টিটুর সাজেক ভ্রমণ

আপডেট : ০৯ মার্চ ২০১৯, ১৯:১৩

  সাদিকুল নিয়োগী পন্নী

 

‘সারা দিন মেয়েদের নিয়ে পাহাড়ে পাহাড়ে ঘোরাঘুরি কর। আমি সাথে যেতে চাইলেই নানা অুজহাত দেখাও। আজ তোমার কপালে খাবার নেই।’

নৃত্য পরিচালক টিটু রাতে বাসায় ফেরার পর বউ মেঘলা চেঁচামেচি শুরু করল।

‘পাহাড় পর্বতে ওঠা অনেক পরিশ্রমের কাজ। তোমার কষ্টের কথা চিন্তা করেই আমি তোমাকে নিতে চাই না।’

টিটুর এই কথায় তেলে বেগুনে জ্বলে উঠে মেঘলা বলল, ‘ভণ্ডামীর জায়গা পাওনা। সুন্দরী মেয়েদের সাথে ছবি তুলে “পাহাড়ে আহারে” ক্যাপশন দিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দিচ্ছ। নানা রকম রিয়েক্টে তোমার ফেসবুক সয়লাব। আজ তোমার আহার বন্ধ।’

টিটু বলল, ‘সামনের মাসে সাজেক যাব। তুমিও চলো তাহলে। আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি খাবার দাও।’

এই প্রস্তাবে মেঘলার শুকনো মনে জোয়ার এলো। তাই সে আর কথা না বাড়িয়ে টিটুর জন্য ডাইনিং টেবিলে রাতের খাবার পরিবেশন করল।

 

দুই.

চট্টগ্রাম থেকে খাগড়াছড়ি হয়ে টিটু তার নাচের দল নিয়ে পৌঁছাল সাজেক ভ্যালিতে। সাথে আছে বউ মেঘলা। রেস্ট হাউসে কিছুক্ষণ রেস্ট নিয়ে সবাইকে নিয়ে একটা রেস্টুরেন্টে দুপুরের খাবার খেল টিটু।

তারপর বউকে বলল, ‘এই রোদে তোমার কষ্ট করার প্রয়োজন নেই। আমি শুটিং শেষ করে তোমাকে নিয়ে বের হবো। তুমি বরং রেস্ট হাউসে গিয়ে কিছুক্ষণ ঘুমাও।’

মেঘলা রেস্ট হাউসে চলে যাওয়ার পর টিটু নাচের দল নিয়ে সাজেকের একটা হেলিপ্যাডে গেল। সেখানে তিন চারটা নাচ ধারণে পর সবার সাথে দাঁড়িয়ে টিটু ছবি তুলছিল। এমন সময় মেঘলা হাজির। তার পরনে ত্রিপুরার ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরা। হাতে রঙিন ছাতা। নবরূপে বউয়ের এই আগমন দেখে টিটু অনেকটা চমকে উঠল।

টিটু বলল, ‘তুমি এই ড্রেস পেলে কোথায়?’

‘ভাড়া নিয়েছি ছবি তোলার জন্য।’

‘বেশ মানিয়ে তোমায়। চাইলে সাজেকে থেকে যেতে পার।’

‘সবকিছু নিয়ে ফাজলামি করবা না। তুমিও ড্রেস পরিবর্তন করে আসো। তোমার সাথে ছবি তুলব।’

‘আমি এসব পরতে পারব না।’

মেঘলা বলল, ‘তোমাকে কোনো ড্রেস পরতে হবে না। রাজীব ও আতাউরকে পাঠিয়েছি গাছের লতাপাতা আনার জন্য। সুজন চামকা সেগুলো দিয়ে তোমার জন্য পাহাড়ের আদি পোশাক বানিয়ে দেবে।’

মেঘলার কথা শুনে টিটুর চোখ কপালে উঠে গেল।

টুিটু বলল, ‘মানে তুমি আমাকে বস্ত্রচ্যুত করতে চাচ্ছ।’

মেঘলা বলল, ‘তা করতে যাব কেন? প্যান্ট শার্টেও ওপর দিয়েই তোমাকে পাহাড়ি ড্রেস পরানো হবে।’

টিটু হ্যাঁ না কিছু বলার আগেই রাজীব ও আতাউর একগাদা গাছের লতা পাতা নিয়ে হাজির হল। সুজন চাকমা এলো পাটের চিকন দড়ি নিয়ে।

সুজন বলল, ‘বউদি চিন্তা করবেন না। মিনিট দশেকের মধ্যে আমি টিটু দাদাকে আদিম যুগের পাহাড়ি মানব বানিয়ে দেব।’

