জনপ্রিয় ম্যাগাজিন ‘পাক্ষিক অনন্যা’ পথচলার ২৭ বছর উদযাপন করল। সেই সঙ্গে ‘অনন্যা শীর্ষদশ সম্মাননা’ প্রদান দুই দশক পার করল। এই উপলক্ষে গতকাল শনিবার এক জমকালো আয়োজনে পুনর্মিলনী, প্রকাশনার মোড়ক উন্মোচন ও ‘অনন্যা শীর্ষদশ ২০১৪’ প্রাপ্তদের হাতে সম্মাননা তুলে দেয় পাক্ষিক অনন্যা।
এ উপলক্ষে বাংলাদেশ কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তন দেশের নবীন-প্রবীণদের এক মিলনমেলায় পরিণত হয়। সকাল থেকেই এই মিলনমেলায় শামিল হন বয়সের ভারে ন্যুব্জ কিন্তু কর্মে উজ্জ্বল অনন্যারা। তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করেন বয়সে নবীন কর্মে সমুজ্জ্বল অনন্যা শীর্ষদশ প্রাপ্তরা। কেউ সরকারের মন্ত্রী-আমলা, কেউ ফটোসাংবাদিক, কেউ গবেষক, কেউ চিকিত্সক, কেউ সাংবাদিক, অর্থনীতিবিদ, আইনজীবী, উন্নয়নকর্মী কেউ আবার সামরিক বৈমানিক। অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন পাক্ষিক অনন্যা সম্পাদক তাসমিমা হোসেন।
অনুষ্ঠানের শুরুতে অনন্যা শীর্ষদশ নিয়ে একটি তথ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। পরে অনন্যা সম্পাদক ২৭ বছরে অনন্যার পথচলার নানা দিক তুলে ধরে বলেন, নারী অনেক প্রতিকূলতা পার হয়ে পেশাগত জীবনে সাফল্য অর্জন করলেও সমাজ তাদের সেভাবে স্বীকৃতি দেয় না। এমন নারীদের উত্সাহ দিতেই ‘অনন্যা শীর্ষদশ’ সম্মাননা। পেশাগত দায়িত্ব পালনে বছরের আলোচিত নারীদের কাজের স্বীকৃতি দিতেই এই উদ্যোগ।
এছাড়া শুরু থেকে অনন্যা শীর্ষদশ প্রাপ্ত বয়োবৃদ্ধদের মধ্যে সমাজসেবায় ফাহমিদা আমিন, প্রফেসর ইমেরিটাস ড. সুলতানা সারওয়াতারা জামান, প্রথম বেইজিং এনজিও ফোরামের চেয়ারপার্সন ড. নাজমা চৌধুরী, গণমাধ্যম কর্মী সেতারা মূসা, শিক্ষাবিদ ও ভাষা সৈনিক হালিমা খাতুন, ভাষা সৈনিক ও কুমুদিনী কল্যাণ সংস্থার পরিচালক প্রতিভা মুত্সুদ্দি এবং প্রথম নারী ফটো সাংবাদিক সাইদা কামালসহ মহীয়সী নারীদের উপস্থিতির জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তাসমিমা হোসেন। এদের কেউ কেউ হুইল চেয়ারে করে এসে অনুষ্ঠানকে সাফল্যমণ্ডিত করেন। এছাড়া ঢাকার বাইরে থেকে উন্নয়নকর্মী অ্যাঞ্জেলা গোমেজ, কাঙ্গালিনী সুফিয়াসহ আরো উপস্থিত ছিলেন ভাস্কর্য শিল্পী ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী, জেন্ডার বিশেষজ্ঞ মালেকা বেগম, এভারেস্ট জয়ী নিশাত মজুমদার, ব্যারিস্টার সারা হোসেন, শিল্পী মেহেরীন, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সারা যাকের প্রমুখ।
১৯৯৩ সাল থেকে অনন্যা শীর্ষদশ পুরস্কার দেয়া হচ্ছে। প্রতিবছর দেশের ১০ জন নারীকে তাদের নিজ নিজ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখায় এই পুরস্কারের জন্য মনোনীত করা হয়। সেই ধারাবাহিকতায় গত বিশ বছরে ২১০ জন নারীকে এই সম্মাননা প্রদান করা হয়েছে। কৃষি-শিল্প-বাণিজ্য-অর্থনীতি-অভিনয়-সংগীত-খেলাধুলা-শিক্ষা-চিকিত্সা-মুক্তিযুদ্ধ-সমাজকল্যাণ ও উন্নয়নমুখী কাজ—আইন ও মানবাধিকার-উদ্যোক্তা-রাজনীতি-সাংবাদিকতা প্রভৃতি অঙ্গনে বিশেষ অবদান রাখার জন্য এই সম্মাননা প্রদান করা হয়।
