বিশ্বজিত্ দাস
‘কাল সকাল ৯টায় অফিসে আমার একটা প্রেজেন্টেশন আছে। একটু সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে নাস্তা দিও।’ ইচ্ছে নেই তবু জোরে জোরে বলল সেলিম।
রাবুর সাথে পরশু থেকে ঝগড়া চলছে। ঝগড়ার বিষয় আর কিছুই না। সেলিম কী মনে করে হঠাত্ বলেছিল, ‘আচ্ছা রাবু, বাবা-মা তোমার নাম রাবু রাখল কেন?’
‘তাতে কোনো অসুবিধা?’ মুখ ঝামটা দিয়ে বলেছিল রাবু।
‘না। মানে ক্যাম্পাসে ছেলেরা নিশ্চয়ই তোমাকে খেপাতো—রাবু কেন কাবু! আরে এটা তো বাংলা সিনেমার নামই হয়ে গেল। রাবু কেন কাবু! উহ! নাম শুনেই পাবলিক সিনেমা হলে হুড়মুড় করে দৌড়াবে।’
খিকখিক করে হেসেছিল সেলিম।
‘এর মধ্যে হাসির কী আছে?’
‘বারে! তোমার মতো নায়িকা কেন কাবু সেটা দেখতেই তো সবাই হলে দৌড়াবে।’
অমনি রাবু রেগেমেগে লাল হয়ে গিয়েছিল।
‘তোমার মতো পুরুষেরাই এইসব দেখার জন্য উতলা, বুঝলা।’
তারপর থেকে কথা বন্ধ। কাল অফিস যাওয়ার আগেও কথা বলেনি। আসার পরেও না।
আজো সারাদিন কথা হয়নি। কিন্তু সন্ধ্যা থেকেই উসখুস করছে সেলিম। আগামীকালের প্রেজেন্টেশনে টাইম মতো পৌঁছাতে হবে।
‘একটু সকালে উঠিও প্লিজ। নাস্তা না খেয়ে গেলে দিনটা আমার ভালো কাটে না।’
রাবু কিছু বলল না। চুপচাপ চিরুনি দিয়ে মাথা আঁচড়াতে লাগল।
সেলিম ভেবেছিল সাতটার মধ্যে ঘুম থেকে উঠে ওকে জাগাবে রাবু। সাড়ে ৭টার সময় ঘুম ভাঙল সেলিমের। রাবু ওঠেনি। ডাকেওনি।
অনেক কষ্টে মেজাজ ঠাণ্ডা রাখল সেলিম। তাড়াতাড়ি স্নান সেরে নিল। ঠিক করল নিজেই ডিম ভেজে নেবে। গতকালকের আনা পাউরুটি আছে।
ঘড়ির দিকে তাকাল ও। সর্বনাশ! ৮টা পার হয়ে গেছে। তাড়াতাড়ি করে গ্যাসের চুলার ওপর প্যান চাপাল সেলিম।
বার্নারের নব ঘুরাল। অমনি মট্ করে শব্দ হলো। নব উল্টোদিকে ঘুরিয়েছে! ভেঙে গেছে!!
‘কিসের শব্দ হলো?’ বিছানা থেকে উঠে এলো রাবু।
‘গ্যাসের চুলার একট নব ভেঙে গেছে।’
‘কবে থেকে বলছি একটা ম্যাজিক চুলা কিনে দেওয়ার জন্য।’
সেলিম কোনো কথা বলল না। এখন তর্ক করলে অফিসে দেরি হয়ে যাবে। সরে এল রান্না ঘর থেকে।
রাবু অন্য বার্নারে ডিম ভেজে দিল।
‘চুলাটা কখন ঠিক করে আনবে? চুলা ছাড়া রান্না করা অসম্ভব।’
‘বিকেলে ফিরেই ঠিক করে আনব।’
রাবু আর কিছু বলল না।
সেলিম মনে মনে ফ্ল্যাট মালিকের চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করল। নতুন ফ্ল্যাট। সবাইকে সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহার করতে হয়। ফ্ল্যাট মালিক নিশ্চয়ই টাকা খরচ করতে চায়নি। নইলে কম খরচের তিতাস গ্যাসের লাইনটাই থাকত।
দুই.
সন্ধ্যার পর শিস দিতে দিতে বাসায় ফিরল সেলিম। পকেটে কিনে নিয়ে এসেছে সুপার গ্লু।
রাবু টিভি দেখছে।
সেলিম তাকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলল, ‘সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে। এখনই ঠিক করে দিচ্ছি তোমার চুলা।’
রাবু কোন কথা বলল না। উঠেও এল না। স্বাভাবিক অবস্থায় সেলিম অফিস থেকে ফিরে আসার পর ওর জন্য নাস্তা রেডি করে রাখে। চা বানিয়ে দেয়।
আজ কোনো কিছুই কপালে নেই।
নেই কে বলেছে! মনে মনে বলল সেলিম। চুলা ঠিক করেই চা বানিয়ে নেব। ভাবল সেলিম।
সকালে ভেঙে যাওয়া নবটা খুলল ও। মাঝ বরাবর ফেটে গেছে।
সেলিম ধীরে ধীরে ফাটলের মাঝে সুপার গ্লু দিল। তারপর শুকিয়ে যাওয়ার আগে নবটা লাগিয়ে দিল।
যাক। বড় একটা ঝামেলা চুকিয়ে ফেলেছি। স্বস্থির নিঃশ্বাস ছাড়ল সেলিম।
অফিসের কাপড় ছেড়ে হাতমুখ ধুয়ে চুলার পাশে এলো ও। ঠিক হওয়া নব ঘুরিয়ে সেই বার্নারেই চা বানাবে বলে ঠিক করেছে।
নব ঘুরল না। আরও শক্ত হয়ে গেছে। কোনো নড়নচড়ন নেই। ওদিকে রাবু স্থির চোখে টিভি দেখছে।
ভাবখানা এমন—তুমি যা খুশি কর রান্না ঘরে, আমি আর তোমার সাথে নেই।
মাথা ঝাঁকাল সেলিম।
চুলাটা গ্যাসের দোকানে নিয়ে যেতে হবে। চারতলা বিল্ডিংয়ের সিঁড়ি বেয়ে চুলা নিয়ে নামতে আর উঠতে হবে, ভাবতেই বুকটা শুকিয়ে গেল ওর।
চুলা সরাতে গিয়ে পড়ল বিপদে। গ্যাসের সংযোগ নল সিলিন্ডারের সাথে যুক্ত আছে বেশ শক্তভাবে। প্রথমে স্ক্রু খুলে পাশে রাখল সেলিম। তারপর মোমবাতি জ্বালিয়ে সংযোগ স্থলের পাইপ নরম করে সিলিন্ডার থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলল।
দরজা খুলে চুলা নিয়ে নামার সময়ও রাবু কিছু বলল না।
মনে মনে চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করতে করতে চারতলা থেকে নিচে নামল ও।
রিকশা নিয়ে কোলের ওপর চুলা নিয়ে বসল। পরপর দুটো দোকান ঢু মারল ও।
নেই!
এই চুলার সাইজের নব নেই!!
আরেকটা দোকানের কর্মচারী বলল, ‘নব আছে। পঞ্চাশ টাকা লাগবে।’
ইতোমধ্যে রিকশা ভাড়া একশ টাকা বেরিয়ে গেছে। রাবুর সাথে ঝগড়ার খেসারত তাহলে আড়াইশ টাকা। উইথ শারীরিক পরিশ্রম।
অনেক কষ্ট করে চারতলায় চুলা নিয়ে উঠল সেলিম।
এইবার একটুপরই চা বানিয়ে খাবে সেলিম। রাবুকে দেখিয়ে দেখিয়ে।
নেই!
সিলিন্ডারের সাথে গ্যাস নল যুক্ত করার পর যে স্ক্রুটা লাগাতে হবে সেটা নেই!
তন্ন তন্ন করে খুঁজে দেখল সেলিম।
রাবু ড্রইং রুমে এক মনে টিভি দেখছে। স্ক্রু কি দেখেছ জিজ্ঞেস করতে গিয়ে থেমে গেল সেলিম।
দরজা খুলে বের হল সেলিম। আবার যাবে ওই চুলার দোকানে। স্ক্রু নিয়ে এখনই ফিরে আসবে।
রিকশা নিল সেলিম। আবার টাকা খরচ।
যাক।
মাঝে মাঝে এমন দিন যায়। অহেতুক ঝামেলা কাঁধে এসে চাপে।
বন্ধ! চুলা ঠিক করার দোকানটি বন্ধ হয়ে গেছে। বাধ্য হয়ে ফিরতি পথ ধরল ও। ঠিক করল, স্ক্রুর বদলে টিনের তার দিয়ে শক্ত করে বেঁধে দেবে পাইপ।
ঘুরে ঢুকে রাবুকে রান্না ঘরে পেল সেলিম।
‘কোথায় গিয়েছিলে?’ নিস্পৃহভাবে জানতে চাইল রাবু।
‘সিলিন্ডারের সাথে পাইপ জোড়া লাগানোর স্ক্রুটা কই যে হারাল?’ মাথার চুলে হাত বোলাল সেলিম যেন ওখানেই হারিয়েছে ওটা।
‘স্ক্রুটা তো চুলার নিচে পড়ে আছে। এই নাও। ভালোমতো না খুঁজেই খালি এদিক ওদিক দৌড় দাও।’ বলে সেলিমের হাতে হারানো স্ক্রুটি তুলে দিল রাবু।
‘হারামজাদা! তুই গিয়ে চুলার নিচে লুকিয়েছিস।’ স্ক্রুকে বকা দিল সেলিম।
‘মুখ খারাপ করছ কেন? কোনোকিছু ঠিক করতে গেলেই তো তোমার মাথার স্ক্রু খুলে পড়ে যায়, তা জানো।’ রাবু হাসল। সেলিমও হাসল।
সে হাসি স্ক্রু জোড়া লাগার।
সে হাসি সমঝোতার।
