সিএনজি অটোরিকশার ভাড়া নৈরাজ্য

আপডেট : ২০ নভেম্বর ২০১৫, ০০:২১

সিএনজি চালিত অটোরিকশার যাত্রী ভাড়া গড়ে ৬০ ভাগ বাড়ানোর পর পোয়াবারো এখন মালিক–চালকদের। আর অসহায় যাত্রীরা হয়ে পড়েছেন জিম্মি। ভাড়া-নৈরাজ্য চরমে পৌঁছেছে। সরকার মিটার বাধ্যতামূলক করে দিলেও আগের মতোই চুক্তিতে বা চালকের ইচ্ছায় চলছে অটো। যাত্রীদের পছন্দের গন্তব্যে যেতেও রাজি হচ্ছে না। এখন ‘মালিকদের জমা অঙ্ক, গ্যাসের দাম বেড়েছে’ -এই অজুহাতে ভাড়া নিচ্ছে প্রায় দ্বিগুণ। কখনো মিটারে গেলেও রিডিং থেকে ২০-৩০ টাকা বেশি দিতে হয়। নিরূপায় যাত্রীদের তা মেনে নিতে হচ্ছে। অটোরিকশা চালককে রাজি করাতে না পেরে যাত্রী ও সিএনজি চালকের মধ্যে তর্কা-তর্কি হাতাহাতিতেও গড়াচ্ছে।

 
চালক ও মালিকদের দাবি মেনে সরকার পয়লা নভেম্বর থেকে রাজধানী ঢাকার যাত্রী ভাড়া বাড়িয়েছে গড়ে ৬০ ভাগ। নতুন নির্ধারিত ভাড়া অনুযায়ী প্রথম দুই কিলোমিটার ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে আগের ২৫ টাকার বদলে ৪০ টাকা। মালিকদের জমার পরিমাণও বাড়িয়ে ৬০০ টাকা থেকে ৯০০ টাকা করা হয়েছে। প্রথম দুই কিলোমিটারের পর প্রতি কিলোমিটারের ভাড়া ৭ টাকা ৬৫ পয়সা থেকে বৃদ্ধি করে ১২ টাকা করা হয়েছে। এ ছাড়া বিরতিকালের জন্য ভাড়ার হার প্রতি মিনিটে ১ টাকা ৪০ পয়সা থেকে ২ টাকা নির্ধারণ করেছে সরকার। যে কোনো দূরত্বে যাত্রী পরিবহনে বাধ্যতামূলক সর্বনিম্ন ভাড়া ৪০ টাকা। রাজধানীতে ১৩ হাজার সিএনজি অটো আছে। এর মধ্যে এ পর্যন্ত মাত্র ৬ হাজার অটোরিকশাতে নতুন মিটার সংযোজন করা হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, নতুন ভাড়া কার্যকরের আগে সব সিএনজি চালিত অটোরিকশার মিটারে নতুন ভাড়ার সফটওয়্যার বসাতে হয়।
 
সিএনজির খরচ ৪ টাকা, নিচ্ছে ৪০ টাকা
 
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী জানিয়েছেন, সিএনজি চালিত অটোরিকশায় প্রতি কিলোমিটারে ২ টাকা খরচ হলেও সরকার প্রথম দুই কিলোমিটার ৪০ টাকা নির্ধারণ করেছে। অর্থাত্ ৪ টাকা খরচ করে চালকেরা যাত্রীদের কাছ থেকে ৪০ টাকা আদায় করছেন। শুধু তা-ই নয় মালিক-চালকদের ইচ্ছামতো ভাড়া নির্ধারণ করা হলেও ভাড়া নৈরাজ্য অব্যাহত রয়েছে।
 
বিআরটিএ-এর সচিব শওকত আলী বলেন, ব্যয় বিশ্লেষণ কমিটির মতামতের ভিত্তিতে ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। সিএনজি সেক্টরের জুলুম বন্ধে এ ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। সরকারের নির্দেশ মানতে বিআরটিএ ভ্রাম্যমাণ আদালতের ম্যাজিস্ট্রেটের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। আগে মাত্র দুইজন ম্যাজিস্ট্রেট থাকলেও এখন ১১ জন রয়েছেন। তারা প্রতিদিন ছয়টি আদালত পরিচালনা করছেন। এতে জরিমানার পাশাপাশি জেল দেয়ার বিধানও রয়েছে। যাত্রীদের কল্যাণে সব কিছু করা হচ্ছে।
 
