ধর্মীয় মতের দ্বন্দ্বে খিজির খান খুন

আপডেট : ০৬ অক্টোবর ২০১৫, ২৩:৩৭

ধর্মীয় মতাদর্শের দ্বন্দ্ব থেকেই বিদ্যুত্ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) সাবেক চেয়ারম্যান খিজির খানকে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রাথমিক তদন্তে নিশ্চিত হয়েছে পুলিশ। তবে এর পাশাপাশি সম্পদ ভাগবাটোয়ারা ও পারিবারিক দ্বন্দ্বের বিষয়ও মাথায় রেখে পুলিশ তদন্ত কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এই তিন কারণের বাইরে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের চরমপন্থিদেরও সন্দেহের তালিকায় রাখা হয়েছে।

 
গত সোমবার রাত ৮টার দিকে মধ্য বাড্ডার গুলশান লিংক রোডের পাশে ছয়তলা মসজিদ রোডের জ, ১০/১ নম্বর বাড়ির দোতলায় গলা কেটে হত্যা করা হয় খিজির খানকে। গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যা পর্যন্ত এ ঘটনায় কোন মামলা হয়নি। 
 
পুলিশের গুলশান বিভাগের উপ-কমিশনার এস এম মোশতাক আহমেদ খান বলেন, খিজির হত্যাকাণ্ডটি পরিকল্পিত। ধারণা করা হচ্ছে ধর্মীয় মতাদর্শগত দ্বন্দ্বে তিনি খুন হন। এছাড়া সম্পত্তি ভাগবাটোয়ারা অথবা পারিবারিক দ্বন্দ্বের কারণেও তাকে হত্যা করা হতে পারে। তাই এই তিন কারণকে সামনে রেখে তদন্ত কাজ শুরু হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। ঘরের কিছু জামাকাপড় এলোমেলো ছিল। এসব বিষয় মাথায় রেখে তদন্ত চলছে। তদন্তের স্বার্থে এখন আর কিছু বলা যাচ্ছে না।
 
নিহতের ছোট ছেলে আহমেদউল্ল­াহ বলেন, বাবার হত্যাকাণ্ডে তিনি কোনো ক্লু খুঁজে পাচ্ছেন না। বাবার সঙ্গে কারও কোনো বিরোধ ছিল না। বাবা একেবারে ঘরোয়াভাবে ধর্ম নিয়ে আলোচনা করতেন। এ নিয়ে কারও সঙ্গে বিরোধ হওয়ার কথা নয়। তবুও কে বা কারা এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে তা নিয়ে নিশ্চিত নয় নিহতের পরিবার। তিনি বলেন, খিজির খানের লাশ প্রথমে তার বাসা মধ্য বাড্ডায় নেয়া হবে। তারপর নবাব আবদুল গণি রোডের বিদ্যুত্ অফিসে জানাজা শেষে তার গ্রামের বাড়ি কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার ফিলিপনগরে নিয়ে দাফন করা হবে। 
 
গত সোমবার রাতে মধ্য বাড্ডায় নিজ বাসায় গলা কেটে খিজির খানকে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। পুলিশ বলেছে, বাড়িটির নিচতলার গুদাম ঘর ভাড়া নেয়ার কথা বলে ৬-৭ জন যুবক সন্ধ্যার পর বাসায় প্রবেশ করে সবাইকে বেঁধে তাকে হত্যা করে। ছয়তলা বাড়ির দোতলায় এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। পরে খবর পেয়ে বাড্ডা থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে সুরতহাল প্রতিবেদন শেষে ময়নাতদন্তের জন্য লাশটি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠায়।
 
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গ সূত্রে জানা যায়, বেলা ১১টার দিকে মরদেহ ময়নাতদন্ত শেষে লাশটি নিহতের জামাতা শহিদুর রহমানের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে ময়নাতদন্তের বিষয়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রভাষক প্রদীপ বিশ্বাস বলেন, খিজির খানের গলায় সাড়ে সাত ইঞ্চি দৈর্ঘ্যের এবং দুই ইঞ্চি প্রস্থের একটি জখমের চিহ্ন রয়েছে। মাঝারি আকারের ধারালো অস্ত্র দিয়ে এক পোঁচ দেয়ায় তার গলার বড় রক্তনালী (ক্যারোটিক ভ্যাসেল) কেটে যায়। এতে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়। এ ছাড়া, নিহতের শরীরের কোথাও কোনো ক্ষতের চিহ্ন ও দুর্বৃত্তদের সঙ্গে ধস্তাধস্তিরও কোনো আলামত পাওয়া যায়নি।
 
