নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু ১৯৪৫ সালের ১৮ আগস্ট মৃত্যুবরণ করেন, ভারতের সরকারি তথ্য এটাই। কিন্তু সম্প্রতি প্রকাশিত কিছু ‘ডিক্লাসিফাইড’ নথির দাবি অনুযায়ী, ব্রিটিশ এবং আমেরিকার গোয়েন্দারা বিশ্বাস করতেন যে ওই সময়ে সুভাষ বসু আসলে জীবিত ছিলেন। কেবল তাই নয়, ১৯৪৮ এবং ১৯৪৯ সালের মধ্যে দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় অঞ্চলে একাধিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের জন্য তিনি ইন্ধনও দিয়েছিলেন!
সুভাষ বসুর মৃত্যু নিয়ে বেশ কয়েকটি ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’ প্রচলিত আছে। জানা গেছে, ১৯৪৫ সালে তাইপেইতে একটি বিমান দুর্ঘটনায় নেতাজি নিহত হয়েছিলেন বলে প্রচলিত যে বিশ্বাস আছে, তা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করত ব্রিটিশ ও মার্কিন গোয়েন্দারা। তাই তাকে খুঁজে বের করতে বসু পরিবারের সদস্যদের উপর নজরদারি চালিয়েছিল ভারতের গোয়েন্দারা। এমনকি কোনো কোনো তথ্য ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে বিনিময়ও করা হতো। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পক্ষ থেকে শুক্রবার সুভাষ বসু সংক্রান্ত ৬৪টি গোপন নথি প্রকাশ করা হয়েছে। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি দাবি করেছেন, এসব নথি থেকে অনেক অজানা রহস্য বেরিয়ে আসবে।
গোপন নথি থেকে জানা গেছে, জওহরলাল নেহরুর সরকারের সময় ভারতের তত্কালীন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নেতাজির দু’জন ভ্রাতুষ্পুত্রের উপর নজরদারি করত। এই ধারা চলেছে ১৯৪৮ থেকে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত।
বসু পরিবারের সদস্যদের ওপর নজরদারি চালালেই খোঁজ মিলবে নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুর। এই ধারণা থেকে স্বাধীন ভারতে ইন্দিরা গান্ধীর শিক্ষক নেতাজির ভাতিজা অমিয়নাথ বসুর ওপর নজরদারি চালাতো ভারতের ১৪ গোয়েন্দা। সেই সময় ভারতে ক্ষমতায় জওহরলাল নেহেরুর সরকার। কেন এই নজরদারি তা নিয়ে প্রশ্ন তুললেন তাঁর ছেলে চন্দ্র বসু।
তিনি বলেন, আমার বাবা অমিয়নাথ বসু কেমব্রিজে অর্থনীতি পড়তেন, পরে ব্যারিস্টার হন। এমনকি নেহরুজির অনুরোধে ইন্দিরা গান্ধীকে অক্সফোর্ড, কেমব্রিজে প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রশিক্ষণও দিয়েছিলেন। তাঁর ওপর কেন আলাদা করে নজরদারি? শুধু তাই নয়, নেতাজিকে নিয়ে যেসব ফাইল প্রকাশিত হয়েছে সেগুলোর কয়েকটি অমিয়নাথ বসুর ওপর এবং সুভাষচন্দ্র বসু সম্পর্কিত। সেই ফাইলে আছে ১৪ জন গোয়েন্দা নিয়মিত তাঁর ওপর নজরদারি করতেন। পাশাপাশি তাঁর অভিযোগ, ১৯৫৭ সালে তাঁর বাবা যখন জাপান গিয়েছিলেন, সেই সময় তাঁর ওপর নজরদারি করা হয়েছিল এবং সেই সব তথ্য ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এম আই ৫ এর সঙ্গে বিনিময় করাও হয়েছিল।
শুক্রবার প্রকাশিত নেতাজি সম্পর্কিত ফাইলগুলোর একটিতে রয়েছে, ওয়্যারলেস রিসিভিং সেট রাখার জন্য তাঁর পরিবারের কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। কেন? তখনকার দিনে বিদেশি রেডিও স্টেশন ধরার জন্য অনেকের বাড়িতেই শক্তিশালী ওয়্যারলেস রিসিভিং সেট থাকত। সেটার জন্য আলাদা লাইসেন্স নিতে হত। নেতাজির পরিবারের কয়েকজনকে এ ধরনের সেট ব্যবহারের জন্য ভারতের স্বাধীনতার কিছু আগে গ্রেফতারও করা হয়েছিল। একটি ফাইল থেকে জানা গেছে, ব্রিটিশ সরকারের সন্দেহ ছিল বিদেশি রেডিও স্টেশন ধরার পাশাপাশি ওই সেটের মাধ্যমে নেতাজি সুভাষ চন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে তার পরিবার। স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, তাহলে ব্রিটিশ সরকারও কী নিশ্চিত ছিল তাইহোকুর বিমান দুর্ঘটনায় নেতাজির মৃত্যু হয়নি। পুরো বিষয়টাই ছিল পরিকল্পিত?
