সাপ খেলা ছেড়ে গাড়ির স্টিয়ারিং ধরবেন ওরা

আপডেট : ১৩ অক্টোবর ২০১৫, ০০:৩১

মূলত সাপ নিয়েই কারবার তাদের। সাপ ধরে বিক্রি করা, সাপের রকমারি খেলা দেখানো, সিঙ্গা লাগানো, তাবিজ-কবজ বিক্রি তাদের প্রধান পেশা। এক সময় নিয়মিত সাপের হাটও বসাতো। কিন্তু সময় বদলেছে। মানুষও সচেতন হয়েছে। এসব করে এখন আর মানুষ ভুলানো যায় না। তাই এই পথে তাদের সংসারও আর চলে না।

 
বলা হচ্ছে ঢাকার সাভারের বেদে সমাজের কথা। এখানকার অমরপুর, পোড়াবাড়ি, কাঞ্চনপুর ও বক্তারপুর এলাকা নিয়ে ‘সাভার বেদে পল্লী’। ২০ হাজারেরও বেশি বেদের বসবাস এখানে। এক সময় নৌকায় বসবাস করলেও এখন গৃহস্থের মতো ঘর বানিয়ে বসবাস করছেন বেদেরা।
 
দীর্ঘদিন ধরেই সংগ্রামী জীবন বেদেদের। পুরনো পেশায় জীবনধারণ কঠিন হয়ে পড়ায় ‘বিকল্প’ হিসেবে সাভারের বেদেরা এক পর্যায়ে বেছে নেন মাদক ব্যবসা। টেকনাফ কিংবা উখিয়ায় সাপের খেলা দেখাতে গিয়ে ফেরার পথে সাপের ঝুঁড়িতে করে নিয়ে আসতেন ইয়াবা। সেসব বিক্রি করেই চালাতেন সংসার। সাভারে মাদক নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে বিষয়টি নজরে আসে পুলিশ সুপার হাবিবুর রহমানের। তিনি বুঝলেন বেদেদের নতুন পেশার ব্যবস্থা করতে পারলেই মাদক ব্যবসা থেকে তাদের ফেরানো সম্ভব। সেই লক্ষ্যে ১০৫ জন বেদে নারীকে সেলাই প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করলেন। তাদের সেলাই করা কাপড় কিনতে এগিয়ে এলেন তৈরি পোশাক প্রতিষ্ঠানের নাজনীন নামের একজন মালিক। এখন বেশ ভালোই আছেন সেসব নারী।
 
সেই হাবিবুর রহমানই এবার বেদে পল্লীর যুবকদের জন্য চমত্কার একটি উদ্যোগ নিয়েছেন। সাভারে বসবাসরত ৩৫ জন বেদেকে দিচ্ছেন গাড়ি চালনা প্রশিক্ষণ। যে হাতের মুঠোয় একসময় শোভা পেত বিষধর সাপ সেই হাত এবার ধরবে গাড়ির স্টিয়ারিং। গতকাল রবিবার মহাখালী ব্র্যাক সেন্টারে প্রশিক্ষণের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হয়। তিনটি ব্যাচে তারা এই প্রশিক্ষণ পাবেন।
 
সাভারের বিভিন্ন এলাকা থেকে এদের নির্বাচন করেছে ঢাকা জেলা পুলিশ। উত্তরার ব্র্যাক ড্রাইভিং স্কুলে প্রতিটি ব্যাচকে দুই মাস করে প্রশিক্ষণ দেবেন ব্র্যাকের প্রশিক্ষকরাই। প্রশিক্ষণ শেষে লাইসেন্সের ব্যবস্থাও করে দেবে ব্র্যাক। এ বাবদ প্রশিক্ষণার্থীদের কোন খরচ বহন করতে হবে না।
 
ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক ডা. মুহাম্মাদ মুসার সভাপতিত্বে এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক একেএম শহীদুল হক। বিশেষ অতিথি ছিলেন এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর মহাপরিচালক মো. নূরুন নবী তালুকদার এবং ঢাকা রেঞ্জ পুলিশের উপ-মহাপরিদর্শক এসএম মাহফুজুল হক নূরুজ্জামান।
 
অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা চলচ্চিত্র অভিনেতা ইলিয়াস কাঞ্চন, সোহাগ পরিবহনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারুক তালুকদার সোহেল, বেদে যুব সংগঠনের নেতা রমজান প্রমুখ। বেদে সম্প্রদায়কে গাড়ি চালনা পেশায় সম্পৃক্ত করার পটভূমি ও লক্ষ্য বর্ণনা করেন ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার হাবিবুর রহমান। তিনি বলেন, পৈত্রিক পেশাকে ঘৃণা করে নয়, বরং সময়ের প্রয়োজনে সমাজে সম্মানের সঙ্গে জীবিকা নির্বাহের জন্যই বেদেরা আজ বিকল্প পেশায় যেতে চাইছে। আমাদের ইচ্ছা আছে পর্যায়ক্রমে অন্যান্য এলাকার বেদে সমাজের জন্যও এরকম উন্নয়নমূলক কাজ করার।
 
আহমেদ নাজমুল হুসেইন বলেন, নদীদূষণ ও নাব্যতা কমে যাওয়ায় বেদেরা পরিবেশ বিপর্যয়ে পড়েছেন। সাপের খেলা দেখা কিংবা ঝাড়ফুঁকের চিকিত্সায় এখন মানুষের আস্থা নেই। তাই তাদের জীবন-জীবিকা আজ হুমকির মুখে। অবহেলিত ও পিছিয়ে পড়া এ জনগোষ্ঠীকে সমাজের মূলধারায় সম্পৃক্ত করার লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ।
 
প্রশিক্ষণের সুযোগ পাওয়া বেদে যুবক মোহাম্মদ তবারক, মো. সাদ্দাম হোসেন, নূরে আলম সিদ্দিকী এবং আশিকুজ্জামান বলেন, এখন আর মানুষ তাবিজ-কবজ কিনতে চায় না। আমরাও ভালো নেই। এই প্রশিক্ষণ আমাদের নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখাবে। আমরা ভালো কিছু করার ব্যাপারে আশাবাদী।