ডাকসু নির্বাচন :সেকাল ও একাল

আপডেট : ০৭ মার্চ ২০১৯, ২২:১২

দীর্ঘ ২৮ বছর পর আগামী ১১ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ১৯২১ সালের ১ জুলাই অক্সফোর্ড ও কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের আদলে  শিক্ষাদানকারী ও আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে কলা, বিজ্ঞান ও আইন— এই ৩টি অনুষদ, ১২টি বিভাগ, ৬০ জন শিক্ষক এবং ৮৫০ জন ছাত্র নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু। সে সময় মাত্র ৩টি হল ছিল, তা হলো: ঢাকা হল, জগন্নাথ হল এবং সলিমুল্লাহ্ মুসলিম হল। ১৯২২ সালের ১ ডিসেম্বর কার্জন হলে অনুষ্ঠিত শিক্ষকদের এক সভায় ১৯২৩-১৯২৪ শিক্ষাবর্ষে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ’ গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। পরে ১৯৫৩ সালে গঠনতন্ত্র সংশোধনের মাধ্যমে নাম করা হয় ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ’ (ডাকসু)। একসময় এই ডাকসুকে দেশের মিনি পার্লামেন্টও বলা হতো। ডাকসু ও হল সংসদ পাঠ্যসূচির বাইরে খেলাধুলা, সাহিত্য ও সাংসৃ্কতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা, বিতর্ক সভার আয়োজন ও বার্ষিকী প্রকাশসহ ছাত্র-ছাত্রী এবং দেশের মানুষের স্বার্থসংশ্লিষ্ট অনেক বিষয়ে বিগত দিনগুলোতে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালনসহ  উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে।

বাংলাদেশের সামগ্রিক ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায় যে, ’৫২’র ভাষা আন্দোলন, ’৬২’র শিক্ষা আন্দোলন, ’৬৬’র ছয়দফা আন্দোলন, ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান ও ১১ দফা আন্দোলন এবং ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধসহ পরবর্তী সকল গণআন্দোলনে ও সংগ্রামে ঐতিহ্যবাহী ডাকসু গৌরবময় ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগের অভাব ও ছাত্র সংগঠনগুলোর আন্তরিকতা না থাকায় দীর্ঘ ২৮ বছর ধরে ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচন হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের নির্বাচিত প্রতিনিধি না থাকার কারণে খেলাধুলা ও সৃজনশীল সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডও বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তাছাড়া আগামীদিনে দেশের জন্য যোগ্য নেতৃত্বও তৈরি হচ্ছে না । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর এ পর্যন্ত ৩৬ বার ডাকসু নির্বাচন হয়েছে। স্বাধীনতার পর ৪৮ বছরে নির্বাচন হয়েছে মাত্র ৬ বার। অথচ প্রতিবছর নির্বাচন হওয়ার কথা, কিন্তু তা হয়নি। স্বাধীন দেশে ১৯৭৩ সালে প্রথম ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচন হয়। পরে ১৯৭৯ ও ১৯৮০ সালে দু’বার এবং ১৯৮৯ ও ১৯৯০ সালে দু’বার নিয়মিত নির্বাচন হয়েছে। ১৯৯০ সালে ৬ জুন সর্বশেষ ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

ডাকসু নির্বাচনে এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল ছাত্র-ছাত্রী তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে। ডাকসুতে বেড়েছে পদের সংখ্যা। আছে ছাত্রীদের হল সংসদ। নির্বাচনী প্রচারেও খরচ বাড়ছে, এসেছে নতুনত্ব।  কিন্তু একসময় এমনটা ছিল না। দেশের প্রখ্যাত সাংবাদিক নির্মল সেন ১৯৫৪-৫৫ সালের চিত্র তাঁর লেখায় এভাবে তুলে ধরেছেন— ‘ইউনিয়ন নির্বাচন ছিল। ইউনিয়ন নির্বাচনে প্রার্থীদের যোগ্যতার বিচার হতো রাজনীতির মাপকাঠিতে। ভালো ছাত্রের আকর্ষণ ছিল নিশ্চয়ই। তখন মেয়েদের পৃথক কোনো হল ছিল না। আজকের রোকেয়া হলের নাম ছিল চামেলী হাউস। ছাত্রীরা এস.এম.হল, এফ.এইচ.হল বা ঢাকা হলের ছাত্রী হিসাবে ভর্তি হতো। ইউনিয়ন নির্বাচনে দাঁড়াতো বিভিন্ন হলের প্রার্থী হয়েই। ছাত্রী হলের পৃথক কোনো অস্তিত্ব ছিল না। কেন্দ্রীয় ছাত্র ইউনিয়ন অর্থাত্ ডাকসুর নির্বাচন ছিল পরোক্ষ। এক এক হলের জন্য এক এক বত্সর সহ-সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদ নির্দিষ্ট থাকতো। বিভিন্ন হল থেকে কেন্দ্রীয় ছাত্র ইউনিয়নের নির্বাচিত সদস্যরা ডাকসুর কর্মকর্তা নির্বাচিত করতো। নির্বাচনে সেকালেও হুল্লোড় ছিল। তবে ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে আজকের পর্যায়ে পৌঁছেনি কখনও।’ (শতদল, হীরক জয়ন্তী ১৯৮০ স্মরণিকা, শহীদুল্লাহ্ হল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)

