দুর্বৃত্তের কবলে সুন্দরবন

আপডেট : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৫, ০০:৩৫

প্রাকৃতিক সম্পদসমৃদ্ধ সুন্দরবনকে ঘিরে সংঘবদ্ধ দুর্বৃত্ত চক্রের বেপরোয়া পাচার ও নিধন তত্পরতা নিয়ন্ত্রণহীন মাত্রায় পৌঁছেছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে বনখেকোরা গোটা সুন্দরবনকেই গিলে খেতে চায়। সুন্দরী কাঠ পাচার এবং হরিণ ও বাঘ নিধন হার বৃদ্ধির এ লাগামহীন গতিতে খোদ বন প্রশাসনের সার্কেল ও বিভাগ পর্যায়ের কর্মকর্তারা শুধু বিব্রত বা উদ্বিগ্নই নন, দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়ে হাল ছেড়ে দিয়েছেন যেন।

 
পূর্ব সুন্দরবন ও সংলগ্ন লোকালয়ে অনুসন্ধানে জানা গেছে, এ সংঘবদ্ধ চক্রে পাচারকারীদের সাথে সুন্দরবনের মাঠ ও রেঞ্জ পর্যায়ের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সন্নিহিত এলাকার প্রশাসনের একাংশ জড়িত রয়েছে বন উজাড়ে। গত আগস্ট মাসে পটুয়াখালী ও বরগুনা জেলায় পুলিশ ও কোস্টগার্ডের হাতে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা মূল্যের সুন্দরী কাঠের চারটি চালান আটক হলে বন প্রশাসন খুলনা সার্কেলের টনক নড়ে। খুলনার বন সংরক্ষক পটুয়াখালীর বিভাগীয় বন কর্মকর্তার কাছ থেকে সংবাদ পেয়ে পূর্ব সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তাকে এ পাচারের তদন্ত করতে বলেন। এ তদন্ত দেয়া হয় শরণখোলার রেঞ্জ অফিসারকে, যে রেঞ্জকেই ঘিরে রয়েছে সুন্দরবনের সম্পদ লোপাটের ঘটনা ও অভিযোগ বেশি বেশি। সবচেয়ে আশংকাজনক ঘটনা হচ্ছে কোটি কোটি টাকার সুন্দরীসহ নানা প্রজাতির কাঠ পাচার, শ’শ’ হরিণ শিকার ও অজ্ঞাতসংখ্যক বাঘ নিধন এবং অবৈধভাবে মাছ ধরার। বনবিভাগের প্রাণিসম্পদ ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের হিসাবে ২০১৫ সালে পাঁচটি বাঘের চামড়া ও ৩-৪ টির হাড়গোর এবং সুন্দরবন থেকে দু’বছরে অন্তত ১০টি বাঘের চামড়া উদ্ধারের ঘটনা রয়েছে।
 
পূর্ব অভয়ারণ্য এলাকার কটকা, কচিখালী, সুপতিসহ বাদামতলা, টিয়ারচর, ঝাপা, শেলা প্রভৃতি শরণখোলা রেঞ্জভুক্ত বনাঞ্চলের নদী-খাল ছাড়াও নলীয়ান রেঞ্জের নীলকমলের (হিরন পয়েন্ট) মধ্য অভয়ারণ্য এলাকার মান্দার বাড়িয়া, বঙ্গবন্ধুর চর, কলাতলা খালে চলে অবৈধ মাছ ধরা। এদিকে শরণখোলা রেঞ্জ ও সংলগ্ন লোকালয়ও বন অপরাধীদের ট্রানজিট এবং আবাসস্থল। এ রেঞ্জের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কারো কারো বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলা ছাড়াও বন-অপরাধে সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। তাদের সম্পর্ক রয়েছে সুন্দরবনের পূর্ব সীমানার বলেশ্বর নদের তীরের বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার চরদোয়ানির মালেক গোমস্তাসহ বন সন্নিহিত লোকালয়ের কুখ্যাত সব পাচারকারীর সাথে। মালেক গোমস্তার বিরুদ্ধে বন আইনে অর্ধশতাধিক মামলা রয়েছে পাথরঘাটা ও বাগেরহাটের আদালতে কাঠ ও হরিণ পাচারের অভিযোগে। স্থানীয় প্রভাবশালী দু’ রাজনৈতিক নেতা শিকারীদের কাছ থেকে ৩৫০ টাকা দরে প্রতি কেজি হরিণের মাংস কিনে ৫০০ টাকা করে শহর-বন্দরে বিক্রি করেন। তাদের দাদন দেয়া রয়েছে পদ্মা, রুহিতা, কালিরখাল, খলিফারহাট, চরদোয়ানির হরিণ শিকারীদের কাছে।
 