প্রচলিত ধারণা, কলকাতার এলগিন রোডের বাড়িতে নেতাজিকে অন্তরীণ করে রেখেছিল ব্রিটিশ সরকার। সেখান থেকে তিনি ছদ্মবেশে আফগানিস্তানের পথে রওনা হন। নেতাজির আরেক ভাই অশোকনাথ বসুর মেয়ে জয়ন্তী বোস রক্ষিত জানিয়েছেন, খনি রসায়নবিদ অশোকনাথ বসুর ধানবাদের বাংলো থেকেই ১৯৪১ সালের ১৮ জানুয়ারি গভীর রাতে সুভাষচন্দ্র বসু ওরফে আফগানবেশী জিয়াউদ্দিন খান পেশোয়ার যাওয়ার জন্য ট্রেন ধরেছিলেন।
বেশ কিছুদিন ধরে রটনা ছিল রেনকোজি মন্দিরে রাখা ওই চিতাভস্ম নেতাজির। চন্দ্র বসুর অভিযোগ, বিধানচন্দ্র রায় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন ভারতের তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু জাপানের রেনকোজি মন্দিরে রাখা চিতাভস্ম এনে পশ্চিমবঙ্গে রাখার উদ্যোগ নিতে বলেছিলেন। এবং তা বেশ উত্সব অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে। চন্দ্রনাথ বসু বলেন, বিধানচন্দ্র রায় তখন নেহরুকে জানিয়ে দিয়েছিলেন, পশ্চিমবঙ্গের মানুষদের মনের যা অবস্থা তাতে সেসব করলে বিপদ হবে।
এ বার কেন্দ্রের পালা:কৃষ্ণা বসু
এদিকে আনন্দবাজার পত্রিকা জানায়, নেতাজি সংক্রান্ত নথি প্রকাশকে স্বাগত জানিয়েছেন বসু পরিবারের সদস্য কৃষ্ণা বসু। তিনি বলেন, ‘এ ব্যাপারে উদ্বেগ নেয়ার শুরুতেই আমি মমতাকে অভিনন্দন জানিয়েছিলাম। আবারও জানাচ্ছি। না হলে নেতাজিকে নিয়ে একটা যেন লুকোচুরি খেলা চলছিল। পাগলের মত গল্প তৈরি করছিল কেউ কেউ। নথি প্রকাশ করে তাই বাস্তবের মুখোমুখি হওয়াই ভালো। তবে আমি চাইব কেন্দ্র নেতাজির নথিগুলো প্রকাশ করুক। ওদের কাছে আরও গুরুত্বপূর্ণ নথি আছে। সবচেয়ে বড় কথা, স্বাধীনতার পরেও বসু পরিবারের উপর নজরদারি ছিল। শরত্চন্দ্র বসু ১৯৫০-এর ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত জীবিত ছিলেন। তার উপরেও ছিল গোয়েন্দা নজরদারি।’
এদিকে, কেন্দ্রের পক্ষ থেকেও নেতাজি সংক্রান্ত নথি প্রকাশ করার দাবি জানিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। তবে রাজ্যের নথি প্রকাশ নিয়ে মন্তব্য করতে চাননি নেতাজির নাতি, অনিতা পাফের পুত্র পেটার অরুণ পাফ। প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে ফেসবুকে পেটার বলেন, ‘‘আমি তো নথি দেখিনি। কীভাবে বলব? আমার কোনও মন্তব্য নেই।’