১৯৭৯ ও ১৯৮০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র হিসাবে ডাকসু নির্বাচনে দু’বার ভোটাধিকার প্রয়োগ করার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। একই সাথে ১৯৭৯ সালে আমি ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ হলের ছাত্র সংসদে সাহিত্য সম্পাদক নির্বাচিত হই। উত্সবমুখর এবং অত্যন্ত সুষ্ঠু ও সুন্দর পরিবেশে তখনকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। নির্বাচন নিয়ে কারো কোনো অভিযোগ আমরা শুনতে পাইনি। তখন ডাকসু বিশ্ববিদ্যালয়ে গণতান্ত্রিক ধারা বজায় রেখে সহশিক্ষা কার্যক্রমে সর্বদা ছাত্র-ছাত্রীদের পাশে থেকেছে, আন্দোলনেও থেকেছে। শহীদুল্লাহ্ হল সংসদের উদ্যোগে ১৯৮০ সালের ২৭ ও ২৮ সেপ্টেন্বর দু’দিনব্যাপী হলের ‘হীরক জয়ন্তী’ অনুষ্ঠান হয়েছিল। এতে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর প্রথম দিন ছিল আলোচনা, স্মৃতিচারণ, চা-চক্র ও নাট্যানুষ্ঠান। দ্বিতীয় দিন প্রীতিভোজ ও সাংসৃ্কতিক অনুষ্ঠান ছিল। সেদিন গৌরবময় হলের প্রাঙ্গণে দেখা হয়েছিল প্রাক্তন ও বর্তমান ছাত্রদের। সেকাল ও একালের ছাত্রদের  সাক্ষাতে আনন্দে মুখরিত হয়েছিল হল প্রাঙ্গণ। ছাত্র সংসদের উদ্যোগে হয়েছে সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সপ্তাহ, বার্ষিক নাটক ও ক্রীড়া প্রতিযোগিতা।

অনুষ্ঠানগুলোতে প্রধান ও বিশেষ অতিথি হয়ে যাঁরা হলে এসেছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্কালীন উপাচার্য অধ্যাপক ফজলুর হালিম চৌধুরী, জাতীয় অধ্যাপক ড. কাজী মোতাহার হোসেন, অধ্যাপক সরদার ফজলুল করিম, অধ্যপক আবু হেনা মুস্তাফা কামাল, কবি আসাদ চৌধুরী, কবি শিহাব সরকার এবং কবি আবিদ আজাদ প্রমুখ। সে সময় হল সংসদ থাকার কারণেই শহীদুল্লাহ্ হলে এসব গুণীজনের আগমন সম্ভব হয়েছিল। পরে হলে এ ধরনের কার্যক্রম এভাবে হয়েছে বলে আমার জানা নেই। এ থেকে সহজে উপলব্ধি করা যায় যে, কেন ডাকসু ও হল সংসদ থাকা প্রয়োজন। এক কথায়  বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের স্বার্থেই ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচন নিয়মিত অনুষ্ঠিত হওয়া জরুরি, এর কোনো বিকল্প নেই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়তন প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ের চেয়ে কমে গেলেও বৃদ্ধি পেয়েছে অবকাঠামোসহ ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সংখ্যা। এখন অধ্যয়নরত ছাত্র-ছাত্রী প্রায় ৪০ হাজার। আগামী ১১ মার্চ এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা ডাকসু’র ২৫টি পদে এবং ১৮টি হল সংসদের প্রতিটিতে ১৩টি পদে ভোটাধিকার প্রয়োগ করে আগামী একবছরের জন্য তাদের প্রতিনিধি নির্বাচিত করবে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন দাবি-দাওয়া ও প্রতিশ্রুতি তুলে ধরে ছাত্র সংগঠনগুলো নির্বাচনে অংশগ্রহণ ও প্রচারণা শুরু করেছে। অতীতের মতো এবারকার ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচন নিয়ে সবার মাঝে বিপুল উত্সাহ ও উদ্দীপনা লক্ষ করা যাচ্ছে। দেশের বহু মানুষ নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে হয়েছে তা দেখতে অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষায় আছেন। গৌরবময় ঐতিহ্যের অধিকারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা দীর্ঘদিন পর হলেও পুনরায় ডাকসু ও হল সংসদ ফিরে পেতে যাচ্ছে, এটা অনেক বড় প্রাপ্তি। সুষ্ঠু, সুন্দর, শান্তিপূর্ণ ও আনন্দঘন পরিবেশে অনুষ্ঠিত হোক আসন্ন ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচন। ডাকসু’তে  ফিরে আসুক প্রাণচাঞ্চল্য।

n লেখক: ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ হল ছাত্র সংসদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সাহিত্য সম্পাদক ও গবেষক