কর্ণফুলী টানেল :বাংলাদেশের অর্থনীতির নতুন দিগন্ত

আপডেট : ০৮ মার্চ ২০১৯, ২১:০০

n এম. এ. মাসুম

 

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ নদী ও সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে টানেল নির্মাণ করে যোগাযোগের ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব উন্নয়ন সাধন করেছে। বিশ্বের সর্ব প্রথম ইংল্যান্ডের টেমস নদীর উত্তর ও দক্ষিণ তীরের সংযোগ ঘটিয়ে টেমস টানেল সড়ক নির্মাণকাজ শুরু হয় ১৮২৫ সালে শেষ হয় ১৮৪৩ সালে। আর বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘ ও ব্যয় বহুল টানেল সড়ক নির্মাণ করা হয় ইংলিশ চ্যানেলের নিচে। ৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ চ্যানেল টানেল ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের মধ্যে সংযোগ ঘটায় এবং দুই দেশের মধ্যে ব্যবসা বাণিজ্যের সংযোগ ঘটায়।

বাংলাদেশও কর্ণফুলী নদীর তলদেশ দিয়ে দীর্ঘ ট্যানেল নির্মিত হওয়ার বিষয়টি বহু বছর থেকেই আলোচনা হয়ে আসছিল। দীর্ঘ আলোচনা ও সমীক্ষা শেষে ২০১৫ সালের ২৪ নভেম্বর টানেল নির্মাণে চীনের সঙ্গে চুক্তি সই হয়। ২০১৭ সালের ১৪ অক্টোবর বাংলাদেশ সফর কালে চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিন পিং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে যৌথভাবে এ টানেল নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পতেঙ্গায় ’বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’ নাম ফলক উন্মোচনের মাধ্যমে টানেলের খননকাজ উদ্বোধন করা হয়। ২০২২ সালের মধ্যে এর নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার কথা। দুটি টিউব সম্বলিত মূল টানেলটির দৈর্ঘ্য ৩ দশমিক ৪ কিলোমিটার এ টানেলটি বাংলাদেশ সহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর নদীর নিচের প্রথম টানেল সড়ক হিসাবে বিবেচিত হবে। টানেলের পশ্চিম ও পূর্ব প্রান্তে ৫ দশমিক ৩৫ কিলোমিটার সংযোগ সড়ক এবং ৭২৭ মিটার ওভার ব্রিজ থাকছে। টানেল সাইটে নদীর প্রস্থ ৭০০ মিটার এবং পানির গভীরতা ৯-১১ মিটার। চার লেন বিশিষ্ট এ টানেল নির্মাণে ব্যয় হবে ৯ হাজার ৮৮০ কোটি ৪০ লাখ টাকা। যার মধ্যে বাংলাদেশ সরকারের অর্থ সহায়তা ৩ হাজার ৯৬৭ কোটি ২১ লাখ টাকা এবং চীন সরকারের অর্থ সহায়তা ৫ হাজার ৯১৩ কোটি ১৯ লাখ টাকা। অ্যাপ্রোচ রোড হবে ৪ দশমিক ৮৯ কিলোমিটার। এর সঙ্গে ৭৪০ মিটার ব্রিজ চট্টগ্রাম শহরকে কর্ণফুলী নদীর পশ্চিম পাশের সঙ্গে সংযুক্ত করবে। টানেল প্রকল্পের শহর সংলগ্ন পতেঙ্গা এলাকায় খোলা অংশের দৈর্ঘ্য ২০০ মিটার এবং খোলা ও কাভার অংশের দৈর্ঘ্য ১৯৫ মিটার। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের জিটুজি মাধ্যমে এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে; যাতে চীনের এক্সিম ব্যাংক আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে। প্রকল্পে চীনের প্রকৌশলীসহ ৫৫০ জন এবং বাংলাদেশের ১২০০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী কাজ করছেন।  চীনের চায়না কমিউনিকেশন এবং কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেড (সিসিসিসি) টানেল নির্মাণের ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান হিসাবে কাজ করছে।

প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম শহরকে বাইপাস করে সরাসরি কক্সবাজারের সঙ্গে সহজ যোগাযোগ স্থাপিত হবে। চট্টগ্রাম শহরসহ সারাদেশের সঙ্গে দক্ষিণ চট্টগ্রামের তথা কক্সবাজার, টেকনাফ পর্যন্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজতর করার ক্ষেত্রে কর্ণফুলী টানেল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। মিয়ানমার হয়ে প্রস্তাবিত এশিয়ান হাইওয়ের সঙ্গে সংযুক্তিসহ ৭টি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য টানেল নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ টানেল পরোক্ষভাবে ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার-টেকনাফ মহাসড়কের মাধ্যমে সংযুক্ত করবে সারাদেশকে। তাছাড়া, এর মাধ্যমে মিয়ানমার-চীন-হংকং-থাইল্যান্ডের সংযুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির যাত্রা শুরু হবে পূর্বমুখী। টানেল তৈরি হলে চট্টগ্রাম, মিরসরাই, কক্সবাজারে যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। এসব এলাকা ঘিরে পর্যটন, শিল্পায়ন ও বিনিয়োগে বিশাল বাণিজ্যিক সম্ভাবনা তৈরি হবে। বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়ন ও সমৃদ্ধিতে রাজধানী ঢাকার পরেই চট্টগ্রাম নগরীর অবস্থান। মূলতঃ এটি দেশের প্রধান নদী বন্দর ও বাণিজ্যনগরী। দেশের আমদানি রপ্তানির অন্ততঃ ৯০ শতাংশই সম্পন্ন হয়ে থাকে চট্টগ্রামের মাধ্যমে। দেশের বৃহত্তম অর্থনৈতিক অঞ্চলের অবস্থান মিরসরাই, সীতাকুন্ড ও সোনাগাজী নিয়ে গঠিত বৃহত্তম অর্থনৈতিক অঞ্চল ’বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগরী’।

কর্ণফুলী নদীর তলদেশ দিয়ে দেশের প্রথম টানেল হিসাবে তার নানামুখী অর্থনৈতিক এবং সামাজিক গুরুত্ব রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিমত। এটি শুধু দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগ নেটওয়ার্ক গড়ে তুলবে না। এর মাধ্যমে দক্ষিণ চট্টগ্রামের শিল্প কারখানাসহ অর্থনৈতিক বিপ্লব সাধিত হবে বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত। দেশের প্রধান পর্যটন এলাকাসমূহের মধ্যে কক্সবাজার, সেন্টমার্টিন, বান্দরবানসহ পাহাড়, সমুদ্র ও নদীর এ ত্রিমাত্রিক নয়নাভিরাম সৌন্দর্য উপভোগ করতে দেশি বিদেশি পর্যটকদের সহজতর যোগাযোগ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে টানেল মুখ্য ভূমিকা পালন করবে।