অনিয়ম, বর্জনে ডাকসু নির্বাচন

আপডেট : ১১ মার্চ ২০১৯, ২২:৪৩

আগে থেকে ব্যালট বাক্স ভরে রাখা ও ভোট প্রদানে বাধা প্রদানের মাধ্যমে শুরু হয়েছিল বহু কাঙ্ক্ষিত ডাকসু নির্বাচন। মাঝপথে চলতে থাকে বিভিন্ন পক্ষের অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগ। ভোটের সঙ্গে নির্বাচনী কর্মকর্তাদের লাঞ্ছিত করা, প্রতিবাদ, বিক্ষোভ, ভাঙচুর, মিছিল, পুনঃভোট দাবি, ভিসি অফিস ঘেরাওয়ের মতো নানা ঘটনা ঘটেছে দিনভর। শেষ পর্যন্ত ছাত্রলীগ বাদে অন্য সকল পক্ষ নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভিসি অধ্যাপক আখতারুজ্জামান, প্রধান নির্বাচনী কর্মকর্তা ও ছাত্রলীগ নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে বলে দাবি করেছে।

ঘটনাবহুল এ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে সরকারি দল আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রলীগ। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে অবস্থান নিয়ে মিষ্টি বিতরণ এবং বিজয় মিছিল করেছে সংগঠনের নেতা-কর্মীরা। এদিকে, অনিয়মের প্রতিবাদ জানিয়ে নির্বাচন বর্জন ও ফল প্রত্যাখ্যান করেছে ছাত্রদল, কোটা সংস্কার আন্দোলনকারী এবং বাম ছাত্রসংগঠনগুলোর প্যানেলগুলো। পুনরায় তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচনের দাবি জানিয়েছে তারা।

গতকাল সোমবার সকাল আটটা থেকে দুপুর দুইটা পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভোট গ্রহণ করার কথা ছিল। সবগুলো আবাসিক হলে স্থাপিত ভোট কেন্দ্রে নির্ধারিত সময়ের আগে থেকেই ছিল দীর্ঘ লাইন। একজন শিক্ষার্থী কেন্দ্রীয় সংসদের ২৫টি পদে এবং হল সংসদের ১৩টি পদে ভোট প্রদান করতে পারেন। অর্থাত্ ৪৩ হাজার ভোটারের সকলকে মোট ৩৮টি পদে ওএমআর ফরমে ভোট দিতে হয়। এ ভোট দিতে কারো সময় লাগে প্রায় তিন মিনিট। কেউ সময় ব্যয় করেছেন ২০ মিনিটেরও বেশি। প্রতিপক্ষের ভোটারদের বাধা ও অনুত্সাহিত করতে কৃত্রিমভাবে এ সময়ক্ষেপণের পরিস্থিতি তৈরি করেছে হলগুলোতে শক্ত অবস্থানে থাকা ছাত্রলীগ। এ অবস্থায় অনেককেই ভোট না দিয়ে ফিরে যেতে দেখা যায়। ক্যাম্পাসের বাইরে থাকা শিক্ষার্থীদের অনেকে ভোট দিতে আসেননি।

ভোটকেন্দ্রের প্রবেশপথ ছিল ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রণে: নির্বাচনে ভোটের ব্যবস্থাপনার বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল- হলে বা ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ গেটের নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে থাকবে। তবে গতকাল সবগুলো হলে দেখা যায়, গেটে হলের কর্মচারীরা থাকলেও আইডি কার্ড পরীক্ষা ও হল পরিদর্শনকারীদের পরিচয় যাচাই করছেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা।

ভোট দিতে এসে মারধর ও হুমকির শিকার: ভোট দিতে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছেন ছাত্রদলের সূর্যসেন হল শাখার যুগ্ম আহ্বায়ক শামীম আক্তার শুভ। গতকাল দুপুর ১২টার দিকে সূর্যসেন হলে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মী শাহ আলম, তাকি, রাতুলের নেতৃত্বে তার ওপর হামলা চালানো হয়। শিক্ষার্থীরা তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে। পরে তাকে কাকরাইল ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।

এদিকে ভোটকেন্দ্রে শিক্ষার্থীদের ভোট দিতে বাধার তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে সলিমুল্লাহ হলে (এসএম হল) ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের মারধরের শিকার হয়েছেন দৈনিক আমাদের সময়ের স্টাফ রিপোর্টার হাবিব রহমান। বঙ্গবন্ধু হল, জিয়া হল, বিজয় একাত্তর হল, সূর্যসেন হল, হাজী মুহাম্মদ মুহসিন হল এবং ফজলুল হক হলে ভোট দিতে গিয়ে কয়েকজন শিক্ষার্থী মারধর ও হুমকির শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন। তারা ভোট না দিয়েই ফিরে এসেছেন বলে জানান। একই অভিযোগ এনে এবং এর প্রতিবাদ জানিয়ে ভোট দেননি ছাত্রদল মনোনীত ডাকসু ভিপি প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান।

সময় যায়, লাইন এগোয় না: সুফিয়া কামাল হলের শিক্ষার্থী নাসরিন সুলতানা সকাল ১০টায় ভোটের লাইনে দাঁড়িয়ে দুপুর সোয়া ১২টায়ও বুথে প্রবেশ করতে পারেননি। হল গেটের বাইরে লাইনে দাঁড়ানো এ ছাত্রী সোয়া দুই ঘণ্টায় শুধু গেটের ভেতরে প্রবেশ করেন। তখন তার সামনে যে পরিমাণ শিক্ষার্থীর লাইন ছিল তা দেখে হতাশ হয়ে পড়ে দুপুর একটার দিকে বাসায় ফিরে যান তিনি।

জগন্নাথ হলের আরেক শিক্ষার্থী সৌম্যক সাহা। সকাল সোয়া ১০টার দিকে তিনি জানান, সকাল সাড়ে আটটায় ভোটের লাইনে দাঁড়িয়ে দেড় ঘণ্টার বেশি সময় ধরে তিনি মাত্র পাঁচ-ছয় কদম এগিয়েছেন। তার মতো অনেকেরই দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে পা ব্যথা হয়ে যায়। তারপর হাঁটু গেড়ে বসে যান লাইনে।

সবগুলো হলেই এই দুই শিক্ষার্থীর মতো অনেকেই ভোগান্তি ও সময়ক্ষেপণের শিকার হয়েছেন। ভোট দিতে এসে দীর্ঘ লাইন দেখে কিংবা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে অনেকেই ফিরে গেছেন। তারা অভিযোগ করেছেন, ছাত্রলীগকে ভোট পাইয়ে দিতে এ ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিজয় একাত্তর, শহীদুল্লাহ এবং জিয়াউর রহমান হলের কয়েকজন শিক্ষার্থী দাবি করেছেন ভোট দেয়া শেষ হলেও তাদেরকে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য করেছে ছাত্রলীগ। তবে নির্বাচনের দায়িত্ব পালনরত শিক্ষকেরা জানান, ৩৮টি করে ভোট দিতে হচ্ছে বলে ভোট গ্রহণে দীর্ঘ সময় লাগছে। আর কারচুপি ও অনিয়মের কারণে বিকাল ৫টা পর্যন্ত ভোট গ্রহণ হয় রোকেয়া এবং কুয়েত-মৈত্রী হলে। সেখানেও অনেক ছাত্রী ভোট না দিয়েই ফিরে গেছেন।

কুয়েত মৈত্রী হলে বস্তাভর্তি সিল মারা ব্যালট : ভোটের দিন সকালেই কুয়েত মৈত্রী হলে বস্তাভর্তি সিল মারা ব্যালট উদ্ধার করে ছাত্রীরা। এসব ব্যালটে ছাত্রলীগের হল সংসদের প্রার্থীদের পক্ষে ভোট দেওয়া ছিল। এরপর অন্য প্যানেলগুলোর প্রার্থীদের প্রতিবাদ ও অবস্থানের কারণে বেলা ১১টা ১০ মিনিট পর্যন্ত ভোট গ্রহণ স্থগিত ছিল। পরে ১১টা ১০ থেকে বিকাল ৫টা ১০ মিনিট পর্যন্ত ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। শিক্ষার্থীরা জানান, সকাল আটটায় ভোট গ্রহণ শুরুর কথা থাকলেও সাতটা থেকেই ছাত্রীদের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়। সাড়ে সাতটার দিকে প্রার্থীরা হল প্রভোস্টের কাছে তাদের সামনে ব্যালট বাক্স খোলার দাবি করেন। তবে তাদের সামনে বাক্স খোলা হয়নি। সকাল ৭টা ৫০ মিনিটের দিকে হলে প্রক্টর আসেন। এরপর প্রক্টর ও হল প্রভোস্ট মিলে ব্যালট বাক্স হলের রিডিংরুমে নিয়ে যান। এরপর ছাত্রীরা রিডিং রুমে গিয়ে বস্তাভর্তি ব্যালট দেখতে পান। সিলমারা ব্যালট উদ্ধার করে তারা বিক্ষোভ প্রদর্শন শুরু করলে ভোট প্রদান আর শুরু করা যায়নি । হলের স্বতন্ত্র ভিপি প্রার্থী নুরুন্নাহার কলি অভিযোগ করেন, তারা একটি বস্তা পান। আরও কয়েকটি বস্তা ছাত্রলীগের কর্মীরা নিয়ে গেছে। এসব ব্যালটে ছাত্রলীগের হল সংসদের প্রার্থীদের পক্ষে ক্রসচিহ্ন বা ভোট  দেওয়া ছিল। প্রক্টর অধ্যাপক গোলাম রব্বানী বলেন, ‘সিল মারা ব্যালটের সত্যতার প্রমাণ আমরা পেয়েছি। ওই হলের প্রভোস্টকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।’

রোকেয়া হলে ব্যালট ভর্তি বাক্স উদ্ধার: তিনটি বাক্সে ‘সিলহীন ব্যালট ভরে রাখার’ প্রতিবাদে রোকেয়া হলে বিক্ষোভ করেন ছাত্রীরা। ছাত্রলীগের নেতাকর্মী ও প্রশাসনের বিরুদ্ধে তারা স্লোগান দেন। এ নিয়ে অন্তত দুই দফা ভোটগ্রহণ স্থগিত হয়। পরে ভোটের সময়সীমার বাড়িয়ে বেলা ৩টা থেকে ৫টা পর্যন্ত ভোট দেওয়ার সময় নির্ধারণ করে কর্তৃপক্ষ।

দুপুরে রোকেয়া হল সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র ভিপি প্রার্থী মোছা. রাফিয়া সুলতানা বলেন, ‘আমরা ভোট কেন্দ্রের ভেতরে তিনটি ট্রাঙ্ক দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু প্রশাসন আমাদের এই ট্রাঙ্কে কি আছে দেখাচ্ছে না। যদি ট্রাঙ্ককে কিছু না থাকত তাহলে আমাদের দেখাত।  আমরা ধারণা করছি, এই ট্রাঙ্কের ভিতরে আরো ব্যালট থাকতে পারে।’ এর আগে সকালে তিনটি ব্যালট বাক্স সরিয়ে ফেলার অভিযোগ উঠেছিল। বাম জোট থেকে রোকেয়া হলের সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী জিএস মুনিরা দিলশাদ ইরা বলেন, ‘ রোকেয়া হলে ব্যালট বাক্স থাকার কথা নয়টি। সকালে আমাদেরকে দেখানো হয়েছে ছয়টি। এর কারণ জানতে চাইলেও আমাদেরকে কোনো জবাব দেওয়া হয়নি।’ অপর এক ছাত্রী জানান, পরে ওই কেন্দ্র থেকে তিনটি বাক্সেই ব্যালট পেপার পাওয়া যায়।

ভিপি প্রার্থী নূরের উপর ছাত্রলীগের নারীকর্মীদের হামলা : রোকেয়া হলে ব্যালট ভর্তি বাক্স থাকার খবর জানাজানি হওয়ার পর ওই হলে যান কোটা সংস্কার আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া নুরুল হক নূর। তিনি সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ থেকে ভিপি পদে নির্বাচনে লড়ছেন। পরিষদের একাধিক নেতা জানান, নূরসহ পরিষদের কয়েকজন সদস্য হল প্রভোস্টের কাছে যান। পরে ছাত্রলীগের নারী কর্মীরা নুরুল হকের ওপর হামলা করেন। এ সময় তাকে মাটিতে ফেলে আঘাত করা হয়। হামলার পর নুরুল হককে উদ্ধার করে একটি গণমাধ্যমের গাড়িতে করে ক্যাম্পাসের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়। একটি বেসরকারি হাসপাতালে তিনি চিকিত্সাধীন আছেন বলে জানা গেছে।

নামের বানান ভুলে ভোট দিতে পারেননি অনেকে: বিশ্ববিদ্যালয়ের আইডি কার্ড, পে ইন স্লিপ এবং অন্যান্য সার্টিফিকেটে থাকা নামের সাথে হল কর্তৃপক্ষের প্রণীত ভোটার তালিকার নামের সাথে মিল না থাকায় ভোট দিতে পারেননি অনেক শিক্ষার্থী। সুফিয়া কামাল হলে এমন এক ছাত্রী তার নামের পক্ষে আইডি কার্ড ও পে ইন স্লিপসহ অন্য প্রমাণ দেখালেও তিনি ভোট দিতে পারেননি। ওই ছাত্রী জানান, তাকে পোলিং অফিসাররা প্রথমে বলেন, তার ভোট হয়ে গেছে। পরে বলেন নামের বানান ঠিক নেই। ওই ছাত্রী বলেন, ভোটার তালিকায় বানান ভুল থাকলে তার দায় কর্তৃপক্ষের। কিন্তু তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করেও তিনি ভোট দিতে পারেননি। হল প্রভোস্টকে বিষয়টি জানিয়েও তিনি প্রতিকার পাননি। আরো কয়েকটি হলেও এমন ঘটনা ঘটেছে বলে জানা গেছে।

ভিসির বাসভবন ঘেরাও

ভোট বর্জনের পর ভিসির বাসভবন ঘেরাও করে  ছাত্রদল, বাম সংগঠন, কোটা সংস্কারসহ স্বতন্ত্র প্যানেলের প্রার্থী ও তাদের সমর্থকরা। আজ মঙ্গলবার থেকে অনির্দিষ্টকালের ছাত্র ধর্মঘট ঘোষণা করেছেন তারা। গতকাল মধুর ক্যান্টিনে ছাত্রদল এবং বাম—কোটা—স্বতন্ত্র প্রার্থীরা পৃথক সংবাদ সম্মেলনে এ কর্মসূচি ঘোষণা করেন। দাবির প্রতি সংহতি জানিয়ে কর্মসূচি পালন করেছেন সাবেক শিক্ষার্থীদের একটি অংশও। দাবি বাস্তবায়নে তারা শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে মানববন্ধন করেন। একই দাবিতে বিবৃতি দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত বিএনপি সমর্থক সাদা দলের শিক্ষকরা। আর পুনর্নির্বাচনের দাবিকে হাস্যকর বলে অভিহিত করেছেন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতা ও প্রার্থীরা।

পুনঃতফসিল দেয়ার ক্ষমতা নেই, পারলে মামলা করো : রিটার্নিং কর্মকর্তা

অনিয়ম, কারচুপির প্রতিবাদ এবং হল থেকে ভোটকেন্দ্র সরিয়ে পুনরায় নির্বাচনের দাবি জানিয়ে প্রধান নির্বাচন কর্মকর্তা অধ্যাপক মাহফুজুর রহমানের কাছে লিখিত চিঠি দিয়েছে ছাত্রলীগ বাদে প্রায় সব প্যানেলের প্রার্থীরা।

অভিযোগ ও দাবিনামা হাতে পেয়ে প্রধান নির্বাচন কর্মকর্তা অধ্যাপক ড. এস এম মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘তোমরা এসেছ, লিখিত অভিযোগ দিয়েছ, আমি তোমাদের কথা শুনেছি, ডকুমেন্ট হিসেবে লিখিত অভিযোগপত্র গ্রহণ করেছি। কিন্তু নির্বাচন বাতিল কিংবা পুনঃতফসিলের ঘোষণা করতে পারবো না। সে শক্তি ক্ষমতা আমার নেই। কমিটি আছে, সেখানে বিষয়টি উপস্থাপন করব। এর বেশি কিছু আমি বলতে পারব না। যদি তোমরা না মানো তবে পারলে মামলা করতে পারো।’