ভারতীয় সিনেমা ‘বস’ দেখে ডাকাতির পরিকল্পনা করা হয়। সিনেমার ঘটনা অনুযায়ী পুলিশ কর্মকর্তা সেজে ডাকাতি করা চক্রের প্রধানসহ আট সদস্যকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। গ্রেফতারকৃতরা প্রথমে মোটা অঙ্কের টাকা বহনকারী ব্যক্তিকে টার্গেট করে ডিবি পুলিশ পরিচয়ে গাড়িতে তুলে নেয়। এরপর তার কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিয়ে ছেড়ে দেয়। টাকা দিতে রাজি না হলে হত্যার চেষ্টা করে। মঙ্গলবার পিবিআই প্রধান ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার ধানমন্ডির নিজ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এমনটাই জানান।
ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার বলেন, গত ২৫ অক্টোবর মোস্তাফিজুর রহমান ও তার বন্ধু পলাশ বেলা তিনটার দিকে রাজধানীর পল্টন থেকে খিলক্ষেতের বাসায় যাওয়ার জন্য সুপ্রভাত বাসে ওঠেন। বাসটি নর্দ্দা যাওয়ার পর চারজন ডিবির জ্যাকেট পরিহিত অবস্থায় রাস্তায় মোটরসাইকেল রেখে বেরিকেড দেয়। বাসটি থামলে সঙ্গে সঙ্গে তারা বাসে ওঠে। বাসের ভেতরে দুইজন পুলিশ সদস্য পোশাক পরিহিত অবস্থায় বসে ছিলেন। তাদের ধমক দিয়ে ভুয়া পুলিশ কর্মকর্তারা বলেন, ডিউটি বাদ দিয়ে কোথায় যাচ্ছো? এমন ধমকে পুলিশ সদস্যরা স্যার স্যার বলেন। এতে করে ডাকাতদের কাজটি আরো সহজ হয়ে যায়। এরপর ডাকাতরা টার্গেটকৃত মোস্তাফিজ ও তার বন্ধু পলাশ ইয়াবা ব্যবসায়ী ও ইয়াবাসেবী বলে গাড়ি থেকে নামিয়ে নেয়। তাদের হাতে ওয়্যারলেস সেট ছিল। পলাশকে চড়-থাপ্পড় দিয়ে তার পকেটে থাকা ১৫ হাজার টাকা ও মোবাইল ফোন নিয়ে নেয়। আর মোস্তাফিজের পকেটে থাকা ৪২ হাজার টাকা, দুইটি মোবাইল ফোনসহ প্রায় দেড় লাখ টাকার জিনিসপত্র নিয়ে নেয়। পলাশকে পরে ছেড়ে দেয়। আর মোস্তাফিজকে গাড়িতে তুলে গুলশান, বাড্ডা, হাতিরঝিল এলাকায় ঘুরতে থাকে। বেলা পৌনে চারটার দিকে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানাধীন বিএসটিআই মোড়ের ফাঁকা জায়গায় তারা দাঁড়ায়। মোস্তাফিজের কাছে থাকা ব্যাগটি নেওয়ার চেষ্টা করে। তার ব্যাগে ১৩ লাখ টাকা ছিল। ব্যাগ দিতে রাজি না হলে টিম প্রধান তাকে হত্যা করতে নির্দেশ দেয়। এমন নির্দেশের পর একজন ছুরি বের করে তার গলায় ধরে। এ সময় তার চিত্কারে আশপাশের মানুষ ডাকাতদের ধাওয়া করে। সবাই পালিয়ে গেলেও ছুরি ধরা সেই ডাকাত জনতার হাতে ধরা পড়ে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদেই বেরিয়ে আসে পুলিশ সেজে ডাকাতির এমন চাঞ্চল্যকর ঘটনা।
বিষয়টি তদন্ত করে গত ১৯ নভেম্বর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে বাহাদুর শাহ পার্ক এলাকায় ঢাকা মেট্রোর বিশেষ পুলিশ সুপার আবুল কালাম আজাদের সার্বিক তত্ত্বাবধায়নে পিবিআই ঢাকা মেট্রোর পুলিশ পরিদর্শক মনিরুল ইসলাম, জুয়েল মিঞা, হুমায়ূন কবির, এসআই ফরিদ ফোর্সসহ অভিযান চালিয়ে ডাকাত দলের প্রধান সহকারী পুলিশ কমিশনার পরিচয়দানকারী একেএম রানা ও তার সহযোগী পুলিশ কর্মকর্তা পরিচয়দানকারী দেলোয়ার হোসেন, সোহাগ খন্দকার, জাবেদ আহমেদ ওরফে বাবু, বুলবুল আহমেদ, নাজমুল হোসেন, আসাদুজ্জামান ও হারুন ওরফে হিরাকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের কাছ থেকে চারটি মোটরসাইকেল, ৩টি অয়্যারলেস সেট, একজোড়া হ্যান্ডকাফ, দুইটি খেলনা পিস্তল ও দুইটি ধারালো ছুরি উদ্ধার হয়।
পিবিআই প্রধান জানান, ডাকাত দলের নিজস্ব সোর্স আছে। সোর্সদের লুণ্ঠিত টাকার শতকরা ৪০ শতাংশ দিতো গ্রেফতারকৃতরা। ডাকাত দলের সদস্য হারুন ওরফে হিরা ৪ মামলায় ১৪ বছর জেল খেটেছে। জাবেদ আহমেদ ওরফে বাবু ঢাকার বংশাল থানার ৫টি মাদক মামলার আসামি। দলের নেতা রানা ভুয়া পুলিশ কর্মকর্তা সেজে দীর্ঘদিন ধরে এভাবেই ডাকাতি করে আসছিল। পুরনো ঢাকায় দু্ইটি বাড়ির মালিক রানা। ঢাকায় এমন আরো ৭টি চক্র আছে। যারা পুলিশ পরিচয়ে ডাকাতির সঙ্গে জড়িত।
সংবাদ সম্মেলনে পিবিআইয়ের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. সায়েদুর রহমান, বিশেষ পুলিশ সুপার আহসান হাবিব পলাশ, আসাদুজ্জামান আজাদ, আবুল কালাম আজাদ, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বশির আহমেদ ও মিনা মাহমুদাসহ ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
