মুক্তিযুদ্ধে ঝালকাঠির নারীরা

আপডেট : ১০ মার্চ ২০১৯, ১৮:৪১

পলাশ রায়

 

দেশের শষ্য ভাণ্ডারখ্যাত বরিশাল বিভাগের ছোট্ট একটি জেলার নাম ঝালকাঠি। দক্ষিণ জনপদের এ জেলায় ফলে সোনার ফসল। বৈরি আবহাওয়াতেও বছরজুড়ে এখানকার গ্রামগুলোত নারীর পরম স্নেহের হাতে সবুজ হয়ে ওঠে হরেকরকম ফসল। কেবল কৃষিই নয়, শিক্ষা, শিল্প-সংস্কৃতি, রাজনীতি আর জাতি হিসেবে আমাদের সবচেয়ে বড় অহঙ্কার সেই মহান মুক্তিযুদ্ধে এ জেলায় নারীদের রয়েছে গৌরবের ইতিহাস। মুক্তিযুদ্ধে ঝালকাঠির বিপ্লবী সেইসব নারীদের ভূমিকার কথা যথাযথভাবে তুলে ধরা খুবই কষ্টসাধ্য। অনেকের মধ্যে বিশেষ ঝালকাঠির এমন তিন বিপ্লবী নারীর অগ্নিঝরা দিনগুলোর গল্পের কিছুটা দৃশ্যপট নিয়ে আজকের এ আয়োজন—

 

রমাবতি বসু

 

এক বিপ্লবী নারীর নাম রমাবতি বসু। ঝালকাঠি সদর উপজেলার ধানসিঁড়ি ইউনিয়নের বিশখালি নদীপাড়ে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে যার জন্ম। বড় ভাই দিলীপ বসু ও মেঝো ভাই সঞ্জিব বসু তুখোড় ছাত্রনেতা এবং সংগঠক। রমাবতিও কম যান না। ঝালকাঠি সরকারি কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্রী সে। কলেজের নানা অনুষ্ঠান আয়োজন, ছাত্রীদের প্রতিনিধিত্ব আর সাংস্কৃতিক আয়োজনে রমাকেই এগিয়ে রাখতে হতো। জীবনের গল্পের এমন সময় শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। পাকসেনা ও তাদের দেশীয় দোসররা ঝালকাঠির শহর-গ্রামে জনপদে আগুন লাগিয়ে দেয়। শুরু হয় গণহত্যা ও নারী নির্যাতন। দুই ভাই দিলীপ বসু ও সঞ্জিব বসু যুদ্ধে গেলেন। ছাত্রনেতা সঞ্জিবকে বঙ্গবন্ধুও খুব কাছ থেকে চিনতেন এবং ভালোবাসতেন।  রমা গ্রামের বাড়ি এবং শহরে যাতায়াত করতেন। মুক্তিযোদ্ধাদের খবরা-খবর দিতেন। স্কুল থেকেই তিনি বঙ্গবন্ধুর আদর্শ লালন করে ভাইদের মতো ছাত্রীদের মধ্যে চেতনা ছড়িয়ে দিতে কাজ করে আসছিলেন। রমাবতির সবচেয়ে ছোট ভাই অনুপ কুমার বসু সেদিন ছিলেন পাঁচ বছরের শিশু। সবকিছুই প্রত্যক্ষ করার মতো অবস্থা ছিল তার। স্বাধীনতার এতদিন পরে স্মৃতি হাতড়ে তিনি বলেন, ‘ইংরেজি তারিখটা মনে নেই। একাত্তর সালের বাংলা ৬ জৈষ্ঠ্য। ঝালকাঠি থানার তত্কালীন দারোগা ওয়াহেদের নেতৃত্বে একদল পুলিশ ও রাজাকার আমাদের বাড়ি আসে। খবর পেয়ে বাড়ির মেয়েছেলেরা ওদিক-ওদিক পালাতে থাকে। বড়দি (রমাবতি)’সহ আরো কয়েকজন একটি ঘরে লুকিয়ে থাকে। কিন্তু পাশের বাড়ির এক লোক রমাসহ তার আরো দুই মামাতো বোনকে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। দারোগা ওয়াহেদ দিদিকে দেখেই বলে, এইতো দিলীপ-সঞ্জিবের বোন।’

