আশরাফুল আলম
এক সময় ঢাকা শহর মসজিদের শহর হিসেবে সুপরিচিত ছিল সবার নিকট। কিন্তু সে পরিচয় যানজট নামক এক অসহনীয় যন্ত্রণার কালো মেঘে ঢাকা পড়ে গেছে। এখন এ শহরকে যানজটের শহর হিসেবেই চেনে এবং মানে সকলে। যার স্বীকৃতি মিলল বহুজাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান নামবিও’র প্রকাশিত ‘ওয়ার্ল্ড ট্রাফিক ইনডেক্স-২০১৯’ এ প্রকাশিত তথ্যে। গত ১৬ ফেব্রুয়ারি শনিবার নামবিও’র ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায় সর্বোচ্চ স্কোর (২৯৭ দশমিক ৭৬) পেয়ে যানজটের শহর হিসেবে বিশ্বের শীর্ষে অবস্থান করে নিয়েছে ঢাকা। শুধু তাই নয়, সময় অপচয় ও ট্রাফিক অদক্ষতা সূচকেও শীর্ষে রয়েছে ঢাকা। এর আগে ২০১৮ সালে ও ২০১৭ সালে যানজটের দিক থেকে ঢাকার অবস্থান ছিল দ্বিতীয়।
বর্তমানে ঢাকা শহরে যানজটের যে চিত্র প্রতিনিয়ত দেখতে পাওয়া যায় তা যেমন একদিনে তৈরি হয়নি তেমনই যানজট নিয়ে লেখালেখি, আলোচনা-সমালোচনাও কম হয়নি। পাশাপাশি যানজট নিরসনে সরকারের নানামুখী পদক্ষেপও আমাদের চোখে পড়ছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, অভাগা শহরবাসীর এই যানজটের কবল থেকে মুক্তি মেলা তো দূরে থাক, দিনে দিনে তা আরও ভয়াবহ রূপে সবাইকে গ্রাস করছে। ঢাকায় এখন কোনো যন্ত্রচালিত গাড়ি ঘণ্টায় ৭ কিলোমিটারের বেশি গতিতে চলতে পারে না। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে ২০২৫ সাল নাগাদ এই গতি ঘণ্টায় ৪ কিলোমিটারে নেমে আসবে, যা পায়ে হেঁটে চলার সমান। কেননা মানুষ কমবেশি এই গতিতে চলে। যানজটের ফলে একদিকে যেমন মূল্যবান সময়ের অপচয়সহ মানসিক ও স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে অন্যদিকে অর্থনীতিরও বিরাট ক্ষতি সাধন করছে। বিশ্বব্যাংকের এক গবেষণা প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ঢাকায় শুধু যানজটের কারণে প্রতিবছর ক্ষতি হয় অন্তত ৩০ হাজার কোটি টাকা।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, একটি পরিকল্পিত শহরে মানুষের চলাচলের জন্য অন্তত ২৫ ভাগ রাস্তা থাকা প্রয়োজন। অথচ ঢাকা শহরে বসবাসকারী প্রায় ২ কোটি মানুষের জন্য রাস্তা আছে মাত্র ৭ ভাগ। আবার এসব রাস্তাও নির্বিঘ্নে চলাচলের উপযোগী নয়। কোথাও কোথাও শুধু ফুটপাত নয় রাস্তারও একাংশ দখল করে রাখা হয়েছে। উপরন্তু অবৈধ পার্কিং তো আছেই। এ শহরে অনেক বড় বড় মার্কেট রয়েছে যেখানে গাড়ি পার্কিংয়ের কোনো সুব্যবস্থা নেই। ঢাকার অন্যতম একটি প্রধান ও পুরাতন মার্কেট হলো গভঃ নিউ মার্কেট, যেখানে প্রতিদিন অসংখ্য ক্রেতা ভিড় করেন, যাদের একটি বড় অংশ আসেন তাদের ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে। অথচ মার্কেটে গাড়ি পার্কিং-এর কোনো ব্যবস্থা নেই। ফলে তারা গাড়ি পার্কিং করে থাকেন মার্কেটের আশপাশের রাস্তায়। ফলশ্রুতিতে এসব রাস্তা প্রায়শই বন্ধ হয়ে পড়ে এবং সৃষ্ট যানজটের ঢেউ পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। আমরা যারা এই এলাকায় বসবাস করছি তাদের নিকট মার্কেটটি এখন বিষফোঁড়া হয়ে দেখা দিয়েছে।
