আঙুর ফল টক

আপডেট : ০৯ মার্চ ২০১৯, ২০:৫২

  তারেকুর রহমান

 

শেয়াল খুব ধূর্ত প্রকৃতির প্রাণী। তার চোখে সহজে কোনো কিছু এড়িয়ে যায় না। গ্রামের মধ্যে কার বাড়িতে কয়টা মুরগি আছে তা শেয়ালের নখদর্পণে। শেয়ালের খায়েশ হয়েছে গ্রাম থেকে যত হাঁস মুরগি আছে সব সাবাড় করতে হবে। যেমন ইচ্ছে তেমন কাজ। প্রতিদিন এক একজনের খোয়াড়ে হানা দিচ্ছে শেয়াল। কেউ না কেউই শেয়ালের আক্রমণের শিকার হচ্ছে। দিনে দিনে গ্রামে হাঁস-মুরগির পরিমাণ কমতে লাগল। শেয়ালের আনন্দ আর কে দেখে! তার প্ল্যান আস্তে আস্তে বাস্তবায়িত হতে লাগল। এদিকে গ্রামের মানুষ চিন্তায় পড়ে গেল। এভাবে চলতে থাকলে গ্রাম থেকে হাঁস-মুরগি বিলীন হয়ে যাবে। এর একটা আশু সমাধান করতে হবে। গ্রামের মানুষ আলোচনা করে একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হলো। গ্রামে পাহারা বসানো হবে। অনেকটা মোবাইল কোর্টের মতো। কে ঢুকে কে বের হয় তার দিকে তীক্ষ দৃষ্টি রাখতে হবে। রাত বাড়তে লাগল। আস্তে আস্তে পাহারাদারদের ঘুমও ধরতে লাগল। ঠিক এই মুহূর্তের অপেক্ষায় ছিল শেয়াল। সে পা টিপটিপ করতে করতে ঢুকে পড়ল। এরই মধ্যে সে তার শিকার ধরে ফেলল। শিকার ধরেই এক দৌড়ে গিয়ে ধান ক্ষেতে বিলীন হয়ে গেল।

গ্রামের মানুষের চিন্তা আরও বেড়ে গেল। এত নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যেও এরকম ঘটনা ঘটে গেল। গ্রামের মানুষের ধারণা এ ঘটনাটা তাদের গ্রামের কোনো চোর করছে। অবশ্য তারা বদু চোরাকে টার্গেট করছে। ও ছাড়া এ কাজ কেউই করতে পারে না। গ্রামে বিচার বসল। বদু চোরাকে ঢেকে আনা হলো। রাতের আকাশে চাঁদ দেখা যাচ্ছে। এই জোত্স্না শোভিত রাতে বদু চোরার বিচার হচ্ছে। সে এ গ্রামের হাঁস-মুরগি চুরি করে। বদু চোরা বারবার বলার পরও তার কথা কেউই শুনছে না। বদু চোরা কান্নাভেজা কণ্ঠে বলতে লাগল, ‘আমি তো গত এক সপ্তাহ এই গেরামেই ছিলাম না। তাইলে আমি কিভাবে চুরি করলাম?’

‘তুই কিভাবে চুরি করছস সেইটাই বাইর করার লাইগা এই বিচার বসছে।’

‘বিশ্বাস করুন আমি চুরি করি নাই।’

‘তুই করোসনাই মানে? তুই-ই চুরি করছস।’

এই কথা বলতে না বলতে একজন এসে একটা বেত নিয়ে বদু চোরাকে মারতে লাগল। মারতে মারতে লোকটি টায়ার্ড হয়ে গেল। আশপাশের সবাই খুব বকাঝকা করতে লাগল। এত করে কেউ কাউকে মারে? সে চোর হলেও তো মানুষ।

এরই মধ্যে হঠাত্ করে মুরগির চিত্কার শোনা গেল। লোকজন মুরগির আওয়াজ শুনে অবাক হয়ে গেল। বদু চোরা এখানে তাহলে মুরগি চুরি করছে কে? সবাই দৌড়ে গিয়ে চোর ধরতে গেল। কিন্তু চোর এবার মুরগি না নিয়ে চলে গেল। এই যাত্রায় মুরগিটার রক্ষা হলো। এদিকে বদু চোরা বেশ ক্ষেপে গেল। সে বেতটা নিয়ে এতক্ষণ যে মারল তাকে মারতে লাগল। এইবার বুঝো আমাকে অযথা মারার শাস্তি।

যাহোক, গ্রামের মানুষ প্রকৃত চোরকে খুঁজতে বেশ উঠে পড়ে গেল। রাতে সবাইকে সজাগ থাকতে বলা হলো। রাত বাড়তে লাগল শেয়ালও তার শিকার ধরতে বের হলো। গতকাল সে ব্যর্থ হয়েছে। আজ তার ব্যর্থ হওয়া যাবে না। তাই তাকে খুব সতর্কতার সহিত শিকার করতে হবে। সে সবার চোখকে ফাঁকি দিয়ে শিকারের খুব নিকটে পৌঁছে গেল। যখনই শিকার ধরে টান দেবে তখনই মুরগিগুলো আওয়াজ করতে লাগল। তাদের পাগুলো রশি দিয়ে বাঁধা ছিল। লোকজন মুরগির আওয়াজ শুনে লাঠিসোঁটা নিয়ে হাজির। শেয়ালকে কয়েকজন দেখে ফেলে। একজন খুব জোরে লাঠি দিয়ে আঘাত করে। আঘাত গিয়ে পড়ে শেয়ালের লেজে। কোনোরকম শেয়াল জান নিয়ে চলে আসে।

এদিকে বনের মধ্যে শেয়ালের আত্মীয়রা তাদের খাবারের অপেক্ষায় বসে আছে। শেয়াল শিকার নিয়ে এলেই খেতে বসবে। খাবার আনবে কী, শেয়াল লেজ হারিয়ে এলো! এক বয়স্ক শেয়াল বলল, ‘কিরে আজকের শিকার কই?’

‘না মানে প্রতিদিন একই ধরনের খাবার ভালো লাগে না। তাছাড়া হাঁস-মুরগির মাংস বেশি খাওয়া ক্ষতিকর তাই আনি নাই।’

‘ও তাই নাকি? তাহলে লেজটা কই গেল রে?’

শেয়াল কোনো জবাব দেয় না। সবাই বুঝল শেয়াল শিকার করতে না পেরে আঙুর ফল টক বলছে।