটার উপকূলীয় এলাকায় জলদস্যু, বনদস্যু ও ডাকাতদের বিরুদ্ধে কোস্টগার্ডের পাশাপাশি র্যাব সাঁড়াশি অভিযান চালাচ্ছে। গত তিন বছরে র্যাব ও পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে ৬৭ জলদস্যু ও বনদস্যু নিহত হয়েছে। গ্রেফতার হয়েছে শতাধিক জলদস্যু।
 
এ ব্যাপারে র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল জিয়াউল আহসান বলেন, উপকূলীয় এলাকা, বিশেষ করে সুন্দরবন ও নোয়াখালী এবং চট্টগ্রামে বিশেষ অভিযান চলছে। জলদস্যু বিশেষ করে বনদস্যু ও ডাকাতদের গ্রেফতার করতে এই এলাকায় র্যাবের কোস্টাল ব্যাটালিয়ন গঠন করা প্রয়োজন। কোস্টাল ব্যাটালিয়ন দিয়ে কোস্টগার্ডের সাথে যৌথভাবে এই এলাকায় জলদস্যু ও ডাকাত প্রতিরোধ করা সম্ভব।
 
উপকূলীয় এলাকায় জেলেদের নির্বিঘ্নে মত্স্য আহরণ ও তাদের নিরাপত্তা দিতে ১৯৯৫ সালে গঠিত হয় কোস্টগার্ড। অপর্যাপ্ত জনবল নিয়ে যাত্রা শুরুর পর থেকে কোস্টগার্ড উপকূলীয় এলাকায় অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে কোস্টগার্ড ৪টি ফার্স্ট অ্যাটাক ক্রাফট, ৫টি কোস্টাল প্যাট্রোল ক্রাফট, ৬টি রিভিরাইন প্যাট্রোল ক্রাফট, ৯টি মেটাল সার্ক বোট, ৫টি ডিফেন্ডার ক্লাস বোট, ৬টি অ্যালুমিনিয়াম ওয়ার্ক বোট ও ৪টি হার্বার প্যাট্রোল বোট ও আনুমানিক আড়াই হাজার জনবল নিয়ে এই ৭২০ কিলোমিটার উপকূলীয় এলাকা পাহারা দিচ্ছে।
 

সাগর সংলগ্ন অন্যান্য উন্নত দেশে উপকূলীয় এলাকার নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরো শক্তিশালী। ঐসব দেশে হেলিকপ্টারে করে উপকূলীয় এলাকা টহলের পাশাপাশি জলপথে বড় কোস্টাল প্যাট্রোল ক্রাফট দিয়ে টহল দেয়া হয়। আধুনিক ও শক্তিশালী ক্রাফট কোস্টগার্ডে নেই। বর্তমানে ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্র জলসীমা বেড়ে যাওয়ায় কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনীর দায়িত্ব আরো বেড়ে গেছে। এ কারণে কোস্টগার্ডকে শক্তিশালী করতে সরকার ‘কোস্টগার্ড গোল-২০৩০’ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এক কর্মকর্তা বলেন, কোস্টগার্ড গোল-২০৩০ কর্মসূচির আওতায় কোস্টগার্ড আরো আধুনিকায়ন হবে।