রাস্তার পরিমাণ না বাড়লেও প্রতিদিন এই শহরের পেটে যেমন অসংখ্য মানুষ ঢুকছে, সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে তাদের চলাচলের জন্য যানবাহনের সংখ্যা। আর রাস্তা অনুপাতে যানবাহনের পরিমাণ বাড়লে যানজট বাড়বে—এটা খুবই সহজ হিসাব। বিআরটিএ’র তথ্যমতে, গত বছরের আগস্ট মাস পর্যন্ত ঢাকায় নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা ১১ লাখ ৭৩ হাজার ১৬০টি। এর মধ্যে ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা ২ লাখ ৫২ হাজার ৬৭৪টি। প্রতি মাসে প্রায় দেড় হাজার ব্যক্তিগত নতুন গাড়ি নিবন্ধিত হচ্ছে। প্রায় ৩৩ শতাংশ সড়ক দখল করে থাকে এসব ব্যক্তিগত গাড়ি যেগুলোতে গড়ে দেড়জন করে মানুষ যাতায়াত করে। যেভাবে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল একটি দেশে ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে তাতে ‘গরিবের ঘোড়া রোগ’ জাতিকে পেয়ে বসল কিনা-সন্দেহ। কাজেই যেহেতু রাস্তা বাড়ানোর কোনো সুযোগ নেই সেহেতু দ্বিতীয় পন্থা হিসেবে যানবাহন, বিশেষ করে ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ন্ত্রণের কোনো বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে অন্যান্য কিছু কঠোর পদক্ষেপের পাশাপাশি গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটালে, কোম্পানি ও এলাকাভিত্তিক করতে পারলে ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা কমতে পারে। জানা যায়, ২০১৯ সাল থেকে বিশ্বের ১৩টি শহরে পর্যায়ক্রমে বন্ধ করে দেওয়া হবে ব্যক্তিগত গাড়ি। এর মধ্যে রয়েছে জার্মানির বার্লিন ও হামবুর্গ, স্পেনের মাদ্রিদ, নরওয়ের অসলো, ডেনমার্কের কোপেনহেগেন ও বেলজিয়ামের ব্রাসেলসসহ বেশকিছু আধুনিক শহর। এসব শহরে বাইসাইকেল ও হেঁটে চলাচলকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে ঢাকা শহরে ঠিক এর বিপরীত চিত্র আমরা দেখতে পাই। এশহরে প্রায় ১০ লাখেরও অধিক বৈধ-অবৈধ রিক্সা চলাচল করে যা যানজটের আর একটি বড় কারণ। আর এই রিক্সার সহজলভ্যতা আমাদের হাঁটার অভ্যাস তৈরি না হওয়ার পিছনে কিছুটা হলেও দায়ী। অথচ এই শহরকে রিক্সামুক্ত বা সীমিত করার কোনো উদ্যোগ কার্যত নেই বললেই চলে। এক্ষেত্রে স্কুটি, বাইসাইকেল ও মোটরসাইকেলের মতো বাহনগুলোকে সহজলভ্য এবং এর জন্য আলাদা লেন করে রিক্সার বিকল্প হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে। আমার ধারণা, এ্যাপসভিত্তিক মোটরবাইক সঠিকভাবে পরিচালনা করা গেলে তা এক সময় রিক্সার স্থান দখল করতে পারবে।
n লেখক :সহকারী অধ্যাপক, সমাজকল্যাণ ও
গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
