ইসরায়েলের আসন্ন নির্বাচন ও জাতি-বিদ্বেষ

আপডেট : ১২ মার্চ ২০১৯, ২১:৫০

এপ্রিল মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরিয়া নির্বিচার জাতিগত বিদ্বেষ চলিতেছে ইসরায়েলে। এক যুগের অধিক সময় ধরিয়া প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন লিকুদ পার্টির নেতা বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এইবার এই বিদ্বেষবাদিতায় নেতৃত্ব দিতেছেন বলিয়া প্রতীয়মান হইতেছে। তিনি ইতোমধ্যে স্পষ্টভাবে জানাইয়া দিয়াছেন যে— ইসরায়েল সকল নাগরিকের নহে, বরং কেবল ইহুদি সম্প্রদায়ের একটি রাষ্ট্র। ভোটের পূর্বে নেতানিয়াহুর এহেন বক্তব্য অত্যন্ত তাত্পর্যপূর্ণ। কেননা ইসরায়েলের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হইতেছে জাতিগতভাবে আরব। ১৯৪৮ সালে জায়নবাদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর হইতে নানা সময়ে নানাবিধ লাঞ্ছনা ভোগ করিয়াই দেশের মাটি আঁকড়াইয়া পড়িয়া আছেন এই জনগোষ্ঠী। উল্লেখ্য, ইসরায়েলে এই জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়িতেছে। রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও তাহারা ক্রমশ মূর্ত হইতেছে। তবে গত বত্সর জুলাই মাসে চরম বিতর্কিত একটি আইন পাস হইবার পর হইতে আরব জনগোষ্ঠী সাংবিধানিকভাবেই ব্যাপক হুমকির মধ্যে পড়িয়া গিয়াছে। এই আইন মোতাবেক ইসরায়েল রাষ্ট্রকে কেবল ইহুদি জনগোষ্ঠীর জন্যই সর্বোচ্চমাত্রায় সংরক্ষিত করা হইয়াছে। একই আইনে আরবিকে সরকারি ভাষার তালিকা হইতে বাদ দেওয়া হইয়াছে। নেতানিয়াহু এক্ষণে এই আইনকে কাজে লাগাইয়াই সংখ্যাগরিষ্ঠের মন জয় করিতে চাহিতেছেন। মূলত ইসরায়েলের উদারপন্থিদের পক্ষ হইতে আরবদের প্রতি সহানুভূতিমূলক কিছু মন্তব্য আসিবার পর হইতেই নেতানিয়াহু ও উগ্র ডানপন্থি মিডিয়া উঠিয়া-পড়িয়া লাগিয়াছে।

বিভিন্ন জনমত জরিপ হইতে সম্ভাব্য খারাপ ফলের আশঙ্কাতাড়িত হইয়াই তিনি এই পথ ধরিয়াছেন বলিয়া অনুমান করা হইতেছে। উল্লেখ্য, মাসতিনেক পূর্বেও অধিকাংশ বিশ্লেষক নেতানিয়াহুর পঞ্চমবারের মতো বিজয় অবধারিত মনে করিতেছিলেন। কিন্তু সাবেক সেনাপ্রধান বেনি গানজ দৃশ্যপটে আবির্ভূত হইবার পর হইতেই চালচিত্র বদলাইতে শুরু করিয়াছে। রাজনীতিতে নিতান্ত নবাগত হইলেও, কেবল নেতানিয়াহুর খুঁতগুলি জনসমক্ষে তুলিয়া ধরিতে পারার বদৌলতেই দিন দিন জনপ্রিয় হইয়া উঠিতেছেন গানজ। এমতাবস্থায় রেকর্ডসংখ্যক পঞ্চমবারের মতো প্রধানমন্ত্রীর দৌড়ে থাকা নেতানিয়াহু উগ্র জায়নবাদী ভোটগুলিকে এক জায়গায় জড়ো করিবার পুরাতন ও পরিচিত রাস্তাই ধরিয়াছেন।

ভোটে জিতিবার এই কৌশলের ক্ষেত্রে নেতানিয়াহু নূতন কোনো কিছু করিতেছেন না। ভোট আসিলেই সংখ্যালঘুদের ভীতি প্রদর্শন ও তাহাদের বিরুদ্ধে সহিংসতা বহু দেশেই প্রচলিত আছে। তবে ইসরায়েলের মূলধারার রাজনীতি এইক্ষেত্রে বলিতে গেলে সর্বোচ্চমাত্রার পারদর্শিতা অর্জন করিয়াছে। শুরু হইতেই রাষ্ট্রীয়ভাবে জাতি-বিদ্বেষ লালন করিবার কারণে, ইসরায়েল কখনোই সর্বজনের রাষ্ট্র না হইয়া কেবল ইহুদি সম্প্রদায়ের রাষ্ট্র হিসাবেই বিরাজ করিতেছে। এখানেই শেষ নহে, ফিলিস্তিনি জনগণের জাতীয় মুক্তির সংগ্রামকে জায়নবাদীরা সর্বদাই ধর্মের রং পরাইয়া দিয়া দেশের ভিতরকার সাধারণ নাগরিকদের ব্যাপকভাবে বিভ্রান্ত করিয়া ফেলিয়াছে। নেতানিয়াহুর জোট সরকারের মন্ত্রিসভায় কট্টর ইহুদি মৌলবাদী সংগঠনের লোকজনের উপস্থিতি একই কথা জানান দিতেছে। নিজের পদ রক্ষা করা ও শরিকদের চাপের মুখে এইবারের নির্বাচনে ইসরায়েলি আরবদের বিরুদ্ধে নানামুখী চাপ বাড়িতেই থাকিবে বলিয়া মনে হইতেছে।