নানা অনিয়ম, অব্যবস্থাপনায় ডুবছে সরকারি পাটকলগুলো। প্রতি বছরই তাদের লোকসান বাড়ছে। অথচ একই সময়ে বেসরকারি পাটকলগুলো লাভের মুখ দেখছে। বাংলাদেশ জুটমিল করপোরেশন (বিজেএমসি) সূত্র জানায়, প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৫শ কোটি টাকা লোকসান দিচ্ছে সরকারের পাটকলগুলো। গত ২০১০-১১ অর্থবছরে কিছুটা লাভের মুখ দেখলেও পরের বছর থেকে আবারো লোকসান গুনছে।
গত ৬ মার্চ জাতীয় পাট দিবসের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘পাটের তো কিছুই ফেলা যায় না। তাহলে পাটে লোকসান হবে কেন? বরং কিভাবে একে লাভজনক করা যায়, তা বের করতে হবে। ’
সূত্র জানিয়েছে, সরকারি পাটকলগুলোতে লোকসানের বড় কারণ কাঁচা পাট কেনায় অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি। তারা যখন পাটের দাম কম থাকে তখন না কিনে বেশি দামে কিনে। এছাড়া তাদের কেনা পাটের গুণগত মান ভালো না হওয়া, পাটকলগুলোতে অতিরিক্ত জনবল, সক্ষমতা অনুসারে মিলের কার্যক্রম পরিচালনা না করা, সিবিএ’র দৌরাত্ম্য, পুরাতন যন্ত্রপাতিসহ আরো বিভিন্ন কারণ রয়েছে।
বর্তমানে দেশে বিজেএমসির নিয়ন্ত্রণাধীন সরকারি পাটকল রয়েছে ৩৩টি। এর মধ্যে সাতটি বন্ধ রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, পাটের বহুমুখী উত্পাদন ও ব্যবহারে দেশে ও বহির্বিশ্বে পাটের ব্যাপক চাহিদা বৃদ্ধি পেলেও বিজেএমসি তা সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারছে না। দক্ষ জনবল ও সময়মতো সিদ্ধান্ত না নেয়ার কারণে লোকসানে পতিত হচ্ছে সরকারের এ প্রতিষ্ঠানটি।
এছাড়া দেশের পাটের বড় বাজার ভারত বাংলাদেশের পাটপণ্যে অ্যান্টিড্যাম্পিং ডিউটি আরোপ করায় পাটের বাজারে কিছুটা নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
চলতি অর্থবছরের (২০১৮-১৯) প্রথম আট মাসে পাট ও পাটজাত পণ্যের রফতানি কমেছে। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী এ সময় পাট ও পাটজাত পণ্য রফতানি হয়েছে ৫৬ কোটি ৫ লাখ ৬০ হাজার ডলারের। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে রফতানি আয় কম হয়েছে ২১ দশমিক ১৮ শতাংশ।
বিজেএমসির সূত্র জানিয়েছে, গত ১০ বছর সরকারি পাটকলগুলোতে লোকসানের পরিমাণ ৩ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এরমধ্যে ২০০৯ সালে ৩০৯ কোটি ৫৫ লাখ ৪ হাজার টাকা, ২০১০ সালে ২৭৫ কোটি ২৩ লাখ ৭ হাজার টাকা, ২০১২ সালে ৭৮ কোটি ৩৫ লাখ ১৮ হাজার টাকা, ২০১৩ সালে ৩৯৬ কোটি ৯৭ লাখ ১২ হাজার টাকা, ২০১৪ সালে ৫১৩ কোটি ৮ লাখ ৬০ হাজার টাকা, ২০১৫ সালে ৭২৯ কোটি ১ লাখ ৬১ হাজার টাকা, ২০১৬ সালে ৬৫৬ কোটি ৮১ লাখ ২০ হাজার টাকা, ২০১৭ সালে ৪৮১ কোটি ৫০ লাখ ৮৮ হাজার টাকা লোকসান হয়। মাঝে শুধু ২০১১ সালে ১৯ কোটি ৫৩ লাখ টাকা লাভ করে বিজেএমসি। এর আগে সর্বশেষ ১৯৮২-৮৩ অর্থবছরে ২৩ কোটি ৯৮ লাখ টাকা মুনাফা করে।
পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি বাধ্যতামূলক প্যাকেজিং আইন
সরকার দেশের পাট শিল্পকে রক্ষার স্বার্থে বাধ্যতামূলক প্যাকেজিং আইন করলেও তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি। এই আইন বাস্তবায়ন হলে এ খাতের চেহারা পাল্টে যেত।
গত মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী বলেন, ভারত সরকার বাংলাদেশের পাটপণ্যে আরোপিত অ্যান্টিড্যাম্পিং ডিউটি প্রত্যাহার না করায় ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার কারণে দেশের পাটের বাজারে কিছুটা নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। ভারত যেন বাংলাদেশের পাটপণ্যের ওপর থেকে অ্যান্টিডাম্পিং ডিউটি প্রত্যাহার করে নেয়, সে লক্ষ্যে জোর প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। তিনি বলেন, নতুন নতুন পাটজাত পণ্য (যেমন পাট থেকে ভিসকস, পাট পাতা থেকে পানীয়, পাট থেকে পলিথিন ব্যাগের বিকল্প সোনালি ব্যাগ, পাটকাঠি থেকে চারকোল ও জুট কম্পোজিট গার্মেন্টস) উদ্ভাবনের লক্ষ্যে বিভিন্ন গবেষণা অব্যাহত রয়েছে। এ খাত ঘুরে দাঁড়াবে।
