দার্জিলিং পাড়ার দিন-রাত

আপডেট : ১০ মার্চ ২০১৯, ১৮:৩৯

সরওয়ার রানা

বান্দরবান বরাবরই আমাকে টানে। আঁকাবাঁকা পথে উঁচু-নিচু পাহাড়, চারদিকে মনভোলানো সবুজের সমারোহ, প্রকৃতিকে ভালোবেসে ইচ্ছে করে এর মাঝে ডুবে থাকি। কেওক্রাডং শিখরে যাওয়ার ইচ্ছে আমার অনেকদিনের, কিন্তু মনের মতো সঙ্গী পাচ্ছিলাম না। অপু নজরুল ভাই ইকোট্যুরিজম নিয়ে কাজ করেন, পাহাড়-জঙ্গল নিয়ে প্রচুর জ্ঞান। অনেকদিন ধরে বলার পর অবশেষে উনি কেওক্রাডং যাওয়ার টিম রেডি করলেন। কেউক্রাডং চূড়ায় যাওয়ার পথে যেহেতু দার্জিলিং পাড়া তাই এই পাড়ায় রাত্রিযাপনের লোভ সামলাতে পারলাম না।

বান্দরবান থেকে যাত্রা শুরু রুমা বাজারের দিকে। ভয়াবহ গতি আর দুলুনির কারণে কিছুটা অস্বস্তি বোধ সাথে বমি বমি ভাব হচ্ছিল। সেসময় গাড়ি থামল এক জনশূন্য উপত্যকার পাশে। গাড়ি থেকে নেমে দেখতে পেলাম দিগন্তজুড়ে অনেক উঁচু-নিচু পাহাড়, চারদিকে সবুজের সমারোহ আর হু হু বাতাস। আমার মন ভরে গেল সাথে সকল অস্বস্তি কেটে গিয়ে শরীরটাও বেশ ফুরফুরে লাগল। আসলেই বোধহয় প্রকৃতির হিলিং পাওয়ার আছে! পাহাড়ি পথে চলতে চলতে আমরা পৌঁছে গেলাম রুমা বাজারে। এখানে আমাদের সাথে যুক্ত হলো বাধ্যতামূলক গাইড। ওর নাম লোকমান। এখানে সেনাবাহিনী ও পুলিশ ক্যাম্পে আমাদের পরিচয় লিপিবদ্ধ করতে বেশ কিছুটা সময় লাগল। তারপর ছুটে চললাম বগা লেকের দিকে। আমাদের ড্রাইভার পাকা হাতে চালিয়ে আঁকাবাঁকা পথে কমলা বাজারের আগে এবং পরে ভয়ঙ্কর খাঁড়া পাহাড় বেয়ে আমাদের পৌঁছে দিলো কাঙ্ক্ষিত বগা লেকে। পেটে প্রচণ্ড ক্ষুধা নিয়ে রবার্টের হোটেলে গিয়ে খাবার-দাবার সারলাম। এখানে থাকা-খাওয়ার জন্য বেশ কয়েকটি কটেজ আছে। বগা লেক সেনাক্যাম্প বিকেলে আমাদের কেওক্রাডং যাওয়ার অনুমতি দিতে চাচ্ছিল না।  কোনোরকমে ম্যানেজ করে আমাদের ট্রেকিং শুরু হলো। যদিও শুকনো মৌসুমে চাঁদের গাড়িতে করে দার্জিলিং পাড়া বা কেওক্রাডং যাওয়া যায়, তবু প্রকৃতির সান্নিধ্য পেতে আমরা পদব্রজেই পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথে চললাম দার্জিলিং পাড়ার দিকে।

পথে পথে চোখে পড়ে  হরেকরকমের বনফুল, ফুল ঝাড়ু গাছ। হলুদ আর সাদা রঙের মর্নিং গ্লোরি মতো একটা ফুল জায়গায় জায়গায় লতার মতো ফুটে আছে। চোখে পড়ে বিস্তীর্ণ জঙ্গল, সারিসারি পাহাড়। অনেক রঙের সবুজ, ফুল, পাতাগুল্ম বিকেলের সোনারোদে চমকাচ্ছে! পথজুড়ে বাঁশ ঝাড় আর সারিসারি কলা গাছ। কলা পেকে গাছে ঝুলে আছে। পেড়ে খেতে গিয়ে বুঝলাম আঁটি কলা তাই কদর নেই। চলতে চলতে প্রথম একটা মৃত ঝরনা পেলাম, বর্ষাকালে স্বরূপে ফিরবে। পানির কলকল শব্দ আমার কানে আসতেই আমি বিমোহিত হয়ে পড়লাম। এরপর পথে পড়ল চিংড়ি ঝরনা । বিশাল বিশাল পাথরের বোল্ডার আর পাহাড়ের গা বেয়ে ঝিরঝির করে বয়ে চলছে ঝরনা। ঝরনায় পানি কম। তবুও মনে প্রশান্তি জাগানিয়া কলকল শব্দ শুনি। পাথুরে পথ পাড়ি দিয়ে ঝরনা দেখে এলাম।