এ বছর জানুয়ারিতে পাথরঘাটার কালমেঘা থেকে র্যাব হরিণের ৩৬টি চামড়া, ৮ আগস্ট লালদিয়া থেকে কোস্টগার্ড ১৬৬.১৩ ঘনফুট সুন্দরী কাঠ ভর্তি একটি যান্ত্রিক নৌকা, বাদুরতলা থেকে ২৩ আগস্ট ১৪০ কেজি হরিণের মাংস ও দু’টি জ্যান্ত হরিণ আটক করে। পাথরঘাটার ফরেস্টার রফিকুল ইসলাম জানান, সর্বশেষ হরিণ পাচারের এ ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করা হয়েছে। যারা পাথরঘাটা পৌরসভা গহরপুর, বাদুরতলা ও চরদোয়ানি গ্রামের বাসিন্দা। এদের মধ্যে বারেক ওরফে হরিণ বারেক, সোহরাব, মোস্তফার মত কুখ্যাত তিন হরিণ শিকারীকে নোটিস করেছে বনবিভাগ। বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলার বগি তাফালবাড়িয়া, ত্যাড়াব্যাকা, রাজৈর, রায়েন্দা, রাজাপুর, রসুলপুর এবং মোড়েলগঞ্জ উপজেলার নিশানবাড়িয়া ও জিউধরা ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রাম হরিণ ও কাঠ পাচারকারীদের আস্তানা। একমাস আগে কোস্টগার্ড এ উপজেলা থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় এক নৌকা ভর্তি সুন্দরী কাঠ আটক করে। গত ৭ সেপ্টেম্বর চাঁদপাই রেঞ্জের আমুরবুনিয়া বন থেকে বন বিভাগ দুই হরিণ শিকারীকে আটক করেছে। এ সপ্তাহের নির্ভরযোগ্য সূত্রের খবর ছিল পাথরঘাটার চরদোয়ানীতে মাছের ট্রলারে বরফজাত করা হয় ১৫ মন হরিণের মাংস পিরোজপুর অঞ্চলে চালান দিতে। এ খবরে পুলিশ নদী পথে নজরদারি জোরদার করলে পাচারকারীরা রুট পরিবর্তন করে। পূর্ব সুন্দরবন সন্নিহিত জেলার মধ্যে বাগেরহাট, পটুয়াখালী, বরগুনার পাথরঘাটা ও পিরোজপুরের আদালতসমূহে প্রায় চারশ বন মামলা বিচারাধীন রয়েছে বন বিভাগ ও পুলিশের দায়ের করা। যার মধ্যে সুন্দরী কাঠ ও হরিণ পাচার, বাঘের চামড়া আটক, কুমির, শূকর, কাছিম শিকার, বিষ দিয়ে মাছধরার মত গুরুত্বপূর্ণ মামলার সংখ্যা উল্লেখযোগ্য।
 
এ সব মামলার বিবরণে দেখা যায়, জব্দ কাঠ, হরিণ ও বাঘের চামড়া প্রধানত পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জের বনাঞ্চল থেকে পাচারকৃত। সাম্প্রতিক সুন্দরবন থেকে পাচার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাওয়ার ঘটনা স্বীকার করে শরণখোলা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক মো. কামাল উদ্দিন ‘ইত্তেফাক’কে বলেন, এসব অপরাধের ঘটনাস্থল অন্য রেঞ্জে। পাথরঘাটাসহ লোকালয়ে বিভিন্ন সময় আটক হরিণ ও হরিণের মাংস সুন্দরবনের নয়, উপকূলীয় অন্য সংরক্ষিত বনের বলেও তিনি আগে মন্তব্য করতেন। তিনি সম্প্রতি বলেছেন, সুন্দরবনের অপরাধ বনবিভাগের একার পক্ষে সামাল দেয়া সম্ভব নয়। তার দায়িত্ব পালন ক্ষেত্রে গুরুতর অভিযোগ নিয়ে তাকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, সীমিত জনবল ও যানবাহন নিয়ে বনরক্ষায় তিনি যথাসাধ্য চেষ্টা চালাচ্ছেন। শরণখোলা নয়, অন্য রেঞ্জে বন-অপরাধ ও দুর্নীতি হয়, তার এমন বক্তব্যের বিষয়ে চাঁদপাই রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক বেলায়েত হোসেন বলেন, দুই রেঞ্জের বনভূমিতে ব্যাপক অনুসন্ধান চালালে এর সত্যাসত্য প্রমাণিত হবে। একের দায় অন্যের ঘাড়ে চাপানো অনৈতিক।
 
