টাঙ্গাইলে পুলিশ এলাকাবাসী সংঘর্ষে নিহত ৩

আপডেট : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৫, ১৩:৫২
টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে মায়ের সামনে ছেলেকে বিবস্ত্র করে নির্যাতন ও পরে মাকেও বিবস্ত্র করে নির্যাতনের প্রতিবাদে শুক্রবার বিকালে এলাকাবাসী বিক্ষোভ মিছিল বের করে। এতে পুলিশ গুলি চালালে গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলে দুইজন ও একজন ঢাকায় হাসপাতালে নেয়ার পথে মারা যান। এরা হলেন- ফারুক হোসেন, শামীম হোসেন ও শ্যামল চন্দ্র শীল। এসময় গুলিবিদ্ধ হয়ে ও লাঠিচার্জে অন্তত ৫০ জন আহত হয়েছেন। এ ঘটনায় কালিহাতী বাসস্ট্যান্ড ও আশপাশের এলাকাসহ পাশের ঘাটাইল উপজেলার হামিদপুরে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এলাকার সকল দোকানপাট ও টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ  হয়ে যায়।
 
পুলিশ ও এলাকাবাসী সূত্র জানায়, মা-ছেলেকে নির্যাতন করার ঘটনার প্রধান হোতা রফিকুল ইসলাম রোমা ও তার ভগ্নিপতি হাফিজুর রহমানের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী বিকাল চারটার দিকে মিছিল বের করে। এক পর্যায়ে কালিহাতী বাসস্ট্যান্ড থেকে মিছিলটি থানার দিকে যাওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ বাধা দেয়। এ সময় দুইপক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়। মিছিলকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ প্রথমে বেশ কয়েকটি টিয়ারশেল নিক্ষেপ ও লাঠিচার্জ করে। এলাকাবাসীর পক্ষ থেকেও পুলিশকে লক্ষ করে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করা হয়। এতে উভয়পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বেঁধে যায়। এ সময় বাসস্ট্যান্ডে কয়েকটি গাড়ি ভাঙচুর ও পুলিশের একটি মোটরসাইকেলে আগুন দেয়া হয়। তখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ গুলি ছোড়ে। গুলি ও লাঠিচার্জে  অর্ধশতাধিক  মিছিলকারী আহত হন। আহতদের স্থানীয় হাসপাতালে পাঠানো হয়।    
 
আহতদের মধ্যে কুষ্টিয়া গ্রামের ফারুক হোসেন কালিহাতী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মারা যান বলে জানিয়েছেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. বেলায়েত হোসেন। টাঙ্গাইল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার ডা. আশরাফ আলী জানান, চারজনকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়। এর মধ্যে ঢাকায় নেয়ার উদ্দেশে হাসপাতাল থেকে বের করার পরই ঘাটাইল উপজেলার সালেঙ্কা গ্রামের শামীম হোসেন মারা যান। বাকি তিনজনের মধ্যে দুইজনকে গুরুতর অবস্থায় ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।
 
এদিকে আমাদের ঘাটাইল সংবাদদাতা জানান, এদের মধ্যে ঢাকা নেয়ার পথে একজনের মৃত্যু হয়েছে। তার নাম শ্যামল চন্দ্র শীল। তিনি গুনি সালেঙ্কার অধিবাসী। অন্যদিকে গতকাল রাত সাড়ে ১১টার দিকে ইত্তেফাকের পক্ষ থেকে টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক মাহাবুব হোসেনের সঙ্গে এ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিষয়টি তিনিও শুনেছেন তবে নিশ্চিত নন।
 
এ ব্যাপারে কালিহাতী থানার ওসি শহিদুল ইসলামের সঙ্গে মোবাইলে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে সহকারী পুলিশ সুপার  (গোপালপুর সার্কেল) জমির উদ্দিনও সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।  জেলার ভারপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার সঞ্চয় সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি একজনের মৃত্যুর কথা স্বীকার করেন। তবে পুলিশের গুলিতে তার মৃত্যু হয়েছে কি না এ ব্যাপারে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
 
বিডি নিউজ জানায়, নিহতদের পরিবারকে ৫০ হাজার টাকা করে দেবে জেলা প্রশাসন। এছাড়া পুলিশ ও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে একাধিক বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে প্রচার করা হয়।
 
পুলিশের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিদর্শক মোখলেসুর রহমান ইত্তেফাককে বলেন, টাঙ্গাইলে যে ঘটনাটি ঘটেছে সেটা দুঃখজনক। এই ঘটনায় পুলিশের কোন অবহেলা আছে কি-না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পুলিশ সদর দফতরের অপর একটি সূত্র জানায়, টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার বিষয়টি ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের নজরে আনেননি। কেন এত বড় ঘটনা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়নি সেই বিষয়টা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি পুলিশের কোন গাফিলতি থাকলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।
 
প্রসঙ্গত, কালিহাতী উপজেলার সাতুটিয়া গ্রামের মোজাফফর আলীর ছেলে রফিকুল ইসলাম রোমার তৃতীয় স্ত্রীর সঙ্গে ঘাটাইল উপজেলার আঠারদানা গ্রামের এক ছেলের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। সম্প্রতি রোমার স্ত্রী ওই ছেলের কাছে চলে যান। গত মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) রোমা তার ভগ্নিপতি হাফিজুর রহমানকে সঙ্গে নিয়ে স্ত্রীসহ ওই ছেলে ও তার মাকে সাতুটিয়ায় নিজ বাড়িতে নিয়ে এসে মারপিট শুরু করেন। এক পর্যায়ে  ছেলেটিকে বিবস্ত্র করে ছবি তোলা হয় এবং লাঠি দিয়ে আঘাত করা হয়। ছেলের মুখ দিয়ে রক্ত পড়তে থাকলে তার মা এগিয়ে যান। তখন মাকেও বিবস্ত্র করার জন্য রোমা তার (ছেলের মা) কাপড় ধরে টানতে থাকেন। তখন ওই নারী বিবস্ত্র না করার জন্য আকুতি জানান। পরে তাকেও মারপিট করা হয়। তখন মা-ছেলে কান্না শুরু করলে তাদের একটি ঘরে নিয়ে তালাবদ্ধ করে রাখা হয়। এ খবর জানতে পেরে এলাকাবাসী এগিয়ে এসে তাদের উদ্ধার করে। এ ঘটনার পর ছেলেটির মা বাদী হয়ে কালিহাতী থানায় মামলা করেন। পুলিশ রোমা ও হাফিজুরকে গ্রেফতার করেছে। নির্যাতিত মা ও ছেলে বর্তমানে ঘাটাইল হাসপাতালে চিকিত্সাধীন রয়েছেন বলে জানা গেছে।