আমেরিকার পশ্চাদপসরণে মিত্ররা বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন
অ্যাডাম টেইলর
‘মুক্তবিশ্বের নেতা’ তকমাটি বলতে গেলে দখলকৃত। ঐতিহ্যগতভাবে এই তকমাটি আমেরিকার প্রেসিডেন্টকে বর্ণনা করার জন্য ব্যবহূত হয়। আজ এই ধারণাটি বেশিরভাগ পশ্চিমা উদারপন্থিকে হতাশ করে তুলেছে। বিদেশি স্বৈরাচারী ও দেশীয় জাতীয়তাবাদীদের সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মাখামাখি সম্পর্কের কারণে এই বিশেষণটি তার নামের সঙ্গে মানানসই নয়। কিন্তু তার স্থলে অন্য কাউকে প্রতিস্থাপন করার পথও সংকীর্ণ। তারা এখনো তার বিকল্প নন। এইক্ষেত্রে সম্ভাব্য প্রার্থীরা হলেন- ব্রিটেন, কানাডা, জার্মানি ও ফ্রান্সের নেতারা। কিন্তু তারা নিজস্ব স্ক্যান্ডাল ও নানা রাজনৈতিক সমস্যায় জর্জরিত। তারা ক্ষমতা থেকে অপসারিত হওয়ার পথে। কেউ শিগগিরই ক্ষমতাচ্যুত হবেন। কেউ বা আবার কিছুদিন পর হারাবেন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা।
প্রথমে কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর কথাই ধরা যাক। তিনি একজন তরুণ, সুদর্শন ও বাকপটু নেতা। একসময় তিনি ছিলেন আন্তর্জাতিক কমিউনিটির গোল্ডেন বয় বা সোনালী ছেলে। গত মাসে নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় নিকোলাস ক্রিশোফ তার সম্পর্কে লিখেন, ‘ট্রুডো মুক্তবিশ্বের একজন নৈতিক নেতা (এ মরাল লিডার অব দ্য ফ্রি ওয়ার্ল্ড)’। কিন্তু এই সপ্তাহে তার সরকারের বিরুদ্ধে এমন স্ক্যান্ডালের অভিযোগ উঠেছে, তাতে এ বছর অক্টোবরে অনুষ্ঠিতব্য ফেডারেল নির্বাচনে তার দল লিবারেল পার্টি সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারাতে পারে।
ট্রুডোর সমস্যাটি জটিল ও গুরুতর। ট্রুডোর দল কানাডার প্রথম আদিবাসী অ্যাটর্নি জেনারেল জোডি উইলসন রেইবোল্ডকে তার নিজের প্রদেশ কুইবেকে একটি প্রকৌশল সংস্থার সঙ্গে চুক্তি ছিন্ন করতে চাপ দিয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। তিনি এতে রাজী না হলে তাকে হীনপদস্থ করা হয়। এই ঘটনায় ট্রুডোর মন্ত্রিসভার দুইজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য পদত্যাগ করেছেন। ওয়াশিংটনের জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর কানাডিয়ান স্টাডিজের পরিচালক ক্রিস্টোফার স্যান্ডস কয়েকদিন আগে ওয়াশিংটন পোস্টকে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে বলেছেন, এটা ট্রুডোর জীবনের এমন এক কলংকজনক অধ্যায় যা তাকে মানুষের মাঝে আরো বিতর্কিত করে তুলবে।
কানাডীয় প্রধানমন্ত্রী পরবর্তী নির্বাচনে হেরে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছেন। অন্যদিকে জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মার্কেল পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে আর না দাঁড়ানোর অঙ্গীকার করেছেন। গত বছরের অক্টোবর মাসে তিনি ঘোষণা করেন, ২০২১ সালে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনে তিনি আর প্রার্থী হবেন না। একইসঙ্গে তার মধ্য ডানপন্থি দল ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি পদত্যাগ করবেন। এই দলই গত ১৩ বছর তাকে ইউরোপের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে এসেছে। মার্কেল বহুত্ববাদে বিশ্বাসী। তিনি জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেন। ‘আমেরিকা ফার্স্ট’এর যুগেও তিনি মুক্তবিশ্বের নেতা হিসেবে এক ধরনের ম্যান্ডেট পেয়েছেন। তিনি যখন ২০১৭ সালে হোয়াইট হাউসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাত্ করেন, তখন পলিটিকো ম্যাগাজিনের একটি নিবন্ধের শিরোনাম ছিল এমন- ‘মুক্তবিশ্বের নেতা দেখা করলেন ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে’।