পশ্চিম সুন্দরবনের আরেক রেঞ্জ নলিয়ানের (খুলনা) সহকারী বন সংরক্ষক বশিরুল-আল-মামুন বলেন, তিনি সম্প্রতি এ পদে যোগ দিয়েছেন বলে বনের সম্যক তথ্য জেনে উঠতে পারেন নি। তবে কাঠ পাচারের একটি গোপন খবর পেয়ে গত সপ্তাহে নিশানখালী বনাঞ্চলে অভিযান চালিয়ে কাউকে পান নি। সুন্দরবনের মধ্য অভয়ারণ্য এলাকার মান্দারবাড়িয়া, বঙ্গবন্ধুর চর ও কলাতলার খালে অবৈধ “গেরাফি” জাল দিয়ে জেলেরা মাছ ধরছে। খুলনার নতুন বাজারের দু’জন প্রভাবশালী মত্স্য ব্যবসায়ী এ নো ফিশিং জোনে মাছ ধরাচ্ছেন বলে অভিযোগের বিষয়টি এখনও এ বনকর্তা জানেন না বলে ‘ইত্তেফাক’কে বলেন। একটি সূত্র জানায়, চাঁদপাই রেঞ্জে এ অপরাধের বিরুদ্ধে বন বিভাগ তত্পর বলে বর্তমানে বাগেরহাট আদালতে ১১৬টি বন মামলা বিচারাধীন। সে তুলনায় শরণখোলা রেঞ্জের মামলা সংখ্যা ৮৪টি। তবে সুন্দরবনের বাইরে পাথরঘাটা উপজেলায় পুলিশ, র্যাব, কোস্টগার্ড ও উপকূলীয় বন বিভাগ বেশ সক্রিয় বলে সেখানে শুধু বনবিভাগের দেয়া মামলার সংখ্যা ১৩২টি। পুলিশের মামলার সংখ্যা এ হিসাবের বাইরে।
 

সুন্দরবন পূর্ব বিভাগীয় বন কর্মকর্তা সাইদুল ইসলাম বলেন, তিনি এ পদে নতুন বলে এসব অভিযোগ ও ঘটনা সম্পর্কে জানার সাথে সাথে ব্যবস্থা গ্রহণ ও প্রতিকারে সক্রিয় হচ্ছেন। শরণখোলা রেঞ্জের বগি স্টেশন এলাকায় সংরক্ষিত বনাঞ্চলে মহিষ চড়ানোর অভিযোগ পেয়ে তাত্ক্ষণিকভাবে তা বন্ধ করেছেন। উল্লেখ্য বলেশ্বর নদীর পশ্চিম তীরে বগি, চরখালী, ডুমরিয়া, ছালুয়া, শাপলা প্রভৃতি বনভূমির চরাঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে লোকালয় থেকে শ’ শ’ মহিষ চড়ানোর সুযোগ দেয়া হত মাসে ২০০ টাকা কৃষকের কাছ থেকে মহিষ প্রতি নিয়ে। বন সংরক্ষণ ও সুন্দরবনের অপরাধ রোধে বনবিভাগ যে অসমর্থ সে বিষয়টি সার্কেল ও বিভাগীয় বনকর্মকর্তারা গত ১৮ আগস্ট খুলনা বিভাগীয় কমিশনারের দপ্তরে এক সভায় প্রকাশ করেছেন। খুলনার বন সংরক্ষক ও বিভাগীয় বন কর্মকর্তারা এক বছরের জন্য সুন্দরবনে জেলে, বাওয়ালী, মৌয়ালদের প্রবেশ নিষিদ্ধ এবং সকল বনজ ও মত্স্যসম্পদ আহরণ স্থগিতের প্রস্তাব দেন। যে প্রস্তাব সভায় গ্রহণ করা হয় এবং বন মন্ত্রণালয়ের অনুমতি সাপেক্ষে কার্যকর হবে বলে প্রকাশ।