আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, কিছু পেতে হলে ত্যাগ করতে হয়। আত্মত্যাগ ছাড়া কোনো কিছু অর্জন সম্ভব নয়। ১৯৪৮ সাল থেকে যে আন্দোলন শুরু হয়েছে, সেই আন্দোলনের শেষ পরিণতি হিসেবে পেয়েছি একটি স্বাধীন দেশ। এর পেছনে রয়েছে লাখ লাখ মানুষের আত্মত্যাগ। গতকাল শুক্রবার বিকাল ৪টায় রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে এক সেমিনারে সভাপতির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্ট কর্তৃক বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চ-এর ভাষণের ওপর এই সেমিনারের আয়োজন করা হয়।
রাজনীতিকদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ব্যক্তিজীবনে আমি কী পেলাম আর কী পেলাম না এ হিসাব করলে চলবে না। রাজনীতিতে এসেছি দেশের মানুষের সেবা করতে। মানুষের জন্য কতটুকু করতে পারলাম সেটাই বড় কথা। যা বঙ্গবন্ধু আমাদের শিখিয়ে গিয়েছেন।’ তিনি বলেন, ‘পচাত্তরের পরে এ দেশের রাজনীতি ইতিহাস ব্যর্থতায় পর্যবেশিত হতে ছিল। যুব সমাজ এক সময় অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল। তারা প্রকৃত ইতিহাস নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিল। স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে একজন খল নায়ককে দাঁড় করানো হয়েছিল। তিনি নাকি কোন ড্রামের ওপর উঠে ঘোষণা দিয়েছিলেন। এভাবে ইতিহাসকে বিকৃত করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘৭৫ পরবর্তী খলনায়ক হলেন জিয়াউর রহমান।’
ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ আলোচনা করে আগে নির্ধারিত হয়েছে বলে যারা দাবি করছেন তাদের কড়া সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এগুলো ডাহা মিথ্যা কথা। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আজকে এই ভাষণটার অনেকে অনেক ব্যাখ্যা দেন। তখনকার ছাত্র নেতারা এখন যারা জীবিত আছেন- আজকেও একজনের ইন্টারভিউ দেখতেছিলাম- সেখানে কেউ কেউ নানাভাবে ব্যাখ্যা দিয়ে দিচ্ছে। আসলে এ ব্যাখ্যাগুলো শুনলে হাসিই পায়। এরা আসলে কত অর্বাচীনের মতো কথা বলে যে তিনি (বঙ্গবন্ধু) নাকি আগের দিন নিউক্লিয়াসের সঙ্গে আলোচনা করলেন। তো ভাষণে এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম- এখানে মুক্তির সংগ্রাম আগে বলবেন নাকি স্বাধীনতার সংগ্রাম আগে বলবেন সেটাও নাকি নিউক্লিয়াস আলোচনা করেছিল। এগুলো সম্পূর্ণ ডাহা মিথ্যা কথা। সম্পূর্ণ ডাহা মিথ্যা কথা, এর (এসব কথার) কোনো যৌক্তিকতাই নাই।’
কারো নাম উল্লেখ না করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘যিনি বলেছেন উনি এটা বলতে পারেন, কারণ ওনার আবার একটা নিক নেইম ছিল- আমরা যখন ছাত্র রাজনীতি করতাম, তখন আমাদের নেতাদের একেকজনকে একেকটা টাইটেল দিতাম। এটা আমাদের একটা অভ্যাস ছিল। তার একটা টাইটেলও ছিল। এখন বলে ফেললে সবাই বুঝে যাবে- আপনারা টেলিভিশনে দেখে নিয়েন, সেটাই ভালো। আমি নাম বলতে চাই না। কিন্তু এই একেকজন একেক ব্যাখ্যা দিচ্ছে আসলে তো তা নয়।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘হ্যাঁ, ভাষণের আগে অনেকে দিনরাত পরিশ্রম করেছেন, অনেক পয়েন্ট তৈরি করেছেন, অনেকে বলেছে এটা বলতে হবে, ওটা বলতে হবে। এই ভাবে বলতে হবে, এই করতে হবে, ওই করতে হবে। এটা না করলে হতাশায় (জনগণ) ফিরে যাবে। নানা ধরনের কথায় কথায় সে সময় আমরা জর্জরিত ছিলাম, কাগজে কাগজে, অনেক কাগজ আমাদের বাসায় জমা হয়েছিল। শেষ কথা বলেছিলেন আমার মা, যেটা আমি সব সময় বলি।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমার মা একটা কথাই বলেছিলেন, সারাটা জীবন তুমি সংগ্রাম করেছিলে, তুমি জান বাংলাদেশের মানুষ কি চায়? এবং তার জন্য কি করতে হবে। তোমার থেকে ভালো কেউ জানে না। কাজেই মনে যে কথাটা আসবে তুমি শুধু সেই কথাটাই বলবে। আর কোনো কথা না।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এই ভাষণ, এই ভাষণটা অনেক দীর্ঘ, এখানে কোনো পয়েন্ট নাই, কাগজও নাই কিছুই ছিল না। কারণ তিনি তো সংগ্রাম করে গেছেন সেই ৪৮ সাল থেকে। তখন থেকে বাঙালি জাতির মুক্তির জন্য তিনি সংগ্রাম করে গেছেন। স্বাভাবিক ভাবে তিনি তো জানেন বাঙালির জাতির মুক্তির পথটা কোথায়? কিভাবে আসবে। তিনি যে নির্দেশনা দিয়েছিলেন সেটা বাঙালি জাতি অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছে।’
অনুষ্ঠানের শুরুতে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের ভিডিও চিত্র প্রদর্শন করা হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মনোযোগ দিয়ে সেই ভাষণ প্রত্যক্ষ করেন। সেমিনারে স্বাগত বক্তব্য রাখেন বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল ট্রাস্টের সদস্য সচিব শেখ হাফিজুর রহমান। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান প্রফেসর আবদুল মান্নান। মূল প্রবন্ধের ওপর আলোচনা করেন বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরের সভাপতি শিল্পী হাসিম খান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক ড. নিলয় রঞ্জন বিশ্বাস, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. ফারজানা ইসলাম। অনুষ্ঠানে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন বঙ্গবন্ধু জাদুঘরের প্রধান নির্বাহী মাসুদা হোসেন।