২০১৪ সালে বিভিন্ন ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদানের জন্য ১১ নারীকে অনন্যা শীর্ষদশ পুরস্কার ও একজনকে বিশেষ সম্মাননা প্রদান করেছে পাক্ষিক অনন্যা। পুরস্কারজয়ী নারীদের হাতে উত্তরীয়-ক্রেস্ট ও সনদ তুলে দেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ইসমাত আরা সাদেক, এফবিসিসিআই’র সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি মনোয়ারা হাকিম আলী ও অ্যাডকমের চেয়ারপারসন গীতি আরা সাফিয়া চৌধুরী।
এ বছর বিভিন্ন ক্ষেত্রে পুরস্কারপ্রাপ্তরা হলেন প্রফেসর লায়লা নূর (ভাষাসৈনিক), অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম (প্রথম নারী উপাচার্য), অধ্যাপক খালেদা একরাম (বুয়েটের প্রথম নারী ভিসি), মেহের আফরোজ চুমকি (রাজনীতি), ডা. তাহমিনা বানু (চিকিত্সা), রোকসানা সুলতানা (সমাজসেবা), ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ (আইন ও মানবাধিকার), নাজিয়া আন্দালিব প্রিমা (শিল্পকলা), সালমা খাতুন (খেলাধুলা), নাইমা হক ও তামান্না-ই-লুতফি। এছাড়াও প্রথমবারের মতো অনন্যা বিশেষ সম্মাননা পান অনন্যার সাবেক নির্বাহী সম্পাদক সাংবাদিক ও নারী অধিকারকর্মী দিল মনোয়ারা মনু।
অনুষ্ঠানে ইসমাত আরা সাদেক বলেন, আমাদের দেশের নারীরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের প্রতিভার স্বাক্ষর রাখছেন। তবে তাদের অনেক প্রতিবন্ধকতাও রয়েছে, বিশেষত গ্রামীণ নারীদের। তাদেরকে অধিকার সম্পর্কে আরো সচেতন করে তুলতে হবে, যেন নারীরা নিজেদের মানুষ ভাবতে পারেন।
দিল মনোয়ারা মনু বলেন, আমি পুরস্কার বা স্বীকৃতির জন্য কখনো কাজ করিনি। কাজ করেছি একটা কমিটমেন্ট থেকে। তবুও জীবনের এই পর্যায়ে এসে কাজের স্বীকৃতি পেলে ভালো লাগে। আমারও নিশ্চয় ভালো লাগছে।
তিনি বলেন, এই পুরস্কারটির অংশীদার আমার অনন্যায় ২৫ বছরের কর্মজীবনে কর্মসঙ্গী সকলেই। তাদের প্রতিও আমার কৃতজ্ঞতা রইল। আমার এই পুরস্কারে এই প্রজন্মের সাংবাদিকরাও অনুপ্রাণিত হবেন। আমি চাই তাদের কাজের মূল্যায়ন হোক।
ফেয়ার অ্যান্ড লাভলী ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় অনুষ্ঠিত এ পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সাংবাদিক ফারজানা রূপা। অনুষ্ঠানে সাধনা সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর মনোরম পরিবেশনা সবাইকে মুগ্ধ করে। এছাড়া বাঁশির সুরে আচ্ছন্ন করেন কিশোরগঞ্জ থেকে আসা সরস্বতী দাস। অনুষ্ঠানটি একাত্তর টেলিভিশন সরাসরি সম্প্র্রচার করে। অনুষ্ঠানে অনন্যা ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে ঢাকায় কর্মজীবী নারীদের জন্য একটি ডরমিটরি করার ঘোষণা দেন অনন্যা সম্পাদক তাসমিমা হোসেন।