এ প্রসঙ্গে একজন ভুক্তভোগি জানান, গুগল আর্থ ম্যাপ অনুযায়ী, রামপুরা থেকে মতিঝিলের দূরত্ব ৫ কিলোমিটার। সে হিসেবে সরকার নির্ধারিত ভাড়া অনুযায়ী সিএনজি চালিত অটোরিকশায় যাতায়াতের জন্য যাত্রীদের ভাড়া গুণতে হবে ৭৬ টাকা। এর সঙ্গে ১৫ মিনিটের যানজট ধরলে সর্বসাকুল্যে ভাড়া ১০৬ টাকার বেশি হওয়ার কথা না। তবে রামপুরা কাঁচা বাজারের সামনে থেকে তিনজন চালকের সঙ্গে কথা বললে কেউ ১৬০ টাকার নিচে যেতে রাজি হননি। এমনকি একজন ২২০ টাকাও চেয়ে বসেন। রামপুরা থেকে গাবতলী যাওয়ার ক্ষেত্রে গুগল ম্যাপ বলছে, দুইটি সড়ক ব্যবহার করা যায়। এর মধ্যে তেজগাঁও শহীদ তাজউদ্দিন  আহমেদ সরণি হয়ে মিরপুর সড়ক ধরে গেলে রাস্তার দূরত্ব দাঁড়ায় ১১ কিলোমিটার। আর মোহাম্মদপুর সড়ক হয়ে গেলে দূরত্ব বেড়ে হয় ১৩ কিলোমিটার। এ দূরত্ব ধরে সিএনজি চালিত অটোরিকশার ভাড়া কিছুতেই ২২০ টাকার বেশি হওয়ার কথা না। এর মধ্যে রামপুরা-গাবতলীর দূরত্ব ১৩ কিলোমিটার ধরলে প্রকৃত ভাড়া আসে ১৭২ টাকা। এর সঙ্গে ২০ মিনিট যানজট ধরলে ?যানজটের জন্য ভাড়া বাড়ে ৪০ টাকা। সে হিসেবে মোট ভাড়া দাঁড়ায় ২১২ টাকা; কিন্তু রামপুরার ওয়াপদা মোড় থেকে দুইজন চালকের সঙ্গে কথা বললে কেউ মিটারে যেতে রাজি হননি। আর চুক্তিতে ভাড়া চান একজন ৩শ টাকা, অন্যজন ৩২০ টাকা।
 
চালক-মালিকের কথায় গরমিল
 
সরকার ৬০ ভাগ ভাড়া বাড়ানোর পরও চালক-মালিক কেউ খুশি না। চালকদের দাবি তারা মিটারে যাত্রী নিলে ক্ষতিগ্রস্ত হন। সব খচর বাদে দিন শেষে আয় থাকে মাত্র ১০০ থেকে ১৫০ টাকা। তবে চালকদের এমন অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ঢাকা মহানগর সিএনজি অটোরিকশা মালিক সমিতি ঐক্য পরিষদের আহ্বায়ক আলহাজ বরকত উল্ল­াহ। তিনি বলেন, প্রতি বেলায় চালকরা গড়ে ২০০০ থেকে আড়াই হাজার টাকা আয় করেন।
 
১২ বছরে ৫ বার বাড়ানো হলো ভাড়া
 
২০০২ সালে সিএনজি অটোরিকশা চালুর পর এবার নিয়ে পাঁচবার ভাড়া বাড়ানো হলো। রাজধানীতে যে সিএনজি চালিত অটোরিকশা চলাচল করছে তার অধিকাংশই কেনা হয় চারদলীয় সরকারের সময় ২০০১ থেকে ২০০৩ সালে। ১ লাখ ৫৭ হাজার থেকে তিন লাখ টাকায় কেনা এসব অটোরিকশার আর্থিক মেয়াদ ছিল ২০০৯ সাল পর্যন্ত। পরবর্তীতে মালিকদের চাপে এসব অটোরিকশার মেয়াদ দুই ধাপে ২০১৫ সাল পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়। সর্বশেষ এ মেয়াদ আরো চার বছর বাড়ানো হয়।
 
অটোরিকশার ভাড়া নৈরাজ্য
 
বন্ধে ৯ প্রস্তাবনা
 

অটোরিকশার ভাড়া নৈরাজ্য বন্ধে ৯ দফা প্রস্তাবনা দিয়েছেন যাত্রী কল্যাণ সমিতি। এগুলোর মধ্যে আছে- বিনা প্রশ্নে যাত্রীদের পছন্দের গন্তব্যে যাতায়াত নিশ্চিত করতে হবে। মিটারে চলাচল নিশ্চিত করতে হবে পাশাপাশি মিটার ছাড়া বখশিশ বন্ধ করতে হবে। বিআরটিএ এবং ট্রাফিক পুলিশসহ সংশ্লিষ্টদের নিয়ে যৌথভাবে অটোরিকশা শৃঙ্খল ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে ইত্যাদি।