‘অপার বিস্ময়ে লজ্জাবতী পাতার বন্ধ হয়ে যাওয়ার রহস্য বের করার চেষ্টা ছিল এক সময়। ছোট ছোট আঙ্গুল দিয়ে বার বার ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখতাম কত না লতা-পাতা গাছের শরীর। পাহাড়ে যেতাম। একটা ঝরনার শ্রোতের বাঁকে ছিল বিশাল এক কড়াই গাছ। কিছুটা পানির দিকে ঝুঁকে; আবার কিছুটা আকাশ পানে তার ডালপালা ছড়িয়ে। যেন মেঘ ছোঁয়ার আপ্রাণ চেষ্টা গাছটির। গায়ে তার অসংখ্য অর্কিড আর পরজীবী লতার বাস। নানা জাতের পাখির গানে গানে আর তাদের উড়া-উড়িতে চারদিক প্রাণবন্ত হয়ে উঠতো। এখন আর সেই অতি প্রাচীন গাছটি নেই। জায়গাটাও ‘মহামায়া প্রকল্পে’র পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এমনি করে কত দেখা প্রিয় সব গাছ হারিয়ে গেছে; বদলে গেছে কত মানচিত্র! প্রতিদিনই সবকিছু বদলায়— কিন্তু তখন যদি ওই কড়ই গাছের গা থেকে পরজীবী গাছগুলোর একটি তুলে বনসাই করতাম, তাহলে সেই স্মৃতিতে বারবার ফিরে যেতে পারতাম...! অতীত স্মৃতি রোমন্থন করে কথাগুলো বলছিলেন বনসাই শিল্পী মো. আনিসুল হক।
আমাদের মনের ভেতর প্রিয় সব গাছের জন্য যে হাহাকার তার রূপ বদলায় না। ঢাকা শহরে বাস করলেও মন বার বার পুরনো সব স্মৃতিতে ফিরে যেতে চায়। সেই স্মৃতির পথ ধরে আর গাছের প্রতি মমতার মন নিয়েই আমরা বনসাই শিল্পীরা নিজেদের জগত্ তৈরি করেছি। দেশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বনসাই সোসাইটির। সেই সংগঠনটির ‘১৭তম বার্ষিক বনসাই প্রদশর্নী উদ্বোধন হয়েছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার গ্রীন ডেলটা লাইফ ইনস্যুরেন্সের সহযোগিতায় বাংলাদেশ বনসাই সোসাইটি চারদিনব্যাপী এই প্রদর্শনীর আয়োজন করে ধানমন্ডির ডাব্লিউ ভি এ মিলনায়তনে। উদ্বোধন করেন শিল্পী মোস্তফা মনোয়ার। সম্মানিত অতিথি ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত জাপান রাষ্ট্রদূত মাসাতো ওয়াতানাবে। বনসাই সোসাইটির ১০৫ সদস্যের অন্যতম একজন বনসাই শিল্পী আইরীন পারভীন বলেন, সৃষ্টির আদিকাল থেকে ‘প্রকৃতি ও মানুষের সম্পর্ক নিবিড়। বেঁচে থাকার জন্য আমরা প্রকৃতির দান দু’হাত ধরে গ্রহণ করে থাকি, অথচ মাঝে মধ্যে আমরা প্রকৃতির সঙ্গে কতই না বৈরী আচরণ করি। নগরায়ন যত বাড়ছে, প্রকৃতি থেকে আমরা ততই দূরে সরে যাচ্ছি। বনসাই শিল্পের মাধ্যমে আমরা প্রকৃতির সেই নির্ভেজাল পরশ পেতে পারি। মানুষের মাঝে যে নান্দনিক অনুভূতি আর সৃষ্টিশীলতা রয়েছে তার অন্যতম বহিঃপ্রকাশ ‘বনসাই’।
নান্দনিক বনসাই প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে ৬০ জন বনসাই শিল্পীর পাঁচ শতাধিক বসনাই। বনসাই নিয়ে সমাজে রয়েছে নেতিবাচক ও ইতিবাচক ধারণা। কেউ বলেন, ‘মানুষের মাঝে যে নান্দনিক অনুভূতি, যে সৃষ্টিশীলতা রয়েছে তার অন্যতম বহিঃপ্রকাশের মাধ্যম ‘বনসাই’। আবার কেউ বলেন, বনসাই চর্চা নিতান্তই একটা পাসবিকতা।
জানা যায়, একটি পরিপূর্ণ গাছের সব বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান থাকা অবস্থায়ও সে গাছগুলো প্রাকৃতিক নানা কারণে পরিপূর্ণ বিকশিত হতে পারে না, সেইসব খর্বাকৃত গাছগুলোকেই বেছে নেয়া হয় বনসাইয়ের জন্য। ‘পাহাড়ের গায়ে, বাড়িঘরের ফাঁটলে, সমুদ্রের ধারে কিংবা গভীর অরণ্যের ঠাঁসা গাছপালার অন্ধকারে ছোট হয়ে পড়ে থাকা গাছগুলোই ব্যবহূত হয় বনসাই শিল্পে। আর এ ধরনের গাছগুলো বেশিরভাগ সময় কাস্তে-কোদালের আক্রমণের শিকার হয়ে থাকে। এসব গাছই একজন বনসাই শিল্পী মাটির পাত্রে জীবন্ত ও সজীব করে রাখতে গভীর মমতায় আর পরম যত্নে লালন-পালন করে থাকেন।
জানা যায়, প্রদর্শনীতে দেশি-বিদেশি পাঁচ শতাধিক বনসাই স্থান পেয়েছে। এ সব বনসাইয়ের দাম পড়বে ৫০০ টাকা থেকে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত প্রদর্শনী দর্শনার্থীদের জন্য খোলা থাকবে। বনসাই এর মধ্যে আছে বটগাছের সবধরনের প্রজাতি। দেশীয় গাছের মধ্যে রয়েছে—পাকুড়, রাধাচূড়া, তেঁতুল, ডুমুর, কামিনি, বাগান বিলাস, নিশিন্দা, কতবেল, কেওড়া, অর্জুন, তমাল, ঘূর্ণিবিবি, বৈচি, কমলা লেবু, কেলিকদম, বক্সউড, ফাইপার্ন, থাই কতবেল, টগর প্রভৃতি। বিদেশি গাছের মধ্যে রয়েছে চাইনিজ বট, ল্যান্টিনা, ফোকেনট্রি, বাওবা, জেটপ্লান্ট, ইপিলইপিল, জুপিটাসসহ আরো অনেক জাতের গাছ।
সোসাইটির সভাপতি নাজমা শফিকের সভাপতিত্বে এসময় আরো উপস্থিত ছিলেন সংগীত শিল্পী রফিকুল আলম, সোসাইটির সহ-সভাপতি রোজী কুদ্দুস, সাধারণ সম্পাদক মো. আনিসুল হক, গ্রীন ডেল্টা ইন্সুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের ম্যানেজিং ডিরেক্টর ও সিইও ফারজানা চৌধুরী, সহ-সাধারণ সম্পাদক মোতাহারুল হক চৌধুরী, প্রকাশনা সম্পাদক আইরিন পারভীন, কোষাধ্যক্ষ সৈয়দা আমীনা হকসহ শতাধিক বনসাই শিল্পী।
