বাংলার নারী এগিয়ে যাচ্ছে আরও এগিয়ে যাক

আপডেট : ১১ মার্চ ২০১৯, ২১:১২

 মেয়েটির নাম বৃষ্টি। বাবা-মা’র মনে বড় আশা, বৃষ্টি বড় হয়ে আলো ছড়াবে। পত্রিকায় দেখলাম, কোনো এক বুধবারে আলোর দ্যুতি ছড়িয়ে ফুটফুটে মেয়েটি মায়ের কোল জুড়ে এসেছিল। ২০১৯-এর ২০ ফেব্রুয়ারি বুধবারে কেমিক্যালের গুদামে লাগা আগুনে লণ্ডভণ্ড হয়ে যাওয়া পুরনো ঢাকার চুড়িহাট্টার রাস্তায় হাঁটছিল বৃষ্টি; ৬ মার্চ আরেক বুধবারে বৃষ্টির ভস্মীভূত দেহটি মিললো মেডিক্যালের মর্গে। বৃষ্টি পুড়লো কতিপয় লোভী ব্যবসায়ীর লোভের আগুনে, নিজ বাড়ি থেকে মাত্র চার মিনিট দূরত্বের রাস্তায়।

মা-বাবার আশা ভেঙেছে, স্বপ্ন ভেঙেছে। কিন্তু মেয়েটা বেঁচে থাকলে কী হতো? মা-বাবা কি পারতেন মেয়েটাকে সমাজের প্রতিটি রন্ধ্রে শক্ত করে গেঁড়ে বসা বৈষম্য ও নিপীড়ন থেকে সুরক্ষা দিতে? তার জীবনটা কি তার নিজের থাকতো? যা তার করতে ইচ্ছে করে তা করার স্বাধীনতা কি সে পেতো? গত ৮ মার্চ পালিত হলো বিশ্ব নারী দিবস। পালিত হচ্ছে অনেক বছর ধরে। যে নারীদের নিয়ে আমরা কথা বলছি তারা কারা? তারা কোনো পুরুষের মা কিংবা বোন অথবা স্ত্রী বা কন্যা। জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে সব পুরুষকেই ঘিরে থাকে প্রথমে তার মা, সংস্রব থাকে বোনের, এরপর তার স্ত্রী এবং একসময় ভাগ্যবান হলে কন্যা আর পুত্রবধূ। দুর্ভাগা পুরুষদের— ভাগ্যে থাকে শুধুই মা। চরম হতভাগাদের মা-ও থাকে না; মা চলে যায় বৃদ্ধাশ্রমে বা অন্যের আশ্রয়ে তারই নির্যাতনের কারণে।

একটা সময় ছিল যখন সমাজে বিশাল দাপট আর সম্মান ছিল যৌথ পরিবারের। যৌথ পরিবার ছিল আভিজাত্যের প্রতীক। বাবা-মা-চাচা-চাচি, দাদা-দাদি, ভাই-ভাবী নিয়ে গঠিত যৌথ পরিবারের সবাই থাকতো এক সূতোয় গাঁথা। একের সুখে অন্যরা সুখী, একের দুঃখে অন্যরা দুঃখী। এভাবে সুখ-দুঃখের মালা গাঁথা হতো নিত্যদিন। এতেই ছিল নিত্যানন্দ। ধীরে ধীরে ভাঙতে থাকলো যৌথ পরিবারের বন্ধন। ছোট পরিবারে বাড়তে থাকলো এককেন্দ্রিক মানসিকতা। বৃদ্ধা মাকে বোঝা মনে করতে থাকে নাদান পুরুষেরা। কন্যাকে মনে করে শুধুই খরচের বিষয়, মনে করে না এরা হতে পারে সম্পদ। তারা ভুলে যায়, একটি বৃক্ষের কাণ্ড আর শাখা উভয়েই উভয়ের পরিপূরক। নারী পুরুষের সাথে আর পুরুষ নারীর সাথে সমানতালে এগিয়ে না গেলে কোনো পরিবার, সমাজ আর জাতি কখনও এগুতে পারে না। পদে পদে খাবে হোঁচট।

সমাজে আজ কী ঘটছে? পুরুষ নারীকে হয়রানি করছে। পুরুষ নিচ্ছে যৌতুক আর নারী মরছে যৌতুকের আগুনে। আড়ালে থেকে যৌতুকের জন্য চাপ দিচ্ছে বাবা-মা-চাচা-চাচিরা আর ইন্ধন জোগাচ্ছে বোন-খালা-মামিরা। নিপীড়ন আর স্বার্থের ব্যাপারে নারী-পুরুষ এক কাতারে। পত্রিকার পাতা উল্টালেই দেখা যায়, বাবা-মা তালাকের মহড়ায়। ছোট্ট শিশুরা কাঁদছে বাড়ির আঙ্গিনায়। তালাকের মাতম গ্রামেগঞ্জে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় বছরে সারা দেশে তালাকের হার ৩৪ শতাংশ বেড়েছে। শুধু রাজধানীতেই সিটি কর্পোরেশন এলাকায় কমপক্ষে ৫০ হাজার তালাকের আবেদন জমা পড়েছে, যার সাদামাটা অর্থ দাঁড়ায়, প্রতি এক ঘন্টায় একটি তালাকের আবেদন। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনে শুধু ছয় মাসে ২৫৩২টি আবেদন জমা পড়েছে। কী হারে সংসার ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে তা ভাবলেও আতঙ্কিত হতে হয়। ভবিষ্যতের দুর্যোগের কথা ভাবছে না কেউ। 

নারী প্রহার কোনো কোনো পরিবারে নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। পান থেকে চুন খসলেই প্রহার। নিজের পুত্র কন্যাসহ পরিবারের সবার সামনে বীরত্ব ফলায় পুরুষ। এতে হারিয়ে যাচ্ছে পরিবারের ভেতর আত্মসম্মানবোধ আর লাজলজ্জা। সম্মানহানিকর শব্দের ব্যবহার তো চলছে প্রকাশ্যেই। অ্যাকশন এইডের এক সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা যায়, অধিকাংশ নারী অশ্রাব্য শব্দের কবলে থাকে নিত্যদিন। বহু নারীর স্বস্তি নেই বাড়িতে, নেই রাস্তাঘাটে— পরিবহনে। কর্মস্থলে নারীর যৌন হেনস্থা আজকাল ওপেন সিক্রেট, সব সমাজে, সব দেশে। একাধিক সমীক্ষাতেও উঠে এসেছে এসব কথা। কর্মস্থলে নারী নির্যাতন রুখতে হবে এখনই। বিগত কয়েক বছরে নারী শিক্ষায় বিশাল অগ্রগতির কারণে নারী কর্মীর সংখ্যা বাড়ছে দ্রুতগতিতে। এ গতি যেন বন্ধ না হয়ে যায় কর্মস্থলে হেনস্থার কারণে। সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি আইনের প্রয়োগ করতে হবে কঠোরভাবে। হেনস্থাকারীদের সামাজিক বিচারেরও মুখোমুখি করতে হবে শক্ত হাতে।

ছেলেরা খেলার মাঠে যাচ্ছে, খেলছে, পুকুর নদীতে সাঁতার কাটছে, আমতলা-জামতলায় আড্ডা দিচ্ছে। কেউ কিছু বলছে না। মেয়েরা এমনটি করলে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে কেন? শালীনতা নিয়ে বাড়াবাড়ি করা হয় নারীদের ক্ষেত্রে। শালীনতা কি শুধু নারীদের জন্য?  পুরুষকেও শালীন থাকতে হবে সমভাবে। শাড়ির আঁচল একটু খসে পড়লে নারীর আর রক্ষা নেই। অথচ পুরুষ খালি গায়ে প্রকাশ্যে ঘুরছে নারীদের সামনে। তার অপরাধ ধরা হচ্ছে না কেন? যৌনতা কেবল নারীর শরীরে? অপরাধ সমচোখে দেখা না হলে অপরাধ ভিন্ন রূপে সমাজকেই বিক্ষত করবে।

পুরুষের দু’নয়ন যদি লালসাভরা না হয়, অশ্লীলতার মোহে আবদ্ধ মন যদি দু’চোখে মন্দ ভাব না আনে, অন্তরে যদি ইবলিশের বসবাস না থাকে, মনের গহীনে যদি ‘আপন’ মা আর বোনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থাকে, তাহলে তো সকল নারীই পুরুষের পাশাপাশি সব কাজই করতে পারে। সকল নারীরই বাবা আছে, ভাই আছে। তাদের অন্তরেই-বা ইবলিশের আসা-যাওয়া থাকবে কেন? কারও না কারও অসত্ স্বার্থ হাসিলের জন্য সিজোফ্রেনিয়া রোগাক্রান্ত নারীকে জ্বীনে ধরেছে বলে জ্বীন-তাড়ানোর নামে মারধরের উর্দির নিচে থাকে যৌন-নিপীড়নের অশুভ হাত। সমাজ শুধু তাকিয়েই থাকে। জ্বীন-ভূতের আড়ালে নারী নির্যাতনের পেছনে হাত থাকে অন্য নারী আর পুরুষের। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সঠিক শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে না পারলে এ ধরনের নির্যাতন দূর করা অসম্ভব।

অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, নারীই হয় নারীর শত্রু। নারীরাই নারীদের উপর নির্যাতন করে বেশি। স্কুল জীবনে নিজের গ্রামে আর আশেপাশের গ্রামে দেখেছি ভয়াবহ ‘বৌ’ নির্যাতন। শারীরিক/মানসিক নির্যাতন চালায় স্বামী কিন্তু পর্দার অন্তরালে গুটি নাড়ায় মূলত বৌ-বিদ্বেষী মা আর বোন কিংবা অন্য কোনো কুটনি প্রতিবেশী। অনেক নারীকেই দেখেছি, ছেলে-বৌকে মনে করে প্রতিপক্ষ— ঝগড়া লাগানোর জন্য মুখিয়ে থাকে। বৌটি যদি নিরীহ হয়, সব সহ্য করে মুখ বুঁজে। একদিন সংসারটাই ভেঙে যায় অনেকের। সন্তানরা যায় উচ্ছন্নে আর পুরুষ আশ্রয় খোঁজে অন্য নীড়ে; সর্বহারা নারীটি বনে যায় ‘কাজের মানুষ’ কিংবা বাঁচার জন্য বেঁচে নেয় কোনো হীন কাজ।

মঙ্গা-দুর্ভিক্ষ-আকালে-যুদ্ধে প্রথমেই বিধ্বস্ত হয় নারী। পুরুষ বেঁচে যায় পালিয়ে, নারীকে ছেড়ে দিয়ে। যুদ্ধ-বিগ্রহে নারী বরণ করে দাসত্ব, হারায় সতীত্ব, পাচার হয়ে যায় অন্য দেশে, চির-যন্ত্রণার গভীরে তলিয়ে যায় স্বামী-সন্তান সব কিছু। সুখের সময় স্বামী খায় আগে, নারী খায় পরে। মাছের মুড়োটা স্বামী আর ছেলের, মাংসল অংশটা দেবর-ভাসুরের বা শ্বশুরের, লেজটা শুধু নারীর। লেজ পেয়েই ধন্য নারী খাটে সারাদিন।

ঘুণেধরা এই পুরুষতান্ত্রিকতা নিপাত যাক। নারী দিবসের অনুশীলন হোক প্রতিদিন। বাংলার নারী এগিয়ে যাচ্ছে। আরও এগিয়ে যাক। প্রতিটি দিনই আমরা স্ত্রী-কন্যা নিয়ে ভালোবাসার সংসার গড়বো, মা-বাবাকে নিয়ে সুখের গল্প করবো, আশেপাশের নারী-পুরুষ সবাইকে নিয়ে হৈ-হুল্লোড় করবো আর ৬০/৭০ বছরের ছোট্ট জীবন-সংসারে স্বর্গ নামিয়ে আনবো। পিতৃতান্ত্রিক, মাতৃতান্ত্রিক, পুরুষতান্ত্রিক, নারীতান্ত্রিক শব্দগুলো উধাও হয়ে যাক অভিধান থেকে, সবগুলো এক হয়ে হোক সমতান্ত্রিক। নারী-পুরুষ দুয়ে মিলে চালাবো পরিবার এবং সমাজ। কেউ কাউকে ফেলে দেবো না পেছনে, চলবো সমানতালে সামনে। একসাথে এগিয়ে যাবো ভবিষ্যতের পানে। টেকসই করবো আমাদের কষ্টেগড়া উন্নয়ন।

n লেখক:  উপাচার্য, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়