গতকাল বেলা ৩টার দিকে নিহত খিজির খানের বাসায় গিয়ে দেখা যায়, সেখানে শতাধিক মানুষ ভিড় করেছেন। বাসার নিচতলার কলাপসিবল গেটে তালা লাগিয়ে নিচে বসে আছেন তার চাচাত ভাই মোখলেছুর রহমান। ওই বাসার বাসিন্দা ছাড়া কাউকেই ভেতরে ঢুকতে দিচ্ছেন না তিনি।  মোখলেছুর রহমান বলেন, তার সঙ্গে কারো কোনো শত্রুতা ছিলো না। এলাকার সবাই তাকে সম্মান করতেন। সবার সঙ্গেই তিনি হাসিমুখে কথা বলতেন। বংশ পরম্পরায় পীর হন খিজির খান। মধ্য বাড্ডার গুলশান লিংক রোডের পাশে ছয়তলা মসজিদ রোডের জ-১০/১ নম্বর বাড়ির তৃতীয় তলায় পরিবার নিয়ে থাকতেন খিজির খান। নকশাবন্দীয়া মুজাদ্দেদীয়া ত্বরিকায় অনুসারী ছিলেন। দোতলায় তার ‘রহমতিয়া খানকাহ শরিফ’ (ঢাকা শাখা) এর কার্যালয়। ঢাকা ছাড়াও দেশের বিভিন্ন এলাকায় রহমতিয়া খানকাহ শরীফের ১৫টি শাখা রয়েছে। প্রতিটি শাখাই খিজির খানের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়। নিহত খিজির খানের বাবা মৌলভি রহমত উল্লাহ্ পীর ছিলেন। বাবার মৃত্যুর পর তিনি নিজেও পীর হিসেবে খানকাহ শরীফের দায়িত্ব পালন করতেন। প্রতি বৃহস্পতিবার ওই খানকাহ্ শরীফে মাহফিল হতো। এতে বিভিন্ন মুরীদরা অংশ নিত ও জিকিরের আয়োজন করা হতো। সেখানে নারী-পুরুষ একসঙ্গে গভীর রাত পর্যন্ত ইবাদত বন্দেগী করতেন।
 
খিজির খানের মুরীদ ডা. শহীদুল্লাহ জানান, বাবার মৃত্যুর আগে থেকেই খিজির খান খানকাহ শরীফের ইমামতি করতেন। বাবার মৃত্যুর পর তিনি খানকাহ শরীফের পীরের আসনে বসেন।
 
খিজির খান হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবিতে গতকাল বাড্ডার মহানগর মহাবিদ্যালয় ও ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করেছেন। তারা খিজির খানের বাসার গলির সামনের পথ অবরোধ করে রাখেন। খিজির খান ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের সভাপতি ছিলেন।
 

গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে, গোপীবাগে কথিত পীর লুেফার রহমান ফারুকসহ ছয়জন ও পূর্ব রাজাবাজারে মওলানা নুরুল ইসলাম ফারুকীর মতোই একইভাবে নিজ ঘরে ঢুকে পরিবারের লোকজনকে বেঁধে রেখে গলা কেটে খিজির খানকে হত্যা করে দৃর্বুত্তরা। হত্যার ধরন দেখে মনে হচ্ছে, গোপীবাগের ছয় খুন ও ফারুকী হত্যা একই গ্রুপ করতে পারে। ওই দুই খুনের পর থেকেই গোয়েন্দারা বলে আসছেন ধর্মীয় কোন উগ্রপন্থি গ্রুপ সংক্ষুব্ধ হয়ে তাদের হত্যা করেছে। গোপীবাগে ছয় খুনের প্রায় দুই বছর এবং ফারুকী হত্যার এক বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও কোনো হত্যারই কূল-কিনারা করতে পারেনি গোয়েন্দারা।