টিটু বউয়ের পাগলামি দেখে সেখান থেকে চলে আসতে চাইল।

মেঘলা বলল, ‘তুমি এক পা নড়বে না। রাজীব আতাউর তোমরা দুজন টিটুকে ধরে রাখ। সুজন তুমি তোমার কাজ শুরু কর।’

টিটুকে শক্ত করে ধরে রাখল রাজীব ও আতাউর। সুজন চাকমা গাছের লতাপাতা দিয়ে টিটুকে সাজিয়ে দিল। নতুন এই ড্রেসে টিটুকে চেনার উপার নেই। মুখ ছাড়া তার সারা শরীর লতাপাতা দিয়ে ঢাকা।

মেঘলা বলল, ‘এবার আমার পাশে দাঁড়াও। ইকরাম ছবি তুলবে।’

টিটু অসহায়ের মতো মেঘলার পাশে দাঁড়াল। 

ইকরাম বেশ কয়েকটা ছবি তোলার পর মেঘলা বলল, ‘দাও দেখি ছবিগুলো কেমন হলো?’

‘আরে টিটুকে আমার সাথে কেমন ক্ষেত ক্ষেত লাগছে। কিসের একটা ঘাটতি মনে হচ্ছে।’

সুজন চাকমা বলল, ‘নাক মুখে কয়েকটা কালো দাগ দিলেই পাহাড়ি পাহাড়ি একটা ভাব আসবে। বনের রাজা টারজান ফেইল।’

মেঘলা বলল, ‘কিন্তু কালি পাব কোথায়?’

আতাউর বলল, ‘গাড়ির মবিল নিয়ে আসি ভাবি?’

মেঘলা উত্সাহ নিয়ে বলল, ‘তাই করো। আমি কোথাও কোন কিছুর ঘাটতি রাখতে চাই না।’

আতাউর গাড়ির পোড়া মবিল নিয়ে এলো। সুজন চাকমা টিটুর চোখ বাদের পুরো মুখে মবিল মেখে দিল। তারপর মেঘরা বিভিন্ন ভঙ্গিতে টিটুর সাথে অনেক ছবি তুলল।

এসব ছবি দেখে টিটু হ্যালিপেডেই মাথা ঘুরে পড়ে গেল।

 

তিন.

‘টিটু পাহাড়ি খাবার পাওয়া যায় এমন হোটেলে খাব। তারপর চট্টগ্রামের বাসে উঠবো।’ সাজেক থেকে খাগড়াছড়ি ফেরার পর মেঘলা বলল।

টিটু শুটিং ইউনিটের সবাইকে নিয়ে একটা পাহাড়ি হোটেলে গিয়ে খাবারের অর্ডার দিল।

সবাই নিজেদের মতো খাচ্ছে। টিটু বসেছে বউ নিয়ে হোটেলে এক কোনায়।

মেঘলা বলল, ‘তুমি তো সব সময় পাহাড়ে আসো। কোনটা বেশি টেস্ট?’

টিটু বলল, ‘শাক সিদ্ধ মরিচ ভর্তা দিয়ে মিশিয়ে খেতে পার।’

‘আমি তো ঝাল সহ্য করতে পারি না।’

‘আরে এই মরিচে কোনো ঝাল নেই।’ বলে টিটু অনেকটা ভর্তা শাকের সাথে মিশিয়ে বউয়ের মুখে তুলে দিল।

মেঘলা হুজুগের বশে মুখে নিয়ে তা বেশ আয়েশে চিবানো শুরু করল। কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পার হতেই ‘ওরে বাবা মরে গেলাম’ বলে লাফায়ি উঠল সে।

টিটু বলল, ‘কী হয়েছে? এমন করছ কেন? পাহাড়ের আসল স্বাদ এটাই।’

‘ও হা, ওহা’ করে মুখ হা করে মেঘলা পাগলের মতো করতে থাকল।

পরিস্থিতি বেগতিক দেখে টিটু ওয়েটারের কাছ থেকে কয়েক টুকরা বরফ এনে বউয়ের মুখে দিল।

মেঘলার চোখ নাক মুখ দিয়ে পানি ঝরছে। বরফের বদৌলতে মুখের ঝাল একটু কমার পর সে টিটুর ওপর ঝাল ঝাড়তে শুরু করল। তবে ওহা, ও হা করে যাচ্ছে আগের মতোই।

টিটু কথা না বলে মিটি মিটি করে হাসছে।

আর শুটিং ইউনিটের সবাই এমনকি হোটেলে অন্য কাস্টমারাও হাসছে হো হো করে।