জুম ফসল তোলায় ব্যস্ত পাহাড়ি জুমিয়ারা; কিন্তু মন ভালো নেই তাদের। অতি বৃষ্টিপাত ও প্রখর রোদে জুমে পোকার আক্রমণ হওয়ায় এবার জুমের ফসল বিপর্যয় ঘটেছে। তাই আগামী দিনগুলোতে দরিদ্র জুমিয়ারা কিছুটা হলেও খাদ্য সংকটে ভুগতে পারেন বলে আশংকা অনেকের। অবশ্য কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা ফলন বিপর্যয়ের কথা সরাসরি স্বীকার না করলেও বলেছেন, বৃষ্টিতে পরাগায়ন বিঘ্নিত হওয়ায় ফলন কিছুটা কমও হতে পারে। ধানের জাত নির্বাচনের ভুলেও এমনটা হতে পারে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী চাষ পদ্ধতি ‘জুম’। এখনো পাহাড়ের জুমিয়ারা ঐতিহ্যগতভাবে জুম চাষ নির্ভর জীবনধারণ করেন। জুম চাষিরা এবারও পাহাড়ে ধান, ভুট্টা, কাকন, মারফাসহ বিচিত্র রকমের ফসল চাষ করেন। কিছু জুম ফসল সারাবছর ধরে উত্তোলন হলেও জুম ধান তোলার এখনই মৌসুম। জুমে ধান কাটা চলছে। তবে জুমিয়ারা জানিয়েছেন, এবছর অধিক বৃষ্টিপাত ও প্রখর রোদের কারণে অধিকাংশ জুমে পোকার আক্রমণ হয়েছে। ধান ও সাথি ফসলসমূহের উত্পাদন ভালো হয়নি।
জেলার দুর্গম সীমানাপাড়ার খুশি কৃষ্ণ ত্রিপুরা বলেন, ঘন ঘন বৃষ্টিতে জুম ধান ও অন্যান্য ফসলের চারা আসতে পারেনি। কৃষকরা প্রচুর কষ্ট করলেও ফল না পেয়ে মন খারাপ সবার।
সুনীতি রানী ত্রিপুরা (৬০) জানালেন, বৃষ্টির কারণে এবার জুমে কিছুই ভালো হয়নি।
জরনী রঞ্জন ত্রিপুরার মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এমন খারাপ অবস্থা আর কখনো হয়নি। জুম চাষি ঝরনা ত্রিপুরা হতাশা প্রকাশ করে বলেন, মেঘলা আকাশ আর টানা বৃষ্টির কারণে জুমের ধানে পোকা ধরেছে। ধানে চিটার পরিমাণ বেশি হয়েছে। সাক-সবজি, এমনকি কলা চাষও ভালো হয়নি।
কৃষকরা জানিয়েছেন, অব্যাহত বৃষ্টিতে সার বা কীটনাশক ধুয়ে গেছে। তাই একাধিকবার ব্যবহার করায় খরচ বেশি পড়েছে তাদের।
দীঘিনালার ১ নম্বর মেরুং ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য হতেন্দ্র লাল ত্রিপুরা জানান, আগে যেখানে এক আরি ধানে ৩৫/৪০ আরি ধান উত্পাদিত হতো, এ বছর এক আরিতে ২০/২৫ আরি ধান হয়েছে। তাই খরচ মিটিয়ে লাভের চেয়ে ক্ষতিই বেশি কৃষকদের। কারণ অর্ধেক পরিমাণ কম উত্পাদন হয়েছে ধান। (১ আরি=১০ কেজি)
ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য আরো জানিয়েছেন, এবার জুমের ফসল কম হওয়ায় জুম চাষ নির্ভর পাহাড়িরা সংকটের মুখোমুখি হতে পারে। কারণ দুস্থ মানুষগুলোর আয়-রোজগারের বিকল্প ব্যবস্থা নেই।
অবশ্য কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা জুম ফসল কম হওয়ার কারণ হিসেবে বলছেন ভিন্ন কথা। তারা জানান, হতে পারে বৃষ্টিতে পরাগায়ন বিঘ্নিত হয়েছে; কিন্তু বিপর্যয় হবার কথা নয়। প্রচলিত ব্রি-ধান ২০ এর বদলে কৃষি বিভাগের পরামর্শ মতে ধানের চাষ করার কথা বলেছেন। জুমে একসাথে বীজ বপনের পরিবর্তে পর্যায়ক্রমে করলে ফলন বিপর্যয় এড়ানো যায় বলে মনে করছেন কৃষি বিশেষজ্ঞরা।
এ ব্যাপারে খাগড়াছড়ি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক যুগল পদ দে বলেছেন, কেবল অতিবৃষ্টিতে ফলন বিপর্যয় হবার কথা নয়। এর পেছনে অন্য কারণও থাকতে পারে। তিনি জুমিয়া কৃষকদেরকে ব্রি-ধান ২০ ও বিভিন্ন জাত বাদ দিয়ে আগামীতে ব্রি-২৬, ৪২ ও ৪৩ চাষাবাদের পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেন, জুমিয়ারা যেসব জাতের ধানের চাষ করে সেগুলোতে পোকা মাকড়ের আক্রমণের আশংকা বেশিই থাকে। এছাড়া ধান ও অন্যান্য ফসল বীজ এক সাথে রোপণ না করে পর্যায়ক্রমে করার আহ্বান জানান।
এই কৃষি বিশেষজ্ঞ বলেন, পাহাড়িরা জুমকে মনে করেন একটা ‘শস্য ভাণ্ডার’ অথবা ‘মিনি মার্কেট’; যেখান থেকে সকল ধরনের শস্য আহরণ করে তারা জীবন-জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন।
কৃষি বিভাগের মতে চলতি বছর খাগড়াছড়ি জেলায় ২ হাজার ২৭০ হেক্টর জমিতে স্থানীয় আউশ বা জুম আউশ ধানের আবাদ হয়েছে।
