চলচ্চিত্র কারখানার সংস্কার প্রয়োজন

আপডেট : ১১ মার্চ ২০১৯, ২১:১২

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের পূর্বের ন্যায় আর সুদিন নাই। নির্মিত চলচ্চিত্রের সংখ্যা কমিয়াছে, বন্ধ হইয়াছে বহু প্রেক্ষাগৃহ। অন্যদিকে প্রযুক্তির কল্যাণে উত্পাদন-বিপণনে আসিয়াছে ব্যাপক পরিবর্তন, আবার প্রযুক্তির কারণেই চলচ্চিত্র উপভোগের ধরন পাল্টাইয়া গিয়াছে। একসময় এমন লোক খুঁজিয়া পাওয়া যাইত না, যিনি প্রেক্ষাগৃহে গিয়া চলচ্চিত্র দেখেন নাই। আর এখন এমন বহু মানুষ পাওয়া যাইবে যাহারা কখনোই প্রেক্ষাগৃহে গিয়া চলচ্চিত্র দেখেন না। পরিস্থিতি যেইভাবে পাল্টাইয়াছে, আমরা সেইভাবে পাল্টাইতে পারি নাই। নূতন সময়ের উপযোগী চলচ্চিত্র নির্মাণে আমরা ব্যর্থ হইয়াছি। এইরূপ প্রেক্ষাপটে ইত্তেফাকে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে যে, এখন আর সেইভাবে কালজয়ী অভিনেতা-অভিনেত্রী তৈরি হইতেছে না। একসময় বহু অভিনেতা-অভিনেত্রীকে মানুষ একনামে চিনিত, কিন্তু এখন সেই মাপের তারকা নাই বলিলেই চলে। পূর্বে একজন তারকা গড়িয়া উঠিতে অনেক সময় লাগিত, তিনি টিকিয়াও থাকিতেন বহুদিন। কিন্তু এখন প্রচারমাধ্যমের ব্যাপকতার কারণে তারকাখ্যাতি যেমন দ্রুত পাওয়া যায়, তেমনি হারাইয়া যাইতেও সময় লাগে না। কালজয়ী অভিনেতা-অভিনেত্রী- হইতে প্রয়োজন প্রতিভার পাশাপাশি পরিশ্রম ও গভীর অভিনিবেশ। কিন্তু বর্তমান সময়ে খ্যাতির লোভ এড়াইয়া অভিনয়ে মনোযোগী হওয়া অথবা অভিনয়ে পরাকাষ্ঠা অর্জনের সুযোগ কমিয়া গিয়াছে।

তবে প্রতিভার পাশাপাশি পরিশ্রমে নিষ্ঠাবান হওয়ার পরও একজনের পক্ষে কালজয়ী অভিনেতা হইবার সুযোগ নাও আসিতে পারে। উন্নতমানের চলচ্চিত্র নিয়মিত নির্মিত না হইলে এবং দর্শকের নিকট চলচ্চিত্রের চাহিদা দস্তুরমতো না থাকিলে কালজয়ী অভিনেতা তৈরি হইবে কোথা হইতে? আশির দশকে ভিসিআর-ভিসিপি, নব্বই দশকে স্যাটেলাইট টেলিভিশন ও সিডি-ডিভিডি এবং নূতন শতকে ইন্টারনেট স্ট্রিমিংয়ের কারণে দর্শকের বাংলা ও অন্যান্য ভাষার চলচ্চিত্রদর্শন বরং বৃদ্ধি পাইয়াছে, কিন্তু প্রেক্ষাগৃহে গিয়া নিজস্ব চলচ্চিত্র দেখিবার বিষয়টি ক্ষতিগ্রস্ত হইয়াছে। চলচ্চিত্র কারখানা রুগ্ন হইয়া পড়িয়াছে। এই রুগ্নতার কারণেও অভিনেতাদের কালজয়ী হইয়া উঠিবার সুযোগই কমিয়া গিয়াছে। আমরা বলিতে পারি, চলচ্চিত্র কারখানার উন্নতি হইলে অভিনেতারাও নিজেদের প্রতিষ্ঠা করিবার সুযোগ পাইবেন। কাজ করিতে হইবে সেই স্থলে। আমাদের মানিয়া লইতে হইবে, পূর্বের ন্যায় প্রেক্ষাগৃহেই কেবল চলচ্চিত্র চলিবে না, প্রেক্ষাগৃহের বাহিরেও চলচ্চিত্রের অবস্থান খুঁজিয়া পাইতে হইবে। আবার প্রেক্ষাগৃহগুলিকেও পূর্বের ন্যায় রাখিলে চলিবে না, প্রেক্ষাগৃহগুলিকে হইতে হইবে আকর্ষণীয় ও নিরাপদ। পুরা বিশ্বেই একক পর্দার বিশাল প্রেক্ষাগৃহের পরিবর্তে কয়েক পর্দার ছোট ছোট প্রেক্ষাগৃহ বা মাল্টিপ্লেক্সের ধারণা প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে। আমাদেরও তাহাই করিতে হইবে। কারণ ইতোমধ্যে দর্শকের রুচি পরিবর্তিত হইয়াছে। আবার প্রেক্ষাগৃহের বাহিরে নেটফ্লিক্সের মতো অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলিতে চলচ্চিত্র বিক্রি করিতে হইবে। বিদেশে অবস্থানরত বাঙালি এবং অবাঙালি দর্শককে মাথায় রাখিয়া আন্তর্জাতিক মানের চলচ্চিত্র নির্মাণ করিয়া রফতানি করিতে হইবে। বহু দেশের চলচ্চিত্র দেখিয়া স্থানীয় দর্শকেরও চোখ খুলিয়া গিয়াছে। বিদ্যমান নির্মাতাদের পাশাপাশি ফিল্ম ইন্সটিটিউট ও অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হইতে শিক্ষিত নির্মাতারা বাহির হইতেছেন। তাহারা চলচ্চিত্রের দৃশ্যপট পরিবর্তনে ভূমিকা রাখিবেন, এমন আশাবাদ আমরা ব্যক্ত করিতে পারি। এইভাবে চলচ্চিত্র কারখানায় গতিশীলতা আসিলে, প্রতিভাবান অভিনেতা-অভিনেত্রীরা কালজয়ী হইয়া উঠিবার সুযোগ পাইবেন। এইক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকা হইতে হইবে অনুঘটকের।