সিপিডির সংলাপে বিদ্যুত্ প্রতিমন্ত্রী

জ্বালানি খাতে অর্থায়ন ঘাটতি মেটাতে ‘এনার্জি পাওয়ার বন্ড’ ছাড়ার পরিকল্পনা

আপডেট : ১০ মার্চ ২০১৯, ২১:১৯

বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে স্বচ্ছতা বাড়াতে তাগিদ দিয়েছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সেইসাথে বিদ্যুত্ খাতে এলএনজি ব্যবহারের ভারসাম্য, বেসরকারি একক প্রতিষ্ঠানের উপর নির্ভরতা হ্রাস, প্রতিবেশী দেশসমূহ থেকে বিদ্যুত্ ও জ্বালানি আমদানির ভারসাম্য প্রতিষ্ঠায় তাগিদ দেওয়া হয়েছে। দক্ষতা বৃদ্ধি, অনিয়ম ও দুর্নীতির মতো বিষয়ে যে ঘাটতি রয়েছে সেটি দূর করতে গুরুত্ব দিয়েছে সংস্থাটি। গতকাল রাজধানীর গুলশানের একটি মিলনায়তনে বিদ্যুত্ ও জ্বালানি খাতে বর্তমান অবস্থা ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে আয়োজিত এক সংলাপে সিপিডি এই তাগিদ দিয়েছে।

সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মুস্তাফিজুর রহমানের সঞ্চালনায় আয়োজিত সংলাপে প্রধান অতিথি ছিলেন, বিদ্যুত্, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ। প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর ড. ম. তামীম, ঢাবি অধ্যাপক বদরুল ইমাম, ক্যাবের উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম। সভাপতিত্ব করেন সিপিডির চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেহমান সোবহান। মূল উপস্থাপনায় সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম উল্লেখ করেন, স্বল্পমেয়াদি ব্যবস্থা থেকে দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুত্ উত্পাদন ব্যবস্থায় গুরুত্ব দিতে হবে। বিদ্যুতের ঘাটতি মোকাবিলায় ২০১০ সালে নেওয়া জরুরি ব্যবস্থাপনা হতে বর্তমান বাজারভিত্তিক ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যুত্ উত্পাদন ব্যবস্থায় ভারসাম্য আনতে হবে। বিদ্যুত্ জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্নীতি ও অনিয়ম নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেন, টেকসই উন্নয়নের জন্য বিদ্যুত্ ও জ্বালানি প্রয়োজন। বাংলাদেশ বিদ্যুত্ খাত অনেক এগিয়েছে কিন্তু এই খাতে স্বচ্ছতার ঘাটতি রয়েছে। ক্ষমতাধর ব্যক্তিরা তাদের কাছের লোকদের সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এই খাতে স্বচ্ছতা বাড়ানো এবং বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে দরকষাকষির ক্ষমতা বাড়াতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সময়মতো প্রকল্প বাস্তবায়ন। বড় প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে বিলম্ব হওয়ায় ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। ভারতসহ অন্যান্য দেশে বিদ্যুত্ উত্পাদনে কেমন খরচ হচ্ছে সেটি বাংলাদেশে প্রকল্প গ্রহণের সময়ও বিবেচনায় নিতে হবে।

ড. ম. তামীম বলেন, সরকার যে পরিকল্পনা নিয়ে এগুচ্ছে তাতে আমাদের ৯০ ভাগ জ্বালানি হবে আমদানিনির্ভর। নতুন তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্স এর সক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে। এই খাতে দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ, প্রযুক্তির ব্যবহার ও সক্ষমতা বাড়ানোর তাগিদ দেন তিনি।

অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম বলেন, আইনি কাঠামোর ব্যত্যয় ঘটিয়ে আবারো গ্যাসের দাম বাড়ানোর জন্য শুনানির আয়োজন করা হচ্ছে। ভারত যে এলএনজি ৬ ডলারে আমদানি করছে বাংলাদেশ কেন সেটি ১০ ডলারে আমদানি করবে? বাড়তি ভর্তুকি মেটাতে আবারো গ্যাসের দাম বৃদ্ধি করার প্রস্তাব করা হচ্ছে। গ্রাহক পর্যায়ে গ্যাস দেওয়ার আগেই দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হচ্ছে যেটি যৌক্তিক নয়।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিদ্যুত্ জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, জ্বালানি খাতে আমরা যে ভর্তুকি দেই তার তিনগুণ ইতিবাচক প্রভাব অর্থনীতিতে পড়ছে। আওয়ামী লীগ সরকার বিদ্যুত্ খাতে জোর দেওয়ায় আজ আস্থার জায়গা তৈরি হয়েছে। সৌদিআরবের মতো দেশ ১৫ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ নিয়ে আসছে। তিনি বলেন, ৬০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদনে ২০৪০ সালের মধ্যে ৭১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন। ২০৪১ সালের উন্নত বাংলাদেশ গঠনে বিদ্যুত্ ও জ্বালানি খাতে চ্যালেঞ্জগুলোর অন্যতম অর্থায়ন, পরিকল্পনা, সক্ষমতা বৃদ্ধি ও যথাযথ প্রযুক্তির ব্যবহার। তিনি জানান, জ্বালানি খাতে অর্থায়ন বাড়াতে ‘এনার্জি পাওয়ার বন্ড’ ছাড়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এর আকার প্রাথমিক পর্যায়ে ২ বিলিয়ন ডলার হতে পারে। তাছাড়া প্রতিবেশী দেশ হতে আরো দুই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুত্ আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি দাবি করেন, বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে জ্বালানির দাম অনেক কম। তাই এটি সমন্বয় করতে হবে। জ্বালানি খাতে দুর্নীতি কমেছে দাবি করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, আগে ৪৪ শতাংশ সিস্টেম লস ছিল, এখন এটি ১১ শতাংশে নেমে এসেছে। উন্নত বিশ্বে ৬ থেকে ৭ শতাংশ হয় সিস্টেম লস। ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম অঞ্চলে এই হার ৭ শতাংশে নেমে এসেছে। এই খাতের অবস্থা আরো উন্নত করতে পুরোপুরি ডিজিটাল করা হবে, উল্লেখ করেন তিনি।