এদিকে সূর্য অনেকটা ঢলে পড়তে শুরু করেছে তাই আমরা একটা জায়গায় বসে সূর্যাস্ত দেখলাম। সে এক অপূর্ব অনুভূতি। আমাদের গ্রুপের সবাই দ্রুতপায়ে আগেই দার্জিলিং পাড়ায় পৌঁছে গেলেও আমরা ৩জন প্রকৃতি উপভোগ করতে করতে পিছিয়ে পড়েছিলাম।

পাহাড় চমত্কার একটা জায়গা। তবে এ সময় জুম চাষের জন্য এখানে আগুন দিয়ে ঝাড়ুর গাছ এবং বিভিন্ন গাছ পুড়িয়ে দেওয়ার ফলে এখানে সুন্দর কিছুটা ম্লান হয়ে গেছে। এখানে লক্ষ্য করলে দেখা যায় বড় বড় গাছগুলো আর নেই আগের মতো, সেজন্য অনেক পাখির দেখা মেলে না। নির্জন পরিবেশে বসে আছি, ঝিরিঝিরি হাওয়া বইছে। আস্তে আস্তে ঠাণ্ডা নামলো, আকাশজুড়ে তারার মেলা। আমার জীবনে এত তারা আর কবে দেখেছি মনে পড়ে না। মনে হচ্ছে গাছের ফাঁকে তারা ঝুলে ঝুলে আছে আমরা গাছের তলায় তারার আলোয় পথ চলছি। এদিকে কলাপাতা হাওয়ায় দুলছে মনে হচ্ছে প্রকৃতি যেন পিয়ানো বাজাচ্ছে। অপু ভাই আমাদেরকে কিছু তারার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন যেমন কালপুরুষ, শুকতারা আরো বেশকিছু তারার নাম বললেন, যা এখন আর মনে নেই। আমরা চলতে থাকলাম অন্ধকারে। হঠাত্ পাশের ঝোপঝাড় ভেঙে বুনো শুয়োরের মতো আওয়াজ করে কিছু একটা আমাদের অতিক্রম করলো। আমরা ভয়ে লাঠিসোটা দিয়ে ঝাড়ের মধ্যে আঘাত করতে লাগলাম।

বেশ ভয় ভয় বুকেই দার্জিলিং পাড়ায় পৌঁছালাম। নবিয়ালের কটেজে রাতের খাবার দেওয়া হলো মুরগি,  জুম চালের ভাত, আলু ভর্তা আর সিমের তরকারি। খাওয়া শেষে আমাদের লোকাল হোস্টের সাথে আড্ডা জমে উঠল। নবিয়ালের বাবা পাড়ার কারবারি, ভাঙা বাংলায় আমাদের প্রশ্নের উত্তর দিতে লাগলেন। কারবারি মশাই তেমন ভালো বাংলা বলতে পারেন না, তারপরও আমরা বুঝে নিলাম কোনোরকমে। সে জানালো, ১৯৮৫ সালের দিকে নিজ চোখে রয়েল বেঙ্গল টাইগার দেখেছে দার্জিলিং পাড়ার বনে। তার ছেলে বললো, রুমানা পাড়ার দিকে কে যেন রয়েল বেঙ্গল টাইগার দেখেছে ২ বছর আগেও। সানবিয়ার বা বড় ভালুক এখনো আছে। স্পেশালি জুমের ফসল পাকলে ভালুকগুলোকে দেখা যায়। তবে শিকারিদের উত্পাতে হরিণ প্রায় শেষ। আরো অনেক গল্প চলতে থাকলো মধ্যরাত অবধি। রুমে গিয়ে কাপড়-চোপড় বদলে আবার রাতে বের হলাম তারা দেখতে। আকাশে তারা ঝলমল করছে। অন্যরকম এক অনুভূতিতে মনটা ভরে গেল।

পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে নাস্তা সেরে যখন দার্জিলিং পাড়া দেখলাম, মুগ্ধ হলাম।  রাতের অন্ধকারে আমরা বুঝে উঠতে পারেনি দার্জিলিং পাড়া কতটা সুন্দর। চারদিকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, পরিপাটি। ১৯৬২ সালের দিকে রাঙামাটির কাপ্তাই লেকের কারণে বাস্তুচ্যুত হয়ে বম সম্প্রদায় এখানে এসে এই পাড়া গড়ে তোলেন। এখানে একটি গির্জা আর একটি প্রাইমারি স্কুল আছে। সবার ঘরের সামনে গোলাপ, জবা আরো অনেক ফুলের গাছ লাগানো। ঘরের সামনে কেউ জুমের হলুদ শুকাচ্ছে আর কেউবা সিদ্ধ করছে। হলুদের গন্ধ বাতাসে।

 

ছবি:অপু নজরুল