না’গঞ্জে অধিকাংশ পাটকল বন্ধ হওয়ায় কাঁচাপাটের ব্যবসা ছেড়ে দিচ্ছেন অনেকে

আপডেট : ১১ মার্চ ২০১৯, ২৩:৫২

এশিয়ার বৃহত্তম পাটকল আদমজী জুটমিল বন্ধ হওয়ার কয়েক বছরের ব্যবধানে নারায়ণগঞ্জে বন্ধ হয়ে গেছে আরো অন্তত এক ডজন পাটকল। এ ছাড়া নানা সমস্যার কারণে কমেছে কাঁচাপাট রপ্তানিকারক ও ব্যবসায়ীও।

নারায়ণগঞ্জে শীতলক্ষ্যার তীরে সিদ্ধিরগঞ্জের সুমিলপাড়ায় আদমজী জুটমিল গড়ে ওঠে ২৯৭ একর জমির ওপর। ১৭০০ হেসিয়ান ও ১০০০ সেকিং লুম দিয়ে এ মিলের উত্পাদন শুরু হয় ১৯৫১ সালের ১২ ডিসেম্বর। ওই সময় এ মিলের উত্পাদন থেকে প্রতিবছর প্রায় ৬০ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা আয় হতো। তখন মিলে তাঁতকল বসানো হয় ৩ হাজার ৩০০টি। আদমজী জুটমিলে উত্পাদিত চট, কার্পেটসহ বিভিন্ন প্রকার পাটজাত দ্রব্য দেশের চাহিদা পূরণ করে রপ্তানি হতো চীন, ভারত, কানাডা, আমেরিকা, থাইল্যান্ডসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। আদমজীকে ঘিরে শীতলক্ষ্যার দুইপাড়ে সিদ্ধিরগঞ্জ, কাঁচপুর, বন্দর, রূপগঞ্জ ও সোনারগাঁয়ে গড়ে ওঠে বিশাল জনবসতি। আদমজী জুটমিলকে কেন্দ্র করে নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যার দুই পাড়ে গড়ে ওঠে আরো বেশ কিছু জুটমিল, যে কারণে নারায়ণগঞ্জ খ্যাতি লাভ করে প্রাচ্যের ডান্ডি হিসেবে। কিন্তু ১৯৭৪ সালে আদমজী জুটমিল জাতীয়করণ করে জুটমিল কর্পোরেশনের হাতে ন্যস্ত করার পর থেকে অব্যাহতভাবে লোকসানে ছিল মিলটি। বছরের পর বছর লোকসানের কারণ দেখিয়ে আদমজী জুটমিল বন্ধ করা হয় ২০০২ সালের ৩০ জুন। তবে এর অনেক আগেই ১৯৯৪ সালের দিকে সিদ্ধিরগঞ্জের মনোয়ারা জুট মিলটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। গত এক যুগে বন্ধ হয়ে গেছে অন্তত আরো ১০টি জুটমিল। এগুলো হলো— সিদ্ধিরগঞ্জে অবস্থিত তাজ জুট প্যাকিং কোম্পানী, প্রাইম জুটেক্স, শীতলক্ষ্যার পূর্বতীরে সোনাকান্দার সারোয়ার জুটমিল, নবীগঞ্জে জামাল জুটমিল, উত্তর নদ্যার আমিন ব্রাদার্স জুট এন্ড কোঃ, কাঁচপুর এলাকায় আনোয়ার জুটমিল, এলাইড জুটমিল, রূপগঞ্জে তারাব এলাকায় নিশান জুটমিল, গাউছিয়া জুটমিল ও মাসরিকী জুটমিল।

পাট অধিদফতরের নারায়ণগঞ্জ অফিস সূত্রে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে অবস্থিত মালেক জুটমিল, নবারুন জুটমিল, উত্তরা জুট ফাইবার্স, নিউ ঢাকা ইন্ডাস্ট্রিজ ও বন্দরের মদনপুরে অবস্থিত সুরুজ জুট স্পিনিং মিলে কাঁচাপাটের চাহিদা রয়েছে। তবে এর মধ্যে কয়েকটি মিল নানা সমস্যায় ধুঁকছে।

নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে কমেছে নারায়ণগঞ্জের কাঁচাপাট রফতানিকারক ও ব্যবসায়ীদের সংখ্যাও। বর্তমানে সারাদেশে অন্তত দেড় শতাধিক কাঁচাপাট রফতানিকারক রয়েছেন, যার মধ্যে নারায়ণগঞ্জে আছেন ২০ থেকে ২৫ জন। এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জে পাট ব্যবসায়ী আছেন অর্ধশতাধিক। এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত রয়েছে অন্তত ১০ হাজার শ্রমিক।

সম্প্রতি এক সভায় বাংলাদেশ জুট অ্যাসোসিয়েশনের বর্তমান কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য ও হক কোম্পানির স্বত্বাধিকারী নুরুল হোসেন বলেন, ১৯৮৫-৮৬ সালে একবার কাঁচাপাট রফতানি বন্ধের সিদ্ধান্তের কারণে শুধু নারায়ণগঞ্জ থেকেই সাড়ে ৩শ’ কাঁচাপাট ব্যবসায়ী বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। সানি জুট ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী লিয়াকত হোসেন বলেছিলেন, ২০১০ সালে, ২০১৬ সালেও কাঁচাপাট রফতানি বন্ধের কারণে রফতানিকারকরা লোকসান গুনেছে। এর মধ্যে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ২০১৩-২০১৫ সাল পর্যন্ত কাঁচাপাট রফতানিকারকরা লোকসান গুনেছে। বার বার রফতানি বন্ধের সিদ্ধান্তের কারণে রফতানিকারকরা নিঃস্ব হওয়ার পথে। বাংলাদেশ জুট অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ও আরজু জুট ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী আরজু রহমান ভুঁইয়া বলেন, আগে এক অর্থ বছরে নারায়ণগঞ্জ থেকেই প্রায় ৪ লাখ বেল কাঁচাপাট রফতানি হতো। পাটকে আরো উন্নত করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজীর সুদৃষ্টি কামনা করেন তিনি।