২০১৭ সালে প্রকাশিত তার দ্বিতীয় উপন্যাস ‘দ্য মিনিস্ট্রি অব দ্য অ্যাটমোস্ট হ্যাপিনেস’ উপন্যাসটি পাঠক মনে বেশ ভালোভাবেই ঝড় তোলে। বইটির জন্য তিনি বুকার পুরস্কার অর্জন করেন। ২০০৪ সালে সিডনি পিস প্রাইজও অর্জন করেন তিনি। এছাড়া তার লেখা আরেকটি জনপ্রিয় বই ‘দ্য গড অব স্মল থিংস’। বইটিতে অরুন্ধতীর ছোটবেলার গল্পগুলোই তুলে ধরা হয়েছে। এসেছে অনেক ছোট ছোট স্মৃতিকথা। শুধু লেখালেখির জগতেই নয়, সিনেমার জগতেও খানিকটা পরিচিত মুখ অরুন্ধতী রায়।
ইশরাত জাহান ঊর্মি
৬টায় শুরু হওয়ার কথা অ্যাটমোস্ট হ্যাপিনেসের বক্তৃতা। যদিও অনুষ্ঠানের শিরোনামের কোনো ব্যানার আর চোখে পড়ল না। সাড়ে ৬ বাজে তখনো সেই সৌন্দর্যের খবর নেই। ভেতরে উদ্বেগ চেপে চুপচাপ বসে আছি। ৭টা বাজার কিছু আগে পৌঁছালেন অরুন্ধতী রায়। সাদা আর ছাইরঙা কুর্তি, পায়ে মিলিয়ে স্যান্ডেল, হালকা অক্সিডাইজের গয়না। সেই কাঁচাপাকা চুল আর তীব্র দৃষ্টি চোখে, মুখের হাসিটা লেগেই রইলো পুরোটা সময়।
পুরো হলে একটা হর্ষধ্বনি ওঠে তাকে দেখতে পেয়ে। দুটো নিরাভরণ চেয়ারে শহিদুল আলম আর অরুন্ধতী রায়। একটা একটা করে প্রশ্ন করছেন শহিদুল আলম। জাতীয়তাবাদ, ধর্ম, গণতন্ত্র, উন্নয়ন, ফ্যাসিবাদ এ সব বিষয় আসে আলোচনায়। সব প্রশ্নের উত্তর দেন অরুন্ধতী নিজের স্টাইলে। খুব নরম করে যেন প্রবল গ্রীষ্মে মিহি বাতাস ছড়িয়ে পড়ছে চারপাশে। কঠিন কঠিন কথাও যে এত সুন্দর করে থেমে থেমে মিষ্টি করে বলা যায় তা তাকে দেখে শেখা যায়। তার চিন্তাপদ্ধতি যেমন স্বতন্ত্র, তার বলার ভঙ্গী, তার অ্যাটিটিউড, তার সাজ-পোশাক, তার চোখের ভাষা সবই আলাদা।
বেশিরভাগ কথাই বললেন লেখা নিয়ে। মাঝে মাঝে নিজের বই থেকে পড়ে শোনালেন। দ্য মিনিস্ট্রি অব অ্যাটমোস্ট হ্যাপিনেসের আঞ্জুমান হয়ে ওঠেন কখনো কখনো, আবার কখনো দ্য গড অব স্মল থিংকসের নিজের চরিত্র। বুকার প্রাইজ নিয়ে কথা বললেন। কেন সাহিত্য করার জন্য সহজ কোনো বিষয় বেছে না নিয়ে কঠিন সব রাজনৈতিক বিষয় বেছে নিলেন ব্যাখা দিলেন তারও। বললেন, যখন নিউক্লিয়ার বোমায় সমৃদ্ধ হচ্ছে ভারত, যখন জাতীয়তাবাদের ডামাডোল চারদিকে তখন কোনো লেখকই রাজনৈতিক না হয়ে পারেন না। আটমোস্ট হ্যাপিনেস নিয়ে ৬ মিনিটের একটি ভিডিওচিত্র দেখানো হলো। ভিডিওতে অডিওও অরুন্ধতীর। কাশ্মিরের বর্ণমালা—‘এ তে এ্যাটাক, বি তে ব্লাড, আর এ রেইপ, কে তে কিলিং’—এসব দেখাতে দেখাতে যখন আলো জ্বলে ওঠে অরুন্ধতীর চোখের কোণে তখন জল জমেছে। সেই জল আড়াল করার কোনো প্রয়োজনবোধ করেননি তিনি। নিজের লেখা বই পড়তে পড়তে কাঁদতে পারেন যিনি তিনিই তো মহত্ লেখক।
প্রশ্নোত্তর পর্বটা ঠিক জমে না। জমে না মূলত প্রশ্ন যারা করলেন তাদের কারণেই। খুব একটা স্পার্কিং কোনো প্রশ্ন আসে না। নিজের ব্রেকিং ফ্যামিলি নিয়ে কথা বললেন। নিজের পরিবারের কথা বললেন। টানা ২ ঘণ্টার বক্তৃতায় তাকে একবারের জন্যও ক্লান্ত মনে হয়নি। নাকের হীরের নাকফুলটা আঁধারে ঝলমল করছিল, আলোতেও জ্বলজ্বল করছিল।
অনুষ্ঠান শেষে বন্ধু শহিদুলকে আলিঙ্গন করেন তিনি। ততক্ষণে পুরো হল ফেটে পড়েছে উল্লাসে। যদিও বেশি লম্বা হয়ে যাওয়ায় শেষের দিকে আসলেই অনুষ্ঠানটি ঠিক জমছিল না। শেষ অংশে শুধু ক্যামেরার আলোর ঝলকানি ছিল, ক্যামেরা ক্রুদের ধাক্কাধাক্কি ছিল, কিন্তু এ সবকিছুর মধ্যেও তিনি শান্ত, ধীর। তিনি বলেন, ‘আমি তো অল্প কথায় কিছু বলতে পারি না। এরমধ্যে অনেক কথা বলেও ফেলেছি। অল্প কথায় কিছু বললে মিসকোট হওয়ারও আশঙ্কা থাকে, তাই কিছু আর বলছি না আর। প্রত্যেক লেখকেরই রাজনীতি সচেতন হওয়া উচিত। আমিও তাই। অ্যাকটিভিজম থেকে তাই সাহিত্যকে আলাদা করার কিছু নেই।’
সবকিছু শেষ হলো যখন ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না আমি তার চিন্তাপদ্ধতি নিয়ে ভাববো, তার লেখার কাব্যিক ভাষা পড়বো নাকি তাকে দেখবো? তার ঋজু, টানটান ভঙ্গী দেখবো নাকি আঞ্জুমানের কথা ভাববো, কাশ্মিরের বেদনা ভাববো? লেখকের সৌন্দর্য কখনো যদি তার লেখা আর কর্মকাণ্ডকে অতিক্রম করে যায় তবে যারা তাকে দেখছেন তাদের দৃষ্টি নিয়ে সন্দেহ হতেই পারে। এক ধরনের তৃষ্ণা নিয়েই শেষ পর্যন্ত বের হয়ে আসি মাইডাস সেন্টার থেকে।
লেখক :কথাসাহিত্যিক, গণমাধ্যমকর্মী
