নিয়োগ বাণিজ্য, স্বজনপ্রীতি ও বরাদ্দের অতিরিক্ত অর্থ তুলে নেয়াসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে রাজধানীর শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শেকৃবি) উপাচার্য অধ্যাপক মো. শাদাত উল্লার বিরুদ্ধে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) তদন্ত কমিটি এসব অভিযোগের সত্যতাও পেয়েছে। এর প্রেক্ষিতে উপাচার্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করে তদন্ত কমিটি। তদন্ত রিপোর্ট জমা রয়েছে মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট শাখায়।
ইউজিসি জানিয়েছে, উপাচার্যের বিভিন্ন খামখেয়ালিপনা সিদ্ধান্তের কারণে ভিসি ও প্রো-ভিসির নেতৃত্বে শিক্ষকরা দুভাগে বিভক্ত। ফলে শিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম বিঘ্নিত হচ্ছে।
ভিসির বিরুদ্ধে অনিয়ম প্রমাণের পর ভিসিকে সতর্ক করা বা অন্য যে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ, নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থগিত রাখা, প্রাপ্যতার বাইরে যে অর্থ উত্তোলন করেছে তা বিশ্ববিদ্যালয়ের তহবিলে জমাদানের জন্য মন্ত্রণালয়ের পদক্ষেপ গ্রহণের কথা বলা হয়েছে তদন্ত রিপোর্টে।
আগামী মাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হবে। এই সমাবর্তনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরু থেকে বর্তমান পর্যন্ত ডিগ্রি গ্রহণকারীদের অংশ নেয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু শিক্ষার্থীদের একটি অংশ এই সমাবর্তনে অংশ নেয়া থেকে বিরত থাকবে। শিক্ষার্থীরা বলছেন, বর্তমান ভিসির নেতৃত্বে হওয়া সমাবর্তনে অংশ নেয়া থেকে তারা বিরত থাকবেন। এ নিয়ে একাধিক সভাও করেছেন শিক্ষার্থীরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষক বলেছেন, ভিসির বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেয়া হলে আন্দোলনে নামবেন তারা। তারা বলেন, অতীতে বিশ্ববিদ্যালয়ে এভাবে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এ কারণে একের পর এক অনিয়ম ও দুর্নীতি অব্যাহত রয়েছে। অতীতের সকল অনিয়ম এবং দুর্নীতিরও বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা চান শিক্ষকরা। তবে বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে দেয়া বক্তব্যে ভিসি তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
শিক্ষা মন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ ইত্তেফাককে বলেন, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে নানা অনিয়ম হয়েছে এমন খবর আমিও জেনেছি। এ বিষয়ে ইউজিসি প্রতিবেদন দিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে কাজ চলছে। বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।
যেসব অনিয়ম পেয়েছে কমিটি : পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় নিয়োগ নীতিমালা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় যোগ্যতা-অভিজ্ঞতা এবং বয়স না থাকলেও ভিসির নিজ আত্মীয়-স্বজনকে (শ্যালক, শ্যালকের স্ত্রী, ভাতিজি, ঘনিষ্ঠজন) নিয়োগ দেয়া হয়েছে। অনুমোদন নেই এমন ৪৫টি পদে শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দেয়া হয়েছে। ফল প্রকাশের আগেই আবেদন গ্রহণ করে ইন্টারভিউ কার্ড দেয়া হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০টি শিক্ষক পদ অনুমোদিত অথচ নিয়োগ দেয়া হয়েছে ২৯ জন, ৪ কর্মকর্তার পদ থাকলেও ২৪ জন সেকশন অফিসার এবং ১৬ জন কর্মচারীর পদ থাকলেও নিয়োগ দেয়া হয়েছে ২২ জন। এভাবে ৪৫টি পদের অনুমোদন না থাকলেও এসব পদে নিয়োগ দেয়া হয়েছে।
প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা না থাকলেও ভিসির শ্যালক চৌধুরী এম সাইফুল ইসলামকে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক পদে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সেকশন অফিসার হিসাবে চাকরির সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৩০ হলেও এ নিয়ম মানা হয়নি। নিয়ম না মেনে ৪০ বছরের বেশি বয়স হলেও শ্যালকের স্ত্রীকে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী পরিচালক পদে নিয়োগ দেয়া হয়। ৩০ বছরের বেশি বয়স হলেও ভিসির ভাতিজি শরাবান তহুরাকেও নিয়োগ দেয়া হয়েছে।
এগ্রিবিজনেস অ্যান্ড মার্কেটিং বিভাগের প্রভাষক পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর বেশ কয়েকজন স্নাতক ও মাস্টার্সে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হওয়া সত্ত্বেও এদের মধ্য থেকে কাউকে নিয়োগ না দিয়ে ভিসির ঘনিষ্ঠজন বলে পরিচিত ফজলুল হককে এ পদে নিয়োগ দেয়া হয়। এগ্রিবিজনেস অ্যান্ড মার্কেটিং বিভাগে যখন প্রভাষক পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয় তখন ফজলুল হক মাত্র স্নাতক (সম্মান) শেষ করেছেন।
তদন্ত কমিটি জানিয়েছে, ভিসি ঈদুল ফিতর, পহেলা বৈশাখ, ঈদুল আজহার সময় লাখ লাখ টাকা উত্তোলন করেছেন। একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির এভাবে আপ্যায়নের নামে সরকারি অর্থ উত্তোলনের সুযোগ নেই। ভিসির একটি গাড়ি ব্যবহারের সুযোগ থাকলেও অতিরিক্ত দুটি গাড়ি আত্মীয়-স্বজন ব্যবহার করেন।
