ইতালীয় নাগরিক খুন নিয়ে রহস্যের জট

আপডেট : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৫, ০০:২২

জঙ্গি বিষয়ে অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হঠাত্ একটি সতর্কবার্তা পেয়ে শেষ মুহূর্তে বাংলাদেশ সফর পিছিয়ে দেয় অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট দল। এরপর বাংলাদেশ পরিস্থিতি পর্যালোচনা করতে রবিবার ঢাকায় আসেন প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা শন ক্যারল। তার সঙ্গে রয়েছেন নিরাপত্তা দলের আরেক সদস্য। ওই দিন নিরাপত্তা দলটি দুটি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে নিরাপত্তার বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। সোমবার অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট নিরাপত্তা প্রতিনিধি দল বৈঠক করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে। একই দিন র্যাবের সঙ্গে বৈঠক করে বিকাল সোয়া ৫টায় র্যাব সদর দফতর থেকে বের হয় নিরাপত্তা দল। বৈঠকে জঙ্গি তত্পরতা নিয়ে কথা হয়।

 
বৈঠকের ঠিক এক ঘণ্টা পাঁচ মিনিট পর সন্ধ্যা ৬টা ২০ মিনিটে ইতালীয় নাগরিক তাভেল্লা চেজারকে গুলশানে গুলি করে হত্যা করা হয়। এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। অস্ট্রেলীয় ক্রিকেট নিরাপত্তা প্রতিনিধি দলের বাংলাদেশে আসা, ক্রিকেট দলের বাংলাদেশ সফর স্থগিত হওয়া, একজন বিদেশি নাগরিক খুন এবং আইএস-এর সম্পৃক্ততার অভিযোগ নিয়ে দেশে-বিদেশে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।
 
ঘটনার পর পর ব্রিটিশ হাইকমিশন তাদের নাগরিকদের সতর্ক থাকতে পরামর্শ দিয়েছেন। এছাড়া আগে নাগরিকদের চলাচল সীমিত করার পরামর্শ দেয়া মার্কিন দূতাবাস এবার সাবধানতা অবলম্বনের পাশাপাশি দূতাবাসের ওয়েবসাইটে দেয়া নিরাপত্তা সংক্রান্ত সর্বশেষ তথ্যের দিকে চোখ রাখতে বলেছে। মঙ্গলবার কানাডা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নও তাদের নাগরিকদের সতর্ক থাকতে নির্দেশ দিয়েছে। ইতালীয় নাগরিক খুনের পর আরবী লেখায় দায় স্বীকার করে ইসলামিক স্টেট (আইএস)–এমনটি দাবি করে যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক সাইটইন্টেল গ্রুপ নামে একটি ওয়েবসাইট। অবশ্য গতকাল একটি গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে ওয়েবসাইটের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা হয়। পরে ওয়েবসাইট থেকে এ সংক্রান্ত সংবাদটি প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। জানা গেছে, রিটা কার্টস নামের একজন নারী ওই সাইটটি তত্ত্বাবধান করেন। জঙ্গি বিষয়ে মনিটর করে এই ওয়েবসাইট। যুক্তরাষ্ট্রও জঙ্গি সংক্রান্ত তথ্যের জন্য এই ওয়েবসাইটের ওপর নির্ভর করে।
 
এদিকে এই ঘটনার জের ধরে মঙ্গলবার বাংলাদেশে সকল ইন্টারন্যাশনাল স্কুল বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এই হত্যাকাণ্ডের পর কোনো কোনো মহলের তত্পরতাও রহস্যের জন্ম দিয়েছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষক এবং গোয়েন্দা সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তারা এমনটি মনে করছেন। সন্ত্রাসবাদ নিয়ে কাজ করেন এমন ৪টি শক্তিশালী গোয়েন্দা সংস্থা ঘটনার পর দফায় দফায় বৈঠক করেছেন। বাংলাদেশকে জঙ্গি রাষ্ট্র বানানোর ষড়যন্ত্রের অংশ হিসাবে পরিকল্পিতভাবে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে কিনা সেটাও খতিয়ে দেখছে গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা।
 
বাংলাদেশে যারা দীর্ঘদিন জঙ্গিদের লালনপালন করে আসছেন তাদের বি টিম হচ্ছে জঙ্গিবাদী গোষ্ঠী। বিভিন্ন সময় তদন্তে এটি প্রমাণিত হয়েছে। এটিতে তাদের সম্পৃক্ততা আছে কীনা সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। গোয়েন্দা এবং অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, মোটর সাইকেল দিয়ে আইএস জঙ্গিদের হামলা করার নজির নেই। তদন্তের আগে আইএস জঙ্গিদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ তাই রহস্যের সৃষ্টি করেছে। জঙ্গি জঙ্গি বলে যেসব দেশ মুখে ফেনা তুলে ফেলে এটি সেসব দেশের ষড়যন্ত্র কীনা সেটাও দেখা হবে বলে জানিয়েছে গোয়েন্দা সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তারা। ইতোমধ্যে এই হত্যার তদন্তভার মহানগর গোয়েন্দা পুলিশকে (ডিবি) দেয়া হলেও ৪টি গোয়েন্দা সংস্থা এটি নিয়ে কাজ করছে।
 
দেশে অনেক উগ্রবাদী সংগঠন রয়েছে। এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততাও উড়িয়ে দেয়া যায় না। তবে তদন্তের আগে আইএস সম্পৃক্ততার কথা বলা ষড়যন্ত্রের অংশ বলেই মনে করেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, এটি নিয়ে সরকারের চেয়ে দেশ বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
 
পুলিশের ভারপ্রাপ্ত আইজি মোখলেসুর রহমান এ প্রসঙ্গে বলেন, বিদেশি নাগরিক হত্যাকাণ্ড সুপরিকল্পিত। এটা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। তবে এই ঘটনাকে বড় করার জন্য তত্পর রয়েছেন একটি মহল। তিনি বলেন, এই ঘটনাকে আমরা খাটো করে দেখছি না। কূটনৈতিক পাড়ায় চার স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা দেয়া হয়েছে, গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। এছাড়া আগের চেয়ে দ্বিগুণ পুলিশ টহলে রয়েছে। রহস্য উদঘাটনে ডিবির পাশাপাশি অন্যান্য সংস্থাও কাজ করছেন বলে তিনি জানান। তিনি আরও বলেন, যারা এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জঙ্গি সম্পৃক্ততার কথা বলছেন তাদের অনুরোধ করছি তথ্য প্রমাণ থাকলে আমাদেরকে দেয়ার জন্য। দয়া করে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করবেন না।
 

র্যাবের মহাপরিচালক বেনজির আহমেদ বলেন, এটি নিয়ে তদন্ত চলছে। যে ওয়েবসাইটে আইএস এর সম্পৃক্ততার কথা বলা হয়েছে সেটি থেকে ইতোমধ্যে সংবাদটি সরিয়ে ফেলা হয়েছে। ওই ওয়েবসাইট আইএস এর বিভিন্ন কার্যক্রম মনিটর করে বলে তিনি জানান।