বিশ্বের প্রথম বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট স্থাপন করা হচ্ছে রাজধানী ঢাকায়। ইনস্টিটিউটটি হবে ১৫ তলা বিশিষ্ট। প্রাথমিকভাবে এ প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৩৮ কোটি টাকা। এটি ৫০০ বেডের হবে। প্রকল্পটি শেষ হবে ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে।
জানা যায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ফেব্রুয়ারিতে দেশে বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারির উন্নত চিকিত্সার জন্য বিশ্বমানের এ ইনস্টিটিউট নির্মাণের ঘোষণা দেন। এরই ধারাবাহিকতায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে পাওয়া নির্দেশনায় এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়, রাজধানীর চানখাঁরপুলের টিবি হাসপাতাল সংলগ্ন প্রায় দুই একর জমির ওপর এ ইনস্টিটিউট নির্মাণ করা হবে। এ জন্য বর্তমানে দুইতলা বিশিষ্ট টিবি ক্লিনিক ভেঙে ফেলা হবে। ইতিমধ্যে টিবি হাসপাতালের কাছে পেট্রোল পাম্পের জমিও উদ্ধার করা হয়েছে। ইনস্টিটিউটটি তিন ইউনিটে বিভক্ত থাকবে।
বিশাল ভবনের প্রথম ইউনিট হবে পোড়া চিকিত্সার জন্য। ঢাকাসহ সারাদেশের পোড়া রোগীদের উন্নত চিকিত্সা দেয়া হবে এখানে। প্রতিটি ইউনিট হবে বিশ্বমানের এবং অগ্নিদগ্ধ মুমূর্ষু রোগীদের জন্য ৬০টি ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট বা নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) থাকবে। এসব আইসিইউ পরিচালনার জন্য দক্ষ জনবলও নিয়োগ দেয়া হবে।
দ্বিতীয় ইউনিট হবে প্লাস্টিক সার্জারির। ফলে প্লাস্টিক সার্জারির জন্য রোগীদের আর দেশের বাইরে যেতে হবে না। তৃতীয় ইউনিটটি হবে প্রশাসনিক ও একাডেমিক ভবন। বর্তমানে সারাদেশে এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ মাত্র ৫২ জন চিকিত্সক রয়েছেন। অথচ প্রতি বছর নানা কারণে প্রায় ৬ থেকে ৮ লাখ মানুষ আগুনে পুড়ছেন।
এ বিষয়ে বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি বিষয়ে জাতীয় প্রধান সমন্বয়ক অধ্যাপক ডা. সামন্ত লাল সেন বলেন, চাঁনখারপুলের টিবি হাসপাতালের জায়গায় ১৫ তলা বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট নির্মাণ করা হবে। এখানে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট গড়ে উঠবে। জানা যায়, ১৯৮৬ সালে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের একটি ওয়ার্ডে ৬ বেডের বার্ন বিভাগ চালু করেন দেশের প্রথম প্লাস্টিক সার্জন অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ। পোড়া রোগীদের জন্য আলাদা চিকিত্সা চালু হয় তখন। কমতে থাকে পোড়া রোগীদের মৃত্যুহার।
২০০৩ সালে ৫০ বেডের বার্ন ইউনিট চালু হলেও সেটি পূর্ণাঙ্গ রূপ লাভ করেনি। অধ্যাপক ডা. সামন্ত লাল সেনের অক্লান্ত শ্রমে গড়ে ওঠে ইউনিটটি।
২০১০ সালের ৩ জুন রাতে পুরান ঢাকার নিমতলীতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১২৭ জন মানুষ নিহত হন। ৩ জুন মধ্যরাতে পোড়া মানুষের আর্তচিত্কার ও গোঙানিতে ভরে ওঠে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিট। মাত্র ৫০ শয্যার চিকিত্সাকেন্দ্রটিতে সে মুহূর্তে ছিল ২১০ জন রোগী। নিমতলী থেকে আসে আরও ১৬৩ জন। তাদের মধ্যে গুরুতর ৪৫ জনকে ভর্তি করা হয়, বাকি লোকজন প্রাথমিক চিকিত্সা নিয়ে চলে যায়। অত্যন্ত সীমিত লোকবল ও মান্ধাতা আমলের যন্ত্রপাতি নিয়ে বার্ন ইউনিট সে সময় যে বিভীষিকাময় পরিস্থিতি সামাল দিয়েছিল, তা ছিল অবিশ্বাস্য।
ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে অন্তত ২০ জনের অবস্থা ছিল অত্যন্ত গুরুতর। কিন্তু বার্ন ইউনিট তাদের অধিকাংশের প্রাণ রক্ষা করতে সক্ষম হয়। তবে পোড়া সুস্থ হলেও পুরনো চেহারায় ফিরিয়ে আনতে সার্জারির দরকার হয়। এখন বার্ন ইউনিটে শয্যাসংখ্যা ১০০। নিমতলী অগ্নিকাণ্ডের সময় ছিল মাত্র ৫০। ৫০টি বাড়ানো হয়েছে। তবে ১০০ শয্যার হলেও রোগী থাকে প্রতিদিন ৫০০ জনের মতো।
৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর দেশব্যাপী সহিংস ঘটনা ঘটতে থাকে। যানবাহনে নিক্ষিপ্ত পেট্রোল বোমায় দগ্ধ হয় অনেকে। ওই সময় জানুয়ারি থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত সহিংস ঘটনায় যানবাহনে পেট্রোল বোমায় দগ্ধ তিন শতাধিক নারী, পুরুষ ও শিশুকে এই ইউনিটে আনা হয়। তাদের মধ্যে ১৮ জন মারা যায়। ওই সময় সারা দেশে পেট্রোল বোমায় শতাধিক মারা যায়, পঙ্গু হয় কয়েক শতাধিক মানুষ।
দগ্ধদের সুস্থ করতে অক্লান্ত পরিশ্রম করে বার্ন ইউনিটের সকল সদস্য। সে সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আলাদা বার্ন এবং প্লাস্টিক সার্জারি স্থাপনের ঘোষণা দেন। পরে প্রকল্পটি অনুমোদন দেয়া হয়। এই নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের সভাপতিত্বে সভা হয়। সভায় চাঁনখারপুল এলাকার সকল অবৈধ স্থাপনা সরিয়ে নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। পরে বাউন্ডারি দিয়ে প্রকল্পের কার্যক্রম শুরু করা হয়। প্রকল্পের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. আবুল কালাম এ প্রসঙ্গে বলেন, বিশ্বের কোথাও ৫০০ বেডের বার্ন কিংবা সার্জারি ইনস্টিটিউট নেই। এটি হবে সারাবিশ্বের পোড়া রোগীদের চিকিত্সার রোল মডেল। বার্ন ইউনিটের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক ডা. সামন্ত লাল সেনও একই কথা বলেছেন।
স্বাস্থ্য অধিদফতরসূত্রে জানা যায়, সারাদেশে যানবাহনে পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ অব্যাহতভাবে চলতে থাকায় ঢাকার বাইরে সকল সরকারি-বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে কিংবা জেলা সদর হাসপাতালে আলাদা বার্ন ইউনিট চালু করার নির্দেশনা দেয়া হয়। যাতে করে পোড়া রোগীরা হাতের কাছে দ্রুত সুচিকিত্সা পায়। তবে অভিজ্ঞ জনবলের অভাবে ঢাকার বাইরের বার্ন ইউনিটে চিকিত্সাসেবা ব্যাহত হয়। শত শত পোড়া রোগীকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে স্থানান্তর করা হয়ে থাকে। এই সীমিত জনবলে এই বার্ন ইউনিটে বিপুল সংখ্যক পোড়া রোগীকে সামাল দিতে চিকিত্সক, নার্স ও কর্মচারীদের হিমশিম খেতে হয়। এ কারণে ৫০০ বেডের বার্ন ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা হলে প্রতিবছর বহু বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক ও অন্যান্য অভিজ্ঞ জনবল তৈরি সম্ভব হবে। তারা ঢাকার বাইরের বার্ন ইউনিটে গিয়ে যোগদান করলে পোড়া রোগীরা হাতের কাছে বিশ্বমানের চিকিত্সা পাবেন।