সেদিন রমার সাথে তার আরো দুই মামাতো বোন সোনাই ও কমলাকেও ধরে নিয়ে যায় পুলিশ-রাজাকার। বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া বিশখালি নদীর খেয়াঘাটের কাছে টেনে হেঁচেড়ে তিন নারীকে নৌকায় তোলার চেষ্টার সময় পুলিশের সাথে ধস্তাধস্তি হয় প্রতিবাদী রমার। শেষমেশ থানায় ধরে নিতে না পেরে নদীপাড়ে নির্মমভাবে গুলি করে রমাসহ তিনজনকে হত্যা করা হয়। আর দূর থেকে গাছে উঠে এ দৃশ্য দেখছিলেন এমন একজনের উদ্বৃতি দিয়ে অনুপ আরো বলেন, ‘গুলি করার পর নৌকা নিয়ে নদীর কিছুটা দূরে পৌঁছায় পুলিশ-রাজাকার। আর এমন সময় দিদি গোঙরানিতে জয়বাংলা বলে চিত্কার করে ওঠে। আর তখনই নৌকা নিয়ে তীরে এসে রাজাকাররা রাইফেলের বেয়ানেট দিয়ে দিদির শরীরে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে নৃশংসভাবে আঘাত করে।’—বলেই হাঊমাঊ করে কেঁদে ওঠেন অনুপ।

ঝালকাঠির মানুষের মনে আজো গেঁথে আছে এ বিপ্লবী নারীর নাম। মুক্তিযোদ্ধা সংসদে তার নাম শহীদের তালিকায় রয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রীয়ভাবে এ নারীকে এখনো দেওয়া হয়নি শহীদ মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি।

 

 

 

 

অঞ্জলি রায় গুপ্তা

 

পাকসেনার কাছে নিজের বাড়ি পুড়ে ছাই হতে দেখেছেন অঞ্জলি রায় গুপ্তা। ঝালকাঠি সদর উপজেলার কীর্তিপাশার এক কৃতি নারী তিনি। একাত্তরে ঝালকাঠির শিরযুগ আজিমুন্নেছা বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পদে কর্মজীবন শুরু করেন। শিক্ষা সংস্কৃতি ও প্রগতিশীল পরিবারে মেয়ে অঞ্জলি রায় তার ছোট ভাই শ্যামল রায়, বোন সন্ধ্যা, মনিকা ও সুদীপ্তাকে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়। ঝালকাঠির পেয়ারা বাগানে সিরাজ সিকদারের নেতৃেত্বে গড়ে তোলেন মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ শিবির। পরে সেখানে দফায় দফায় পাকবাহিনীর সাথে সম্মুখ যুদ্ধ ও চোরাগুপ্তা হামলায় বিশেষ ভূমিকা পালন করেন সাহসী তিন বোন সন্ধ্যা, মনিকা আর অঞ্জলি।

অঞ্জলি রায় গুপ্তার একমাত্র মেয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক ও গবেষক সুমনা গুপ্তা জানান, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তার মা আবারো নিজের কর্মস্থল আজিমুন্নেছা বালিকা বিদ্যালয়ে যোগ দেন। একাত্তরের গর্জে ওঠা হাতে তিনি তিলতিল করে স্কুলটিকে গড়ে তোলেন। পরবর্তীতে কলেজ পর্যন্ত উত্তীর্ণ করেন। ২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ পদে থেকে অবসরে যান এ বিপ্লবী নারী। ২০০৫ সালের ৫ নভেম্বর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয় তাকে।

 

 

 

রমা দাস

 

১৯৭১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলায় মাস্টার্স পড়ছিলেন রমা দাস। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর আগেই লিখিত পরীক্ষা শেষ। এ সময় কলাভবন, কার্জন হল, শহীদ মিনার চত্ত্বরসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন এলাকায় মিছিল-মিটিংয়ে অংশ নিতেন তিনি। দলবেঁধে বিভিন্ন কর্মসূচিতে যোগ দিয়ে পোস্টার, ব্যানার ও দেয়াল লিখতেন। তবে ডাক বিভাগে কর্মরত বাবার বদলির কারণে চলে আসেন ঝালকাঠি শহরে। শহরের দাস বাড়ির ছেলে পার্থ সারথী দাসের সাথে রমা দাসের পারিবারিকভাবে চূড়ান্ত হয় বিয়ে পূর্ববর্তী আনুষ্ঠানিকতা। বিয়ের কিছুদিন বাকি। আর এরইমধ্যে শুরু হয়ে গেল মুক্তিযুদ্ধ।

এ বীর নারী রমা দাস বলেন, ‘২৩ এপ্রিল ঝালকাঠি শহরের ঘরে ঘরে পাকবাহিনী ও রাজাকাররা আগুন লাগিয়ে দেয়। আমরা পেয়ারা বাগানে আশ্রয় নিই। সেখানে পেয়ারা বাগানে বরিশাল অঞ্চলের নৌ-মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ক্যাপ্টেন বেগের সাথে দেখা হয়। তার নেতৃত্বে প্রশিক্ষণ শিবিরে আমরা অস্ত্র চালনার প্রশিক্ষণ নিই। এরপর পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সাথে আমি ভারত চলে যাই। ভারত গিয়ে প্রথমে টালিগঞ্জে মামার বাড়িতে উঠি। এদিকে সেখান থেকে ৯ নম্বর সেক্টরের অধীন বশিরহাটের হাসনাবাদের অন্তর্গত টাকি ক্যাম্প ছিল। একদিন খবর পাই সেখানে আমার (স্বামী) পার্থ সারথী দাস রয়েছে। তখন আমি আমার ছোট ভাইকে নিয়ে টাকি ক্যাম্পে চলে যাই। আমার সেখানে গিয়ে ক্যাপ্টেন বেগ এবং পরে সেক্টর কমান্ডার মেজর জলিলের সাথে দেখা হয়। মেজর জলিল আমাকে ওই সেক্টরের মহিলা মুক্তিবাহিনীর প্রধান করে দেয়। তখন আমাদের একটি দোতলা ভবনের ওপর বিশেষ জায়গা দেওয়া হলো। আমরা সেখানে ৪০ থেকে ৪৫ জন মেয়েকে নিয়ে গড়ে তুলি ক্যাম্প। অস্ত্র চালনা ও বিস্ফোরণ ঘটানোর বিশেষ প্রশিক্ষণ নিই। আর ওই শিবির থেকে থেকে খুলনা, সাতক্ষীরার আশাশুনি, কালিগঞ্জ, ভোমরা, দেবহাটাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে গোয়েন্দাগিরি করতে যেতাম।’

দেশের মানুষকে মুক্তিযুদ্ধে সংগ্রামী চেতনায় উদ্বুদ্ধ করতে এবং মুক্তিযোদ্ধাদের উজ্জীবিত করতে স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্রেও কথিকা পাঠ করতেন রমা দাস। যুদ্ধ শেষ হলে কালিঘাটে কোনো উত্সব ছাড়াই মালাবদল আর মন্ত্র পড়ে অধ্যাপক পার্থ সারথী দাসের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন রমা।  এরপর ঝালকাঠিতে ফিরে শহরের হরচন্দ্র বালিকা বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন। ২০০৩ সালে অবসর নিয়েছেন এ মুক্তিযোদ্ধা নারী। পেয়েছেন রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির পাশাপাশি ঝালকাঠি জেলা প্রশাসনেরও বিভিন্ন সম্মাননা।

ঝালকাঠির এই শিক্ষক ও অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধা নারী বলেন, ‘রাষ্ট্র আমাদের অনেককিছু দিয়েছে, বিশেষ করে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা শেখ হাসিনার সরকার। তবে এক সময় স্বাধীনতা বিরোধীদের দাপটে আমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন মুক্তিযুদ্ধের সুখ-দুঃখ আর গৌরবগাঁথা ইতিহাস চাপা পড়েছিল।’