পিয়ংইয়ংসহ বড় শহরগুলোয় পশ্চিমা সামগ্রীর স্রোত বইছে এখন। নির্মাণ করা হচ্ছে ওয়াটার পার্ক, রিসোর্ট, জাঁকজমকপূর্ণ রেস্টুরেন্ট
ও থ্রিডি সিনেমা হল
n শফিকুর রহমান রয়েল
উত্তর কোরিয়ার অবস্থাটা বেশ কয়েক বছর আগে কেমন ছিল? এর সহজ উত্তর হচ্ছে, বলপূর্বক শ্রম, মৃত্যুদণ্ড ও ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ এই তিনটি বিষয়ের জন্য ব্যাপকভাবে পরিচিত। তাই বলে তখনকার উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট কিম জং টু’র জনপ্রিয়তায় কমতি ছিল না। দেশের অধিকাংশ লোকের কাছেই তিনি ছিলেন ‘ডিয়ার লিডার’। তার ১৭ বছরের শাসনে ডেমোক্র্যাটিক পিপলস রিপাবলিক অফ কোরিয়ার (ডিপিআরকে) পরিবর্তন বলতে তেমন কিছুই ছিল না। কিম জং টু গত হওয়ার পর কেটে গেছে তিন বছর। ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত তারই পুত্র কিম জং উন। শুধু ভাবেসাবে নয়, কার্যতই মনে হচ্ছে পিতার সব বৈশিষ্ট্য তার মধ্যে নেই বা ইচ্ছে করেই ধারণ করছেন না। কিম জং উনের মেয়াদে পাল্টে যেতে শুরু করেছে উত্তর কোরিয়া।
এই চার বছরেই জীবনযাত্রার মানের অনেক উন্নতি ঘটেছে এবং লোকজন এখন বিদেশিদের সঙ্গে অনেক বেশি সাবলিল। স্পোর্ট কমপ্লেক্স ও বিনোদন সুবিধাদি চালু হয়েছে। চওড়া রাস্তা দিয়ে সাইসাই করে চলছে হলুদ-সবুজ ট্যাক্সি ও ডাবল-ডেকার বাস। রাজধানী পিয়ংইয়ংয়ের আবাসিক ভবনগুলো কয়েক বছর আগেও ছিল বিবর্ণ। কিন্তু এখন স্থানভেদে সবুজ, কমলা ও লাল রঙে রাঙানো। সুপারমার্কেটগুলোয় জিনিসপত্র বিক্রি হচ্ছে দেদারসে। বিলাসসামগ্রীও দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। উত্তর কোরিয়ায় নিযুক্ত বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লুএফপি) উপ-পরিচালক লিও ভ্যান ডের ভেলডেন অতিসম্প্রতি মন্তব্য করেছেন, ‘অন্তত পিয়ংইয়ংয়ে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। এটি সহজেই বোঝা যায়। আমি এবং আমার কোরিয়ান সতীর্থদের সঙ্গে ডিপিআরকে সরকারের সঙ্গে চমত্কার সম্পর্ক। সত্যি বলতে অনেক দেশের সরকারের চেয়ে উত্তর কোরিয়ার সরকারের সঙ্গে ডব্লিউএফপি’র সম্পর্ক ভাল’।
প্রথাগতভাবে উত্তর কোরিয়ানরা সাপ্তাহিক বন্ধের দিন রবিবারে জনসেবামূলক কর্মকাণ্ডে অংশ নেয়, যেমন রাস্তা ও ফুটপাত ঝাড়ু দেওয়া, ফুল ও ফলের গাছ লাগানো ইত্যাদি। ইদানীং এ ধরনের কাজে অংশ নেওয়া লোকের সংখ্যা কমে এসেছে। সম্মিলিতভাবে শ্রম দেওয়ার পরিবর্তে অনেকেই ছুটির দিনটিতে বিনোদন বেছে নিচ্ছে। অর্থাত্ বন্ধের দিনে কাজের বদলে আরাম-আয়েশকে এখন আর অনুত্সাহিত করা হয় না; বিষয়টি ছেড়ে দেওয়া হয়েছে মর্জির উপর।
উত্তর কোরিয়ার গড়পরতা পরিবারগুলো খাদ্য ও ভোগ্যপণ্য পাওয়ার ব্যাপারে এখন পর্যন্ত বাজারের আন্ডারগ্রাউন্ড নেটওয়ার্কের উপর নির্ভরশীল। ১৯৯০’র দশকের দুর্ভিক্ষের সময় থেকে এসব বিতরণের সরকারি ব্যবস্থা ভেঙে পড়াতেই এমন হয়েছে। অনেক উত্তর কোরিয়ানই জীবিকা নির্বাহ করে অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্যের মাধ্যমে। সম্পদ অর্জন সমাজের উঁচু স্তরে ওঠার শ্রেষ্ঠ মাধ্যম এটি। ২০০৫ সাল থেকে বাজারের বিস্তৃতি ও জনগণের সম্পদকে সীমিত রাখার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হচ্ছে। উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে গিয়ে যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছিল তার আসল উদ্দেশ্য ছিল অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্যকে নিয়ন্ত্রণে রাখা। কিন্তু পাওয়া যায়নি এর প্রত্যাশিত ফলাফল।
সিউলস্থ কুকমিন বিশ্ববিদ্যালয়ের কোরিয়ান স্টাডিজ-এর অধ্যাপক আন্দে লেনকভ জানিয়েছেন, বেসরকারি অর্থনীতির কাছ থেকে মুক্তি পেতে এবং পুরনো লেলিনীয় অর্থনৈতিক মডেলে ফিরে যেতে সরকার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু বেশ কিছু উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়াতে ২০১০ সালের পর সরকার উত্তর কোরিয়ার অর্থনীতিকে একা ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। বিস্তৃত পরিসরে বলতে গেলে উত্তর কোরিয়ায় এখন বাজার-ভিত্তিক অর্থনীতি চালু রয়েছে। কিন্তু অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্য অর্থনীতির মেরুদণ্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি মধ্যবিত্ত শ্রেণি সৃষ্টি ও এর বিস্তার ঘটাতে সাহায্য করছে। সমালোচনা রয়েছে যে, অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্য সামাজিক ব্যবধান বাড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু পাশাপাশি এটিও স্বীকার করতে হবে যে, নিশ্চিত করেছে কম ভাগ্যবানদের বেঁচে থাকাটা।
বর্তমান সরকার অনেকটাই উদার। সে সুযোগটাই কাজে লাগাচ্ছে মধ্যবিত্ত শ্রেণি। পিয়ংইয়ংসহ বড় শহরগুলোয় পশ্চিমা সামগ্রীর স্রোত বইছে এখন। নির্মাণ করা হচ্ছে ওয়াটার পার্ক, রিসোর্ট, জাঁকজমকপূর্ণ রেস্টুরেন্ট ও থ্রিডি সিনেমা হল। বিশ্লেষকরা বলছেন, মধ্যবিত্ত শ্রেণির আনুগত্য ধরে রাখতে এবং পিয়ংইয়ংকে বিদেশিদের জন্য আকর্ষণীয় বানাতেই এমনটা করা হচ্ছে। সেই সঙ্গে শহরগুলো দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে। নিউ ইয়র্ক টাইমস অনুসরণে
