দক্ষ মানবসম্পদ এবং উত্পাদিত পণ্যের বাজার ছাড়া কোনো শিল্প গড়ে উঠতে পারে না। এই খাত থেকে সর্বোচ্চ ফলাফল পেতে হলে প্রকৃত উদ্যোক্তা শ্রেণি গড়ে তোলা প্রয়োজন, যারা সত্যিকার অর্থেই শিল্পায়নের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে পারে
n রেজাউল করিম খোকন
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে ক্ষুদ্র ও মাঝারি এন্টারপ্রাইজগুলোর ভূমিকা অনেক গুরুত্বপূর্ণ সন্দেহ নেই। এ খাতটি শ্রমঘন এবং উত্পাদন সময়কাল স্বল্প হওয়ায় জাতীয় আয় বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে দ্রুত অবদান রাখতে সক্ষম। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যসমূহ, বিশেষ করে চরম দারিদ্র্য ও ক্ষুধা নির্মূল করা এবং নারী পুরুষের সমতা ও নারীর ক্ষমতায়নে এ খাত ব্যাপক ভূমিকা রাখতে সক্ষম। এশিয়ার বেশ কিছু সমৃদ্ধশালী দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে এসএমই খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এ ছাড়া বিশ্বের অন্যান্য দেশও এসএমইর ওপর ব্যাপক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তাদের চোখে এসএমই হচ্ছে কর্মসংস্থান তৈরির মেশিন এবং এ কারণেই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন, আয় বৈষম্য কমিয়ে আনা, দারিদ্র্য বিমোচন প্রভৃতি লক্ষ্য অর্জনের হাতিয়ার হিসেবে তারা ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উন্নয়নকে বেছে নিয়েছে। আমাদের এখানে বর্তমানে এসএমই খাতের উন্নয়নকে শিল্পায়নের চালিকাশক্তি বিবেচনা করে এ খাতকে অগ্রাধিকার খাত হিসেবে চিহ্নিত করেছে সরকার।
একটি দেশের শিল্পোন্নয়নে এসএমই খাতের ভূমিকা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, বৃহত্ কোনো কিছু করার চেয়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি কোনো কিছু করা তুলনামূলকভাবে সহজ ও সাবলীল। বিশেষ করে শিল্পায়নের ক্ষেত্রে। একটি শিল্পের গড়ে ওঠা নির্ভর করে অনেকগুলো সহায়ক শক্তির উপর। শিল্পের সহায়ক অবকাঠামোগত সুবিধা, প্রয়োজনীয় মূলধন, উন্নত প্রযুক্তি, দক্ষ মানবসম্পদ এবং উত্পাদিত পণ্যের বাজার ছাড়া কোনো শিল্প গড়ে উঠতে পারে না। এ সব দিক বিবেচনা করলে আমাদের দেশের শিল্পায়ন এসএমই ছাড়া সম্ভব নয়। এসএমই শুধু শিল্পায়নকেই নয়, একই সাথে দেশের অর্থনীতিকে ও সামনের দিকে এগিয়ে নিতে সহায়তা করে। তবে এই খাত থেকে সর্বোচ্চ ফলাফল পেতে হলে প্রকৃত উদ্যোক্তা শ্রেণি গড়ে তোলা প্রয়োজন, যারা সত্যিকার অর্থেই শিল্পায়নের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে পারে। উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর এসএমই ভাবনা পর্যালোচনা করলে দেখা যায় ওদের মূল ভবনা থাকে দেশকে শিল্পায়নের পথে ধাবিত করা। আর এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে তাদেরই উত্সাহিত করা হয় যাদের ব্যবসা করে টিকে থাকার যোগ্যতা আছে, যাদের উদ্যোক্তা হওয়ার মতো যোগ্যতা রয়েছে। অন্যদিকে আমাদের দেশে কর্মসংস্থানের সহজ উপায় হিসেবে উদ্যোক্তা তৈরির পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। এসএমই’র আওতায় উদ্যোক্তা তৈরি করতে হলে প্রথমেই আমাদের একটি মাপকাঠি নির্ধারণ করা প্রয়োজন, কারা উদ্যোক্তা হতে পারবে।
আমাদের অর্থনীতির চাকা সচল ও গতিশীল রাখতে হলে এসএমইর আওতাভুক্ত শিল্পগুলোকে আরো সহযোগিতা প্রদান করতে হবে। পাশাপাশি নতুন নতুন এসএমই শিল্প গড়ে তুলতে হবে। এ লক্ষ্যে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে। প্রথমত, চলমান শিল্পগুলোর মধ্য থেকে সফল প্রতিষ্ঠানগুলোকে চিহ্নিত করতে হবে। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলোর সফলতা মূলত ঐ উদ্যোক্তাদের যোগ্যতা দক্ষতা ও পারদর্শিতাকে নির্দেশ করে। প্রতিষ্ঠানগুলোর সফলতা অর্জনের মূল কারণ চিহ্নিত করে যদি প্রতীয়মান হয় আসলেই প্রতিষ্ঠানগুলো ভালো এবং উদ্যোক্তারা আসলেই ব্যবসা করার মতো যোগ্যতা রাখেন তাহলে ঐ প্রতিষ্ঠানগুলোতে আরো অর্থায়নের প্রস্তাব করা যেতে পারে। নতুন বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলো আরো বড় পরিসরে ব্যবসা করতে পারে। নতুন কোনো শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে। ফলে একদিকে যেমন ঐ প্রতিষ্ঠানগুলো আরো বড় হওয়ার সুযোগ পাবে। পাশাপাশি নতুন নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। সর্বোপরি উদ্যোক্তাদের যোগ্যতা ও দক্ষতার কারণে তারা ঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান অর্থাত্ ব্যাংক কিংবা এনজিও অথবা অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণের টাকা পরিশোধ করতে সক্ষম হবে। ফলে এ নিয়ে উদ্যোক্তা শ্রেণির সাথে ব্যাংকের সন্দেহ অবিশ্বাস ও আস্থাহীনতা ভাব দূরীভূত হয়ে সহযোগী মনোভাব এবং পরিবেশ সৃষ্টি হবে।