ইউরোপে অ্যাঞ্জেলা মার্কেলের মিত্র হলো- ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাকরন। কিন্তু তিনিও বর্তমানে বিশাল সমস্যার মধ্যে পড়েছেন। তার বিরুদ্ধে বিরোধীরা নিষ্ঠুর বিক্ষোভ প্রদর্শন করছে। এমন একটি আন্দোলন গড়ে তোলা হয়েছে যা এলিটবাদী ও কেন্দ্রীয় সরকারপন্থিদের বিরোধী বলে বিবেচনা করা হচ্ছে। বলা হয়, ফ্রান্সের জনগণ সর্বদা তাদের রাষ্ট্রপতিদের বিরুদ্ধে ঘুরে দাঁড়ায়। ম্যাকরনের ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে। এদিকে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে’র সবচেয়ে সমস্যা হলো ব্রেক্সিট। এখনো এর কোনো সমাধান হয়নি। সম্ভবত এর আর মেরামত করা অসম্ভব। তাকে এখনো পদত্যাগে বাধ্য করা হয়নি। এটাই বা কম কিসের। ওয়াশিংটন পোস্টে উইলিয়াম বুথ ও কারলা অ্যাডাম ‘দ্য রিজন মে ওয়াজ নট ইমেডিয়েটলি স্যাকড?’ শীর্ষক এক কলামে লিখেন, ‘কেউ তার চাকরিটা চায় না’।
এই প্রেক্ষিতে মুক্তবিশ্বের নেতা হবেন এমন কাউকে খুঁজে পাওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। হয়ত এরূপ নেতারা এখন অবসর নিতে যাচ্ছেন। ‘মুক্তবিশ্ব’ কথাটি স্নায়ুযুদ্ধের সময় প্রচলিত হয়। কিন্তু বর্তমানে বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্রের সংকট দেখা দিয়েছে। ফ্রিডম হাউসসহ বিভিন্ন সংগঠনের মতে, সামপ্রতিককালে বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক অধিকার ও নাগরিক স্বাধীনতা বিপন্ন হয়েছে। রাশিয়া ও চীনের মতো স্বৈরতান্ত্রিক দেশগুলো নাগরিক স্বাধীনতায় অব্যাহতভাবে আক্রমণ চালিয়েছে এবং তাদের সীমান্ত ছেড়ে অন্যদেশগুলোতেও তার প্রভাব সমপ্রসারণে কাজ করেছে। অন্য দেশগুলোতে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধগুলো ক্ষয়িষ্ণু হয়ে উঠেছে।
ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর অধীনে উগ্র হিন্দুত্ববাদ বিকশিত হয়েছে। সমপ্রতি ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরে সন্ত্রাসী হামলার পর পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের সংঘর্ষ বেড়েছে। অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন, আসন্ন নির্বাচনের সময় উভয় দেশে জাতীয়তাবাদী রাজনীতিই প্রধান নিয়ামক হবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক তানভীর আলম নিউ ইয়র্কারকে বলেন,‘ অর্থনীতি বা উন্নয়নের ক্ষেত্রে কোনো কিছু প্রদর্শনের ক্ষেত্রে মোদির একমাত্র অবশিষ্ট প্ল্যাটফর্ম জাতীয়তাবাদ’।
ব্রাজিল বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম গণতন্ত্রের দেশ। সেখানকার ডানপন্থি প্রেসিডেন্ট জেইর বলসনরো সমপ্রতি দেশটির সামরিক স্বৈরতন্ত্রের যে ইতিহাস আছে তার প্রশংসা করেছেন।
তারপরও আমরা এখনো আশাবাদী। সুইডেন ও আয়ারল্যান্ডের মতো ছোট ইউরোপীয় দেশগুলো বহু-পক্ষীয়তার পক্ষে ভূমিকা পালনকে সমর্থন করে চলেছে। আবার দক্ষিণ কোরিয়া ও মালয়েশিয়ায় উদার আন্দোলনের মুখে অজনপ্রিয় ও দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারের পতন হয়েছে। ‘মুক্তবিশ্ব’ নেতাহীন হতে পারে, কিন্তু কিছু সদস্য নিজেদের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য সক্ষম বলেই মনে হয়।
দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট থেকে অনুবাদ : ফাইজুল ইসলাম
n লেখক : দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের কলামিস্ট। তিনি ম্যানচেস্টার ও কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেছেন
