পদ্মা সেতুর সঙ্গে সমানতালে এগোচ্ছে রেলপথের কাজ

আপডেট : ০৭ মার্চ ২০১৯, ২২:৫৮

পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ দ্রুত এগিয়ে চলেছে, বিশাল কর্মযজ্ঞ। প্রমত্তা পদ্মায় ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হচ্ছে সমৃদ্ধ এক বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি। সেই সঙ্গে এগিয়ে চলেছে রেললাইনের নির্মাণ কাজ। সেতুতে স্থাপন করা ৮টি স্প্যানে রেললাইনের কাজও শুরু হয়ে গেছে।

বুধবার সরেজমিন পরিদর্শন শেষে রেলপথমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন সাংবাদিকদের বলেন, পদ্মাসেতু ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে যখন খুলে দেওয়া হবে, তখন একইসঙ্গে রেলপথও উন্মুক্ত হবে। আর সে কারণেই সড়ক সেতুর সঙ্গে রেললাইনের কাজ সমান গতিতে চলছে। ‘পদ্মাসেতু রেললিংক প্রকল্প’ নামে এই রেলপথ ১৭২ কিলোমিটার দীর্ঘ। যাবে দক্ষিণাঞ্চলের ৮টি জেলার মধ্যে দিয়ে। এই রেললাইনের স্থাপনের জন্য কাজ চলছে কেরানীগঞ্জের পানগাঁও, সিরাজদিখানের কুচিয়ামারা, মুন্সীগঞ্জের মাওয়া ও শরীয়তপুরের জাজিরায়। বুধবার রেলপথমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন এসব এলাকা পরিদর্শন করেন।

চীন সরকার মনোনীত নির্মাণ প্রতিষ্ঠান চায়না রেলওয়ে গ্রুপ লিমিটেড জিটুজি সিস্টেমের অধীনে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। এ রেললাইন হবে ব্যালাস্টবিহীন। ইস্পাতের বদলে সিমেন্ট ব্যবহারের মাধ্যমে আলাদাভাবে রেললাইন নির্মাণ করে যন্ত্রের মাধ্যমে বসিয়ে দেয়াই হলো ব্যালাস্টবিহীন পদ্ধতি। ফলে নির্মাণের পর ৬০ বছরেও মেরামত লাগবে না। এতে চলতে পারবে বুলেট ট্রেন।

প্রকল্প কর্মকর্তারা জানান, ১৭২ কিলোমিটার রেলপথ যাবে আটটি জেলার মধ্যে দিয়ে। এরমধ্যে রয়েছে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, শরীয়তপুর, মাদারীপুর, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, নড়াইল ও যশোর। আর এ রেলপথের প্রায় ২২ কিলোমিটার হবে মাটির ওপর দিয়ে। অর্থাত্ সেতুর মতো এলিভেটেড আকারে। এলিভেটেড ভায়াডাক্টের (এক ধরনের ব্রিজ) ওপর দু’টি প্ল্যাটফর্ম, একটি মেইন লাইন, দু’টি লুপ লাইনসহ রেলওয়ে স্টেশন নির্মাণ ও লিফট স্থাপন করা হবে। ১১ মিটার উঁচু রেললাইনের নিচে দিয়ে সড়কের জন্য আন্ডার পাস নির্মাণের মাধ্যমে উভয় পথে নিরবচ্ছিন্ন, নিরাপদে ট্রেন ও যানবাহন চলাচল করতে পারবে।

স্টেশন থাকবে ১৪টি

১৭২ কিলোমিটার রেলপথে স্টেশন থাকবে ১৪টি। এগুলো হচ্ছে-কেরানীগঞ্জ, নিমতলা, শ্রীনগর মাওয়া, জাজিরা, শিবচর, ভাঙ্গা, নাগরকান্দা, মোকসেদপুর, মহেশপুর, লোহাগড়া,                নড়াইল, পদ্মাবিলা ও জামদিয়া। রেলপথটির প্রথম সেকশন কমলাপুর থেকে গেন্ডারিয়া পর্যন্ত হবে ডুয়েল গেজ ডাবল লাইন, দ্বিতীয় সেকশন হবে গেন্ডারিয়া থেকে মাওয়া পর্যন্ত ৩৬ কিলোমিটার, সিঙ্গেল লাইন ব্রডগেজ। এই সেকশনে থাকবে ৪টি স্টেশন। তৃতীয় সেকশন মাওয়া থেকে ভাঙ্গা জংশন পর্যন্ত, সিঙ্গেল ব্রডগেজ লাইন ৪২ কিলোমিটার। সেখানে থাকবে ৫টি স্টেশন। চতুর্থ সেকশন হবে ভাঙ্গা থেকে রুপদিয়া, পদ্মাবিলা হয়ে সিংগিয়া পর্যন্ত ৮৬ কিলোমিটার, সিঙ্গেল ব্রডগেজ লাইন। এই সেকশনে ১০টি স্টেশন পড়বে। এই রেলপথ প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে নতুন রেলকোচ কেনা। প্রকল্পের টাকায় একশটি ব্রডগেজ যাত্রীবাহী কোচ কেনা হবে। যার চারটি কোচ হবে এসি স্লিপার কোচ, ১৬টি এসি চেয়ার কোচ, ৫২টি শোভন চেয়ার কোচ, ১৮টি প্যান্ট্রিসহ শোভন চেয়ার কোচ এবং ১০টি অন্যান্য কোচ। দেশের যোগাযোগ খাতে সবচেয়ে বড় এই প্রকল্পে ব্যয় হচ্ছে ৪০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে বাংলাদেশ সরকার ১৮ হাজার কোটি দিচ্ছে। আর জি-টু-জি ভিত্তিতে চীনা সহায়তার পরিমাণ ২১ হাজার কোটি টাকা।

রেলপথমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন রেলপথ নির্মাণ জমি পরিদর্শন শেষে জানান, পদ্মাসেতু ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে যখন খুলে দেওয়া হবে, তখন একইসঙ্গে রেলপথও উন্মুক্ত হবে। ২০২২ সাল প্রকল্প শেষ হওয়ার মেয়াদ থাকলেও ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে ঢাকা থেকে মাওয়া এবং ভাঙ্গা থেকে জাজিরা (৫১ কিলোমিটর) রেলপথের নির্মাণ কাজ শেষ করার জন্য কর্মকর্তাদের তাগিদ দেন মন্ত্রী।

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে রেলপথ মন্ত্রী বলেন, রেলসংযোগ চালু হলে প্রথমবারের মতো ঢাকার সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলের রেল যোগাযোগ স্থাপিত হবে। সম্ভাবনা তৈরি হবে বরিশাল ও পায়রা গভীর সমুদ্র বন্দরের সঙ্গে রেল যোগাযোগের। পাল্টে যাবে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের জীবনমান।

পদ্মাসেতুর অগ্রগতি

 প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের মূল সেতুর অগ্রগতি শতকরা ৭৩ ভাগ, নদীশাসন কাজের অগ্রগতি শতকরা ৫০ ভাগ। পদ্মা সেতুর মোট ২৬১টি পাইলের মধ্যে ১৯১টি পাইলের কাজ শেষ করা হয়েছে এবং আরো ১৫টি পাইলের কাজ আংশিক শেষ হয়েছে। মোট পিলার ৪২টি, এর মধ্যে ১৮টির কাজ পুরোপুরি শেষ হয়েছে। ১৫টি পিলারের কাজ চলমান রয়েছে। মোট স্প্যান ৪১টি, ইতোমধ্যে ৮টি স্প্যান স্থাপন করা হয়েছে। ফলে এখন ১২০০ মিটার দৃশ্যমান হয়েছে। এ ছাড়া ১৭টি স্প্যান প্রস্তুত রয়েছে। আরো ১৮টি স্প্যানের প্রস্তুতি কাজ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।