তিনি জানেন না তার আদরের ছোট বোনটি বেঁচে আছে কিনা। হন্যে হয়ে খুঁজছেন এক মর্গ থেকে আরেক মর্গে। আর নিরন্তর কায়মনো প্রার্থনা করছেন, ‘ও আল্লাহ, ফিরিয়ে দাও।’ যার কাছেই যাচ্ছেন কেউ চোখ তুলেও তাকাচ্ছে না। সবাই যেন বিরক্ত, বিরস বদন, বেখবর। কেউ তথ্য দিতে পারছেন না। বিফল মনোরথে তবুও ঘুরছেন। এভাবেই পেরিয়ে গেছে ২৫ দিন। সৌদি আরবের মিনা’য় তার সামনেই এক পলকের আড়ালে হারিয়ে গেছে মা আর তিন বোন। মা আর দুই বোনের মরদেহের খোঁজ মিললেও দেখার সুযোগ দেয়া হয়নি। মর্গ থেকে তাকে জানানো হয়, তাদের দাফন-কাফন শেষ। হূদয়বিদারক যাতনা নিয়ে এভাবেই তিতাস গ্যাসের উপব্যবস্থাপক প্রকৌশলী সাজ্জাদ খালেক মুরাদের দিন কাটছে পবিত্র মক্কায়। ছোট বোন ঢাকার মানারাত ইন্টারন্যাশনাল কলেজের প্রভাষক তামান্না বিনতে খালেকের খোঁজ না পাওয়া পর্যন্ত দেশে ফেরার ইচ্ছা নেই তার।
নিখোঁজ ভাগ্নির খোঁজে ঢাকা থেকে মক্কা গেছেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের যুগ্মসচিব শাহাদাত হোসেন মজুমদার গেছেন। মামা-ভাগ্নে মিলেই খুঁজছেন তামান্নাকে।
মিনায় সংঘটিত মর্মন্তুদ দুর্ঘটনার চারদিন পর একটি হাসপাতালের মর্গে খোঁজ মেলে মুরাদের মা শামসুন্নাহার মজুমদারের (৬৯)। তবে সৌদি কর্তৃপক্ষ মুরাদকে তার মায়ের লাশ দেখতে দেয়নি। পরের দিন মর্গে গেলে জানানো হয়, দাফন হয়ে গেছে। একইভাবে মুরাদের বোন মালিবাগের সিটি ডেন্টাল কলেজের সহকারি অধ্যাপিকা ডা. বেহতারিন ইশরাত মুন্নি (৪২) ও ঢাকার মানারাত ইন্টারন্যাশনাল কলেজের সহকারি অধ্যাপিকা সাহিদা কাউসারের (৪৭) মরদেহ দেখতে দেয়নি সৌদি কর্তৃপক্ষ।
এই পরিস্থিতি যে কেবল একজন সাজ্জাদ খালেক মুরাদের পরিবারের ক্ষেত্রেই ঘটেছে তা নয়। এ পর্যন্ত মিনা দুর্ঘটনায় নিহত ১৩৭ জন বাংলাদেশি হাজীর লাশ শনাক্ত করতে তাদের স্বজনদের সুযোগ দেয়া হয়নি। মুরাদের পরিবার অভিযোগ করেছেন,তাদের প্রতি চরম উদাসিনতা দেখানো হয়েছে, পদে পদে বিভ্রান্ত করা হয়েছে, এখনো করা হচ্ছে। নিখোঁজ হাজিদের সন্ধানে বাংলাদেশ থেকে মক্কায় যাওয়া স্বজনরা অভিযোগ করেছেন, তাদেরকে কেউ সহযোগিতা করছে না। না সেখানকার বাংলাদেশ দূতাবাস, না সৌদি কর্তৃপক্ষ। বরং তাদেরকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। মক্কার মুয়াইসিম মর্গ ও এই মর্গের তথ্য কেন্দ্র একেক সময় একেক তথ্য দিচ্ছে। এড়িয়ে যাচ্ছে।
ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী এখন পর্যন্ত ৮০ জন বাংলাদেশি হাজী নিখোঁজ রয়েছেন। তবে এই মৃত্যু এবং নিখোঁজ নিয়ে সঠিক পরিসংখ্যান দিতে পারছে না সৌদি আরবে নিযুক্ত বাংলাদেশ হাই কমিশন ও হজ্ব মিশন, সৌদি কর্তৃপক্ষ বা এজেন্সির প্রতিনিধিরা।
ধর্ম মন্ত্রণালয়ের হজ বিষয়ক ওয়েবসাইটে গতকাল মঙ্গলবার দেয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী মিনায় পদদলনের ঘটনায় বাংলাদেশি হিসেবে শনাক্তকৃত মৃত হাজীর সংখ্যা ১৩৭। এরমধ্যে পরিচয় পাওয়া গেছে ৯৬ জনের। যাদের পরিচয় নিশ্চিত করা যায়নি তাদের কাউকে কাউকে বেওয়ারিশ হিসাবে দাফন করা হচ্ছে। এ ছাড়া ক্রেন দুর্ঘটনায় নিহত ১ জন (পুরুষ); আহত ৪০ জন (বর্তমানে চিকিত্সাধীন ১ জন)। সৌদি আরবে মোট ইন্তেকাল করেছেন ২৬৭ জন হজযাত্রী/ হাজী (মিনা দূর্ঘটনাসহ)। এর মধ্যে মক্কায় ২৫৩ জন, মদিনায় ১০ জন ও জেদ্দায় ৪ জন।
সর্বশেষ গত ১৯ অক্টোবর ফরিদপুর জেলার আব্দুস সালাম শেখ (৬০) পবিত্র মক্কা-আল-মোকাররমায় ইন্তেকাল করেছেন। তাঁর পাসপোর্ট নম্বর ওসি ০৯০৩৮৬৬।
এদিকে সৌদি সরকার প্রকাশিত তালিকায় বহু নিহত ও নিখোঁজ হাজির তথ্য না থাকায় হতাশা দেখা দিয়েছে স্বজনদের মধ্যে। এই প্রসঙ্গে হজ মিশন ও কনস্যুলেটের কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, তারা হাসপাতাল ও মর্গ পরিদর্শন করে নিখোঁজ হাজীদের সন্ধান অব্যাহত রেখেছেন। গতকাল হজ প্রশাসনিক দলের উপদলনেতা এবং ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব হাসান জাহাঙ্গীর আলমের নেতৃত্বে কনসাল (হজ) জহিরুল ইসলাম এবং হজ আইটি দলের কর্মকর্তাগণ নিখোঁজ হাজীদের নিয়মিত তথ্য সংগ্রহের অংশ হিসেবে মুয়াইসিম মর্গ ও উক্ত মর্গের তথ্য কেন্দ্র পরিদর্শন এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাগণের সাথে করেছেন।
মক্কার বাংলাদেশি হোটেল ব্যবসায়ীদের নেতা ফেরদৌস চৌধুরী মিঠু ইত্তেফাককে জানান, বাংলাদেশের নিখোঁজ হাজীদের আত্মীয় স্বজনরা মক্কায় আসছেন অনেকে। তারা মক্কা, জেদ্দা ও তায়েফের হাসপাতালগুলোর মর্গে খোঁজ নিচ্ছেন। তবে বহু লাশ বেওয়ারিশ হিসাবে দাফন করা হচ্ছে, ফলে স্বজনরা খুঁজে পাচ্ছে না।
এদিকে ইরানের বার্তা সংস্থা ইরনা জানায়, মিনায় পদদলিত হয়ে নিহত ইরানি হাজিদের লাশ দ্রুত দেশে ফেরত না দিলে কড়া প্রতিক্রিয়ার সম্মুখীন হতে হবে বলে হুমকি দেয়ার পর মরদেহ বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে সনাক্ত করে সৌদি কর্তৃপক্ষ। ফলে সৌদি আরবের একটি বিমানে করে কয়েক দফায় ইরানের অন্তত ৪৬৪ জন হাজির মরদেহ পাঠানো হচ্ছে তেহরানে। ইতিমধ্যে প্রথম দফায় ১০৪ জন, দ্বিতীয় দফায় ১১৪ জন হাজির লাশ তেহরান পৌঁছেছে। শুধু ইরান নয়, আরো কয়েকটি দেশ তাদের হাজিদের মরদেহ দেশে ফেরত নিয়েছে।
সৌদি সরকার যা বলেছে মিনায় নিহত তার তিন গুণ!
গতকাল বার্তা সংস্থা এপি জানিয়েছে, সৌদি আরবে চলতি মৌসুমে হজ আদায়কালে মিনায় পদদলিত হয়ে ২১৭৭ জন প্রাণ হারিয়েছেন। তবে এ নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো মন্তব্য করেনি সৌদি সরকার। গত ২৪ সেপ্টেম্বর মিনায় শয়তানকে পাথর ছোড়ার সময় ওই দুর্ঘটনায় ৭৬৯ জন হাজযাত্রী নিহত হওয়ার কথা জানিয়েছিল সৌদি সরকার। কিন্তু এরপর তারা ওই সংখ্যার আর কোনো রদবদল করেনি। তবে বিভিন্ন দেশের মৃত হাজিদের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষিতে নিহতদের এই নতুন সংখ্যা ঘোষণা করেছে এপি।
ওই দুর্ঘটনায় ভারতের ৪৬৫, মালির ২৫৪, নাইজেরিয়ার ১৯৯, মিশরের ১৮২, বাংলাদেশের ১৩৭, ইন্দোনেশিয়ার ১২৬, পাকিস্তানের ১০২, ক্যামেরুনের ৭৬, নাইজেরিয়ার ৭২, সেনেগালের ৬১, বেনিন ও আইভরি কোস্টের ৬২ জন করে, ইথিওপিয়ার ৪৭, চাদের ৪৩, মরক্কোর ৩৬, আলজেরিয়ার ৩৩, সুদানের ৩০, বুরকিনা ফাসোর ২২, তাঞ্জানিয়ার ২০ ও সোমালিয়ার দশ জন মারা হাজি মারা গেছেন।
এছাড়া কেনিয়ার ৮, ঘানা ও তুরস্কের ৭ জন করে, মিয়ানমার ও লিবিয়ার ৬ জন করে, চীনের ৪, আফগানিস্তানের ২ এবং জর্ডান ও মালয়েশিয়ার একজন করে হাজি মারা গেছেন।
এপির প্রতিবেদনে বলা হয়, মিনা দুর্ঘটনার পর থেকে মৃতের সংখ্যা বেড়েই চলছে। বিভিন্ন দেশের পক্ষ থেকে মৃতদেহ শনাক্তের পক্রিয়া চলছে। এখনো কয়েকশ হাজি নিখোঁজ রয়েছেন।
ক্ষতিগ্রস্ত দেশের ফিরে আসা হাজিদের দেওয়া তথ্যঅনুযায়ী, মিনার দুর্ঘটনার আগে মক্কায় ক্রেন দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যাও সৌদি সরকারের প্রকাশিত সংখ্যার চেয়ে তিন গুণ বেশি। সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, দেশটির ক্রাউন প্রিন্স ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন নাইফ বিন আবদুল আজিজ বৈঠক করেন। তবে মিনায় পদদলিত হয়ে মৃতের সংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সৌদি বাদশাহ সালমান এবার হজের সময় ক্রেন দুর্ঘটনা ও পরে পদদলিত হয়ে মৃত্যুর ঘটনা তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। চলতি বছর ক্ষমতায় আসার পর এটিই সালমানের আমলের প্রথম হজ।
হজের সময় মক্কায় ক্রেন দুর্ঘটনা ও পদদলিত হয়ে মৃত্যুর জন্য বরাবরই সৌদি রাজবংশের অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করে আসছে ইরান। একই সঙ্গে তারা এসব দুর্ঘটনায় প্রকৃত মৃতের সংখ্যা লুকোনো হয়েছে দাবি করে সৌদি সরকারের নিন্দা জানিয়েছে।
ইরানের দাবি অনুযায়ী মৃতের সংখ্যা চার হাজার ৭০০ জন। তবে এই দাবির পক্ষে তারা যথেষ্ট প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেনি। আর, সৌদি আরবের ঘটনায় বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও পশ্চিমা সরকারগুলোর নিশ্চুপ দাবি করে এর নিন্দা জানিয়েছে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি।