হিরু ও কয়েকজন বেস্ট সেলার লেখক

আপডেট : ০৯ মার্চ ২০১৯, ২০:৫২

সাইফুল ইসলাম জুয়েল-এর

হিরু এক ধ্যানে বই পড়ছে। গভীর রাত। হঠাত্ দরজায় খুট খুট আওয়াজ...।                   ভূত? ইঁদুর? নাকি অন্য কিছু?

দরজা খুলে হিরু যাকে দেখল তাতে ভূত দেখার মতোই চমকে উঠল সে। বাঁধন। হিরুর খালাতো বোন।

বেচারি এত রাতে এখানে কেন?

হিরু শুকনো গলায় বলল, ‘যে বইটা পড়ার জন্য নিয়েছিলাম, ওটা নিতে এসেছ বুঝি!’

বাঁধন কাচুমাচু করতে লাগল। হিরু অবাক। নাক উঁচু মেয়েটা এমন করছে কেন?

‘আর দশ মিনিট। শেষের কয়েকটা পাতা পড়া বাকি আছে। তারপর নাহয় নিয়ে যেও।’ হিরু বিনীত কণ্ঠে বলল।

‘একটা বই পড়তে এতক্ষণ লাগে!’ বাঁধনের সেই আত্মঅহমিকা। ‘ঠিক আছে, দশ মিনিট এখানে দাঁড়ালাম। ঝটপট পড়া শেষ করে নিয়ে আসুন।’

দশ মিনিটে শেষ হলো না। এগারো মিনিট লাগল। হিরুর হাত থেকে বইটা নিয়ে বাঁধন তার দামি ফোন দিয়ে সুন্দর করে ছবি তুলল। বইয়ের কভার প্লাস হাতের কিছুটা অংশ। ছবি তোলার ফাঁকেই সে হিরুকে বইটা সম্পর্কে কিছু কিছু প্রশ্ন করল।

তারপর বইটা বুকসেলফে সুন্দর করে সাজিয়ে রেখে নিজের রুমে ফিরে গেল। ফেসবুকে ঢুকে ছবিটা আপলোড করে, বইটা সম্পর্কে সুন্দর সুন্দর কিছু কথা লিখে পোস্ট দিয়ে দিল। একটু আগে এই কথাগুলোই সে হিরুকে প্রশ্ন করে জেনে নিয়েছিল।

 

দুই.

হিরু আরেকটা বই এনে কেবল পড়া শুরু করেছে, তখন আবারও খুট খুট শব্দ।

‘এবার নির্ঘাত্ ইঁদুর, নচেত্ ভূতই হবে!’ হিরু মনে মনে বলল।

তার ভাবনার মাঝেই আবার শব্দ। এবার একটু ঘনঘন। বোধহয় রুমের বাইরে অপেক্ষমান ভূতটির ধৈর্যে কুলোচ্ছে না।

হিরু দরজা খুলে আবারও চমকে উঠল।

বাঁধন ভণিতা না করে বলল, ‘আচ্ছা, একটু আগে যে বইটার ছবি তুলে নিলাম, ওই বইটার নায়ক-নায়িকার নাম কী?’

‘কোন বইটা?’ হিরু একটু হেঁয়ালি করল।

‘আরে ওই যে, ইয়ে কী যেন নাম...’ বলতে বলতে নিজের ফোনের গ্যালারিতে ঢুকে একটু আগে তোলা ছবি থেকে বইয়ের নামটা জেনে নিল সে। ‘ভাইরে, ভাবিরে!’

‘এই বইয়ে তুমি নায়ক-নায়িকা কোথায় পাইলা?’

‘নায়ক নায়িকা নাই?’ কেন জানি বাঁধনের কণ্ঠ বেশ মিইয়ে গেল। ‘তাহলে... উপায়?’ প্রশ্নটা নিজেকেই করল সে।

হিরু জানতে চাইল, ‘কী হয়েছে?’

‘আর বলবেন না। বইটা নিয়ে একটু আগে ফেসবুকে একখানা পোস্ট দিয়েছিলাম।’

‘এ-ত রা-তে’ হিরু সবিস্ময়ে বলল।

‘আরে, আপনে কি বেকুব! সেলিব্রিটিরা তো রাতেই ফেসবুকে সরব থাকে।’

‘তারপর?’ হিরু ঘটনার দিকে ইঙ্গিত করল।

‘আমি ভেবেছিলাম ওইটা একটা উপন্যাসের বই। কে জানত কবিতার বই! ভাই-ভাবি নাম দেখে নায়ক-নায়িকা আছে ভেবে নিয়েছিলাম...।

হিরু অনুচ্চস্বরে বলল, ‘ওটা কবিতার বইও নয়।’

‘সর্বনাশ!’ বাঁধন আঁতকে উঠল প্রায়। ‘মান-ইজ্জত সব গেল।’

‘কী হয়েছে?’

‘আর বলবেন না। বইয়ের লেখক আমার ফেন্ডলিস্টে আছেন। অনেকদিন ধরেই উনার নাগাল পাচ্ছিলাম না। ভাবলাম—ওনার বই নিয়ে ওনাকে ট্যাগিয়ে সুন্দর করে একখানা পোস্ট দিই। উনি শিওর আনন্দে গদগদ হয়ে যাবেন।’

‘গেলেন?’

‘তা গেলেন বটে। হতে পারেন তিনি ফেসবুক সেলিব্রিটি। কিন্তু বইয়ের সাথে মেয়েদের সুন্দর হাত দেখে কি আর ভাব নিয়ে থাকতে পারেন! ততক্ষণাত্ ইনবক্স করলেন। আমি তো খুশিতে বাকবাকুম। উনি জানতে চাইলেন, বইটা খুব ভালো লেগেছে? আমি বলল, হ্যাঁ। উনি জানতে চাইলেন, কোন বিষয়টা বেশি ভালো লেগেছে? আমি বললাম, নায়ক-নায়িকার বিষয়গুলো...। এরপরে অনেকক্ষণ উনার দেখা নেই। কতক্ষণ পরে বললেন, আপনি আমার বইটা পড়েছিলেন তো?’

বাঁধনের কথা শেষ হওয়ার আগেই হিরু হাঃ হাঃ করে হাসা শুরু করে দিল।

‘আপনাকে বলাটাই আমার ভুল হয়েছে। ক্ষেত একটা!’ কপট রাগ দেখিয়ে চলে গেল মেয়েটা।

হিরুর বুঝতে বাকি রইল না, নিজের ওপরের রাগটাই সে প্রকাশ করেছে মাত্র!

 

তিন.

ঠকঠক। সাতসকালে আবারও বাঁধনের অত্যাচার।

হিরু ঘুমুঘুমু চোখে দরজা হালকা ফাঁক করে বলল, ‘কী চাই?’

‘একটা সুখবর আছে।’

‘তোমার না আমার?’

‘আপনার সুখবর দিয়ে আমার কী কাজ।’

‘বেশ, তোমারটাই বলো, শুনি।’

বাঁধন স্ফিত হেসে বলল, ‘আরেকজন সেলিব্রিটি লেখককে কাল নক দিয়েছিলাম। উনি রিপ্লাই দিয়েছেন।’

‘কী বললেন উনি?’

‘বললাম, বইমেলায় বাংলাদেশের বাইরে থাকায় আপনার বেস্ট সেলার বইটা সংগ্রহ করতে পারিনি। এখন আপনার অটোগ্রাফসহ চাইছি।’

‘তিনি কী বললেন?’

বাঁধন উচ্ছ্বাস দেখিয়ে বলল, ‘উনি বললেন, “শুধু অটোগ্রাফ কেন, ফটোগ্রাফও হবে!”’

‘তুমি যাবে নাকি উনার ফ্ল্যাটে?’

বাঁধন হিরুর টিপ্পনিটা ধরতে পেরে বলল, ‘আমিও কম সেলিব্রিটি নই, হ্যাঁ। উনিই স্বয়ং আমাদের বাসায় আসবেন। রাতে বললেন, এবার নাকি তিনি একটা ভিন্নধর্মী প্ল্যান করেছেন। লটারির মাধ্যমে তার দশজন পাঠকের বাসায় গিয়ে হাজির হবেন। বই গিফট করবেন। সারপ্রাইজ আর কী। আজ আমাদের বাসায় আসছেন।’

‘সারপ্রাইজের আর বাকি থাকল কী!’ হিরু আপনমনে বলল। ‘লটারিটাই বা করল কখন!’ প্রশ্নটা আর বাঁধনকে করল না সে। বেচারি খুশির মধ্যে আছে। বেচারা সেলিব্রিটি বেস্টসেলার লেখকও ‘খুশিতে ঠ্যালায় ঘোরতে’ এখানে আসছে, তাকে তার কী ক্ষতি!

 

চার.

বইমেলার বেস্টসেলার লেখক বাঁধনদের বাসায় আসছেন শুনে আশপাশে যত পরিচিতজন ছিল, তারাও এসে হাজির হলো। শত হলেও বেস্ট সেলার লেখক বলে কথা।

সাজসাজ রব পড়ে গেল বাঁধনদের বাসায়। ধুলোজমা বুকসেলফগুলো ধুয়ে-মুছে চকচকে করে তোলা হলো। একটু পরেই তো ওখানে বিখ্যাত লেখকের বইও শোভা পাবে!

কলিংবেল বাজতেই বাঁধন প্রায় ছুটে গেল। কিন্তু সদর দরজায় লেখক মশাইয়ের বদলে অন্য একজনকে দেখে হতাশ হলো।

‘কী জন্য এসেছেন?’

‘পিএইচডি...’

ছেলেটা এই পর্যন্ত বলতেই বাঁধন চেঁচিয়ে উঠল, ‘মাথা খারাপ আপনার? এটাকে কি ইউনিভার্সিটি পেয়েছেন? এখানে করবেন পিএইচডি!’

ছেলেটা বিড়বিড় করে বলল, ‘ইয়ে মানে... আমি পিএইচডি, মানে পিত্জা হোম ডেলিভারি করতে এসেছি।’

‘আমরা তো পিত্জা অর্ডার দিইনি।’

পিছন থেকে বাঁধনের আব্বু বললেন, ‘একজন সেলিব্রিটি বাসায় আসছেন। তাকে ভালো-মন্দ কিছু খাওয়াতে হবে না? তাই অর্ডার দিলাম আর কী!’

একটু পরে পুনরায় কলিংবেজের আওয়াজ। দ্বিতীয়বারের মতো ছুটে গেল বাঁধন।

‘আপনি আবার কী করতে এসেছেন, এমফিল?’

বাঁধনের কথা শুনে থতমত খেয়ে গেল ডেলিভারি বয়। মিনমিন করে বলল, ‘ইয়ে মানে... একটা বইয়ের অর্ডার ছিল...।’

গতকাল এই বাসায় এসেই হিরু ঝাকানাকা অনলাইনে তার পছন্দের একটা বই অর্ডার করেছিল। অল্প সময়ের মধ্যেই তারা বইটা ডেলিভারি করতে চলে এসেছে! ‘ভালোই উন্নতি হয়েছে দেশের।’ হিরু মনে মনে বলল।

ডেলিভারি বয়টি থাকাবস্থায়ই বাঁধনের কাঙ্ক্ষিত পুরুষটির দেখা মিলল। ফেসবুক সেলিব্রিটি আরমান মুক্তাদির। বিগত বইমেলার বেস্ট সেলার লেখক। পুরো বাসার সবাই তাকে নিয়ে মেতে উঠল।

ডেলিভারি বয়টি তখনো দাঁড়িয়ে আছে। প্রথমে সে কতক্ষণ তাকিয়ে রইল আরমান মুক্তাদিরের মুখের দিকে। তারপর তাকিয়ে তাকিয়েই দেখল, আরমান মুক্তাদির বাঁধনের হাতে তার বইটা তুলে দিলেন। সেই বই হাতে নিয়ে বাঁধনের সে—কী উল্লাস। সেলফি আর ছবি তোলার ক্লিক ক্লিক আওয়াজে মুখরিত পরিবেশ!

‘উনি আপনাদের আত্মীয় বুঝি?’ ডেলিভারি বয়টি হিরুকে জিজ্ঞেস করল।

‘না। কেন?’

‘গত বইমেলা চলাকালীন আমি একদিন ওনার বাসায় গিয়েছিলাম, কিছু বইয়ের ডেলিভারি ছিল।’

‘কিছু মানে, কয়টা?’

‘সে প্রায় দুশর মতো হবে।’

‘ওহ। উনি সেলিব্রেটি মানুষ। বইমেলায় গিয়ে ঘুরে ঘুরে বইকেনার মতো সময় ছিল না হয়তো। সে কারণে আপনাদের অনলাইনে অর্ডার করে নিয়ে নিয়েছেন।’

‘কিন্তু উনি তো একই বইয়েরই দুশ কপি অর্ডার করেছিলেন...’

‘একই বইয়ের?’ হিরু যেন আঁতকে উঠল। ‘বইটার নাম মনে আছে আপনার?’

‘নাম তো মনে নাই। কিন্তু উনার হাতে যেই বইটা দেখলাম একটু আগে, এখন যেটা ওই আপুটার হাতে, ওটাই ছিল।’

‘আপনি শিওর?’

‘জি।’

ঝাকানাকা অনলাইন বুক শপের ডেলিভারি বয়টি চলে গেলেও হিরু এখনো সদর দরজাতেই সটান দাঁড়িয়ে আছে। মেলাজুড়ে ঝাকানাকা অনলাইন বুক শপের বেস্ট সেলারের তালিকায় ইনিই ছিলেন এক নম্বরে। এই কি তাহলে তার বেস্ট সেলারের রহস্য? হিরুর আর সন্দেহ রইল না, বাঁধনকে লটারির মাধ্যমে দশজন পাঠকের কথা বললেও আদতে তা দু শ’তে গিয়ে ঠেকবে!

ভেতরে ঢুকতেই হিরু বুঝতে পারল, ‘বেস্টসেলার লেখক’ লেখক মশাই এরই মধ্যে সবাইকে নিয়ে আড্ডা জমিয়ে ফেলেছেন।

‘আর বলবেন না, সাহিত্যের বাজারে কত কত আবর্জনারই না দেখা মেলে। তাদের কারণে আমাদের পাঠকেরা প্রতারিত হচ্ছে।’ পিত্জা চিবুতে চিবুতে বলছিলেন লেখক আরমান মুক্তাদির। পিত্জার শেষ অংশটুকু মুখের ভিতরে পুরে তিনি কথার খেই ধরলেন, ‘বাংলা-ইংরেজি মিশিয়ে কীসব ছাইপাশই না লিখেছেন উনি। সে যাকগে, আজ তাহলে উঠি...’

 

পাঁচ.

হিরুর খালাতো ভাই বান্টি এসে হিরুকে ধরল। ‘হিরু ভাই, অনলাইনে একটা বই অর্ডার দাও।’

‘তুমিই দাও না।’

‘আরে, তুমি তো বই পড়। বইয়ের পিছনে টাকা খরচা করো। আমি কেন শুধু শুধু খরচ করতে যাব।’

‘কার বই?’

‘ওই যে, রুবিনা খান না জানি কে আছে না একজন বেস্ট সেলার লেখিকা। তার বইটা।’

‘বইয়ের নাম?’

‘বইয়ের নাম বইয়ের নাম... হ্যাঁ মনে পড়েছে “বনdhu”।’

‘দিচ্ছি। তার আগে তোমার মোবাইলটা একটু দাও। ফেসবুকে একটা ঘুরান্টি মারতে হবে।’

বান্টি আপত্তি করল না। ফোনটা বাড়িয়ে দিল। হিরু ফেসবুকে ঢুকে রুবিনা খানের টাইমলাইনে গেল। তার ফ্রেন্ডলিস্টে সবার আগেই আরমান মুক্তাদিরের নামখানা দেখা যাচ্ছে। ফটোজে গিয়ে স্ক্রল করে কিছুটা নিচে নামতেই দেখতে পেল—রুবিনা খানের সঙ্গে আরমান মুক্তাদিরের চমত্কার হাস্যোজ্জ্বল ছবি!

হিরুর বুঝতে বাকি রইল না—একটু আগে আরমান মুক্তাদির নেগেটিভ মার্কেটিংয়ের মাধ্যমে তার বান্ধবী রুবিনা খানের একজন মতান্তরে একাধিক পাঠক বাড়িয়ে গেলেন। হয়তো, একই কাজটা রুবিনা খানও তার বনdhu আরমান মুক্তাদিরের জন্যও করে থাকেন!

‘কী হলো, বইটা অর্ডার দিবে না?’

হিরু মুচকি হেসে বলল, ‘বইয়ের অর্ডার না দিয়ে, তুমি ফেসবুকে এই লেখিকাকে নক করে বলো—বইমেলাকালীন বাংলাদেশের বাইরে থাকায় আপনার বেস্ট সেলার বইটা সংগ্রহ করতে পারিনি। এখন আপনার অটোগ্রাফসহ বইটা নিতে চাইছি। কিভাবে পেতে পারি?’ দেখবা—লেখিকা তার অটোগ্রাফ তো বটেই ফটোগ্রাফ তুলতেও চলে এসেছেন! আর শুভেচ্ছাস্বরূপ বইটা তো পাচ্ছই!’

বান্টি আর কিছু না বলে কেবল ‘ওয়াও!’ বলে একটা চিক্কুর দিয়ে উঠল।