দক্ষিণাঞ্চলের ২২টি পয়েন্টে সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের ৩০টি ফেরির প্রায় সবগুলোর অবস্থা নাজুক। গত এক দশক ধরে জোড়াতালি দিয়ে চলছে এসব ফেরি। ফেরি চলাচলের জন্য ৪৪টি ঘাটের পন্টুুন ও গ্যাংওয়ের অবস্থা আরো খারাপ। ঝুঁকিপূর্ণভাবেই দীর্ঘদিন ধরে নদীবেষ্টিত এ অঞ্চলে ফেরি চলাচল করছে। পাশাপাশি নদীর ভাঙন ও নাব্যতা সঙ্কটে দেশের তিনটি সমুদ্রবন্দর ও দেশের তিনটি বিভাগের মধ্যে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ রক্ষাকারী চট্টগ্রাম-লক্ষ্মীপুর-ভোলা-বরিশাল-খুলনা এবং মংলা মহাসড়কের ইলিশা-মজুচৌধুরীর হাট ও ভেদুরিয়া-লাহারহাট সেক্টরে যানবাহন চলাচল হুমকির মুখে পড়েছে। সড়ক ও জনপথ বিভাগ এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা দু’টি সংস্থা যথাযথ নজরদারি ও রক্ষণাবেক্ষণের কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়ায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
এসব রুটের ফেরিতে নিয়মিত যাতায়াতকারী যানবাহনের চালকরা জানান, সড়ক অধিদফতর পূর্ণতা না পাওয়ায় ফেরি চলাচল করে ইজারাদারের ইচ্ছামাফিক। তেমন কোনো দেখভাল করেন না সওজের কর্মকর্তারা। অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, ইজারাদারের খামখেয়ালী সময়সূচি অনুযায়ী চলাচল করে ফেরি। ফেরি পারাপার হচ্ছে মাত্রাতিরিক্ত পণ্য বোঝাই করা ট্রাক। ভারি এসব যানবাহনের অনিয়ন্ত্রিত চলাচলের কারণে ফেরিঘাটের গ্যাংওয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রায়ই ফেরি সার্ভিস বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। তখন দুর্ভোগের শেষ থাকে না।
এক সময় এ অঞ্চলের মানুষ নৌপথে লঞ্চ, ট্রলার ও নৌকায় যাতায়াত করলেও আশির দশকে নৌ-পথে ফেরি সার্ভিস চালুর মাধ্যমে সড়ক যোগাযোগ স্থাপন করা হয়। সড়কপথে যানবাহনে যাতায়াত ও পণ্য পরিবহন প্রধান মাধ্যম হিসাবে পরিচিতি লাভ করে। তবে গত দু’ দশকে সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সড়কপথ জনদুর্ভোগের রূপ নিয়েছে। সড়ক-মহাসড়ক সংযোগে দীর্ঘদিনের পুরনো ফেরি যৌবন হারিয়েছে। জোড়াতালি দিয়ে কোনোরকম টিকিয়ে রাখা পন্টুুনগুলো ক্রমেই জনদুর্ভোগের মাত্রা বাড়াচ্ছে।
সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের ফেরি বিভাগের কর্মকর্তারা জানালেন, ফেরিগুলো মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণে তহবিল সঙ্কটসহ মেয়াদোত্তীর্ণ ফেরি ও এর ইঞ্জিনের আয়ু ফুরিয়ে যাওয়ার কথা। সমপ্রতি সড়ক অধিদফতরের পুরনো ফেরিগুলো পুনর্বাসনে গৃহিত প্রকল্পের অধীনে বরিশাল ও পটুয়াখালী ফেরি বিভাগের ১৫টি ফেরি পূর্ণাঙ্গ মেরামতের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আরো ১৫টি ফেরি বলতে গেলে অচল অবস্থায় কোনোরকমে চলছে। সেগুলো মেরামত করাসহ চলমান ফেরিগুলোর পরিপূর্ণ পুনর্বাসনে উদ্যোগ নেই। প্রায় এক যুগ পর সমপ্রতি পুরনো ফেরিগুলোর জন্য সড়ক ও সেতু মন্ত্রণালয় কিছু নতুন ইঞ্জিনও প্রপালশন ইউনিট ক্রয় করলেও তা অপ্রতুল। এখনো ২০০৭ সালের ভয়াল ঘূর্ণিঝড় সিডরে ক্ষতিগ্রস্ত ফেরিগুলোর পুনর্বাসন শেষ হয়নি। দীর্ঘদিনের পুরনো ফেরি জোড়াতালি দিয়ে কোনোমতে সচল রাখা হলেও এখন আর যানবাহন পারাপার করতে পারছে না। বরিশাল-পটুয়াখালী-কুয়াকাটা ও বরগুনা মহাসড়কের লেবুখালি, আমতলী, পায়রা এবং বরিশাল-ঝালকাঠি-পিরোজপুর-বাগেরহাট-খুলনাসহ মংলা মহাসড়কের বেকুঠিয়া ও চরখালীর মতো গুরুত্বপূর্ণস্থানে ফেরি চলাচল করছে জোড়াতালি দিয়ে। বরিশাল নগরীর সাথে পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগের জন্য একমাত্র ফেরি সার্ভিস বেলতলা ফেরিঘাটের গ্যাংওয়েসহ বিশাল এলাকা কীর্তনখোলার ভাঙনে নাজুক হয়ে পড়েছে। সেখানে চলাচলকারী দু’টি ফেরির অবস্থাই নাজুক। রাতে যানবাহন পারাপারের ক্ষমতা নেই এ ফেরি দু’টির। এ ফেরিটিসহ গোমা ও মীরগঞ্জের ফেরি চলাচল করে ইজারাদারের খেয়াল-খুশি মত। ভাড়াও তারা ইচ্ছামাফিক আদায় করেন।
চট্টগ্রাম-লক্ষ্মীপুর-ভোলা-বরিশাল-খুলনা এবং মংলা মহাসড়কের বেকুঠিয়া ফেরি পয়েন্টে এখনো মাত্র দু’টি ফেরি জোড়াতালি দিয়ে চলছে। সওজের নিয়ম উপেক্ষা করে ইজারাদার প্রতি ঘন্টায় একটি ট্রিপে বেকুটিয়া ঘাটে যানবাহন পারাপার করছেন। একই মহাসড়কের ভোলা ও লক্ষ্মীপুরের মধ্যবর্তী ইলিশা-মজুচৌধুরীরহাট রুটে চলাচলকারী ফেরিতে যানবাহন পারাপার প্রায় বন্ধের পথে। এ রুটের ভোলার ইলিশা প্রান্তে ভাটি মেঘনায় কয়েক দফার ভাঙনে বিআইডব্লিউটিসির নিয়ন্ত্রণাধীন ফেরি সার্ভিস প্রায় দু’ মাস বন্ধ ছিলো। সম্প্রতি বিকল্প ব্যবস্থায় প্রায় তিন গুণ দূরত্বে মজুচৌধুরীরহাট থেকে সরাসরি ভেদুরিয়া পর্যন্ত ফেরি চলাচল করলেও এতে সময় লাগছে প্রায় আট ঘন্টা। ফলে যানবাহন চালকরা এ মহাসড়ক পথে যাতায়াত প্রায় বন্ধই করে দিয়েছেন। ইলিশাতে বিধ্বস্ত ঘাট মেরামত করে ভোলা-লক্ষ্মীপুর সরাসরি ফেরি সার্ভিস পুনরায় চালু করা হবে বলে জানিয়েছেন বিআইডব্লিউটিএ’র কর্মকর্তারা। এরপরও প্রায় ২৮ কিলোমিটার দূরত্বের দেশের দীর্ঘতম এ ফেরি সেক্টরে মাত্র দু’টি কে-টাইপ ফেরির সাহায্যে যানবাহন পারাপারে বিড়ম্বনার কতটুকু অবসান হবে তা নিয়ে সংশয় দূর হচ্ছে না। ভোলা ও বরিশালের মধ্যবর্তী ভেদুরিয়া-লাহারহাট রুটেও বিআইডব্লিউটিসির তিনটি ইউটিলিটি ফেরি’র মধ্যে দু’টি চলাচল করছে। তাও নাব্যতা সঙ্কটের কারণে জোয়ার-ভাটা নির্ভর করে চলাচল করছে। জোয়ারের সময় পানি মেপে ফেরিগুলো উভয় প্রান্তে যাতায়াত করে।
