শিক্ষাব্যবস্থা আজ নীলক্ষেতভিত্তিক হয়ে পড়েছে। যার ফলে প্রকৃত জ্ঞানের চর্চা ও মেধার বিকাশ থেকে ছাত্রছাত্রীরা অনেক দূরে আছে। মেধাবীরা পেছনে পড়ে আছে মুখস্থবিদ্যা নামক পাঠশালার কাছে। যেখানে একজন লেখকের পাঠ্যবই মুখস্থ করে পাস করা হয় সেখানে মেধা বিকাশের কোনো সম্ভাবনা থাকে না বরং মেধাবীদেরকে গলাটিপে হত্যা করা হয়। আর এই পাসকে শিক্ষার্থীর জ্ঞানের পাস বলা যাবে না, বলা যেতে পারে লেখকের জ্ঞান চুরি করে পাস যা নকলযুক্ত পাস।
গবেষণাভিত্তিক লেখাপড়ার আজ বড়ই অভাব। শিক্ষকও নতুন কিছু আশা করেন না। আর শিক্ষার্থীরা তো মুখস্থের দিকে আছে। আইনানুযায়ী নকল করা দণ্ডনীয় অপরাধ কিন্তু কোনো লেখকের পাঠ্যবই মুখস্থ করে পাস করার জন্যে কোনো প্রকার শাস্তির ব্যবস্থা আমাদের দেশে নাই। অথচ উন্নত দেশগুলোতে অন্যের লেখা মুখস্থ ও কপি করে লেখাকেই অপরাধ হিসাবে গণ্য করা হয়ে থাকে। উদাহরণস্বরূপ আমি যুক্তরাজ্যের কথা বলবো। যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব সান্ডারল্যান্ড থেকে ব্যাচেলর এবং কেন্টবারী কেরিস চার্চ ইউনিভার্সিটি থেকে মাস্টার্স শেষ করেছি। এদেশের শিক্ষা আইন অনুযায়ী কোনো শিক্ষার্থীর লেখার মাঝে যদি ২৫% plagiarism ধরা পড়ে তাহলে ঐ শিক্ষার্থীর পরীক্ষা বাতিল হতে পারে। আর যদি ৫০%-এর বেশি হয় তবে ঐ শিক্ষার্থীকে ডিসিপ্লিন অফিসে ব্যাখ্যা দিতে হয় কেন সে কপি করেছে এবং ঐ শিক্ষার্থীর স্টুডেন্টশিপ বাতিল হতে পারে। যার ফলে প্রতিটা ক্লাস হতে প্রতিটা স্টুডেন্ট একজন গবেষক হিসাবে বের হয়ে আসে। যার ফলে ঐ শিক্ষার্থীরা স্বনির্ভরশীলতার দিকে এগিয়ে যায়। একইভাবে ইউ.এস.এ, কানাডা, নিউজিল্যান্ড ও ইউরোপের দেশগুলোতে একই নিয়ম চালু আছে। শিক্ষার্থীরা শুধুমাত্র রেফারেন্স হিসাবে লেখকের লেখা থেকে ধারণা নিতে পারবে তবে পুরোপুরিভাবে মুখস্থ কিংবা কপি করতে পারবে না। আমি এখানে একটু plagiarism এর সংজ্ঞা দিব। Plagiarism হলো অন্যের লেখা বা আইডিয়াকে নিজের লেখা বা আইডিয়া বলাকে plagiarism বলে। এই সংজ্ঞানুযায়ী বাংলাদেশের মুখস্থবিদ্যাকে ১০০% plagiarism বলা যেতে পারে। কারণ নোট ও গাইড বুক হতে সবাই পাস করে থাকে। ফলে শিক্ষার্থীদের মাঝে মেধা চুরি ও অলসতার প্রবণতা খুব বেশি যা শিক্ষার মানকে নিম্নের দিকে নিয়ে যায়। শিক্ষার গুণগত মানকে বাড়াতে হলে মুখস্থ ও গাইডভিত্তিক শিক্ষাকে না বলতে হবে এবং শিক্ষার্থীদেরকে গবেষণামূলক শিক্ষার দিকে আনতে হবে। গবেষণামূলক শিক্ষার ফলে শিক্ষার্থীদের মাঝে নতুন নতুন আইডিয়া আসবে যা দেশ ও জাতির জন্য উপকারী। এই শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশ থেকে লাখ লাখ তরুণ গবেষক বের হবে, ফলে দেশ ও দেশের বাইরে তাদের গবেষণা কাজে লাগিয়ে দেশের সুনাম ও অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে সম্ভব হবে। উন্নত দেশগুলোতে ১৫-১৬ বছর বয়সে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন জায়গায় পার্ট-টাইম জব করে থাকে।
পরিবার স্কুল-কলেজ থেকে তাদেরকে স্বনির্ভরশীলের দিকে এগিয়ে নিতে উত্সাহিত করে থাকে। ফলে শিক্ষার্থীরা কম বয়সে সব রকম মানুষের আচরণ ও উঠা-বসার নিয়ম-কানুন ও নেতৃত্বের গুণাবলিগুলো শিখে নেয়, যা পরিবার, সমাজ ও দেশের জন্য উন্নয়নের পথে কাজ করে থাকে। অপরদিকে আমাদের দেশের শিক্ষার্থীদের মাঝে কোনোপ্রকার পার্ট-টাইম জবের চিন্তাও দেখা যায় না, ফলে শিক্ষার্থীদেরকে টাকার জন্য পরিবারের উপর নির্ভর করে থাকতে হয়। নিজের অভিজ্ঞতার কথা একটু বলি— আমি যখন London-এ লেখাপড়া করেছি সমস্ত পড়া ক্লাসেই বুঝিয়ে দেয়া হতো, যদি কোনো স্টুডেন্ট না বুঝে থাকে তাহলে টিচার এর অফিস টাইমে গিয়ে সেটা নিয়ে আলোচনা করতে পারে বা ই-মেইলের মাধ্যমে তার সমাধান করতে পারে, যার ফলে শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের মাঝে সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। অথচ আমাদের দেশের কিছু সংখ্যক শিক্ষক আজ শিক্ষাকে বাণিজ্যের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। স্কুলের শিক্ষকের কাছে কোচিং না করলে নম্বর কম দেয়ার কথা নতুন নয়। যার ফলে ছাত্র-শিক্ষকের সুসম্পর্ক আর দেখা যায় না। শিক্ষককে গবেষণামূলক কাজের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের উত্সাহিত করতে হবে। ইউরোপের দেশগুলোতে শিক্ষকদেরকে বছর শেষে পাবলিকেশনের সংখ্যা জমা দিতে হয়, যদি কোনো পাবলিকেশন না থাকে তাহলে পদায়নসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হয়। আমাদের দেশে একই ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতি করতে চাইলে গবেষণাভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থার কোনো বিকল্প নাই।
n লেখক : পিএইচডি শিক্ষার্থী, ইউনির্ভাসিটি অফ ওরোক্লো, পোলেন